ওই ঘটনার পর সমর্পিতা এক সপ্তাহ স্কুলে আসেনি৷ ওর বাড়িতে ফোন করে ইলিনা জেনেছে, পরদিন ভোরবেলা থেকে সম্পির খুব জ্বর৷ সেই জ্বর এতটাই খামখেয়ালিভাবে ওঠানামা করছিল যে, সম্পির মা-বাবা খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন৷ তা ছাড়া সম্পি জ্বরের মধ্যে ভুল বকছিল৷ সবকিছু মিলিয়ে ওর মা-বাবা ভাবছিলেন ব্যাপারটা ভাইরাল ফিভার নয়—অন্য কিছু৷
ইলিনা, সজনী আর অনুষ্কা একদিন স্কুলের পর সম্পিকে দেখতে গিয়েছিল৷ তখন ও অনেকটা সামলে উঠেছে৷
ইলিনা আর সজনী ওকে সেদিন টিচার্স রুমের ব্যাপার নিয়ে অনেক প্রশ্ন করল, কিন্তু সম্পি গোঁজ হয়ে বসে রইল৷ ঠিকঠাক কোনও জবাব দিল না৷
ওর মা নানান কথা বলছিলেন৷
‘দ্যাখো না, যে-মেয়ে সবসময় সাহসের বড়াই করে সে কেমন ভয়ে চুপসে গেছে৷ এই তো, গত পরশু—যখন জ্বরটা খুব বেড়েছিল—তখন জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকছিল৷ বারবার বলছিল, ‘‘বৃষ্টির জল৷ বৃষ্টির জল দিয়েই খতম করতে হবে…বৃষ্টির জল চাই…বৃষ্টি চাই৷’’
‘আমি ওকে মাথায় জলপটি দিয়ে, ধাক্কা দিয়ে সাড় ফেরাতেই কেমন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল৷ অনেকবার জিগ্যেস করলাম, ‘‘বৃষ্টির জল দিয়ে কী করবি বলছিলি?’’ তো ও হাঁ করে তাকিয়ে রইল—কোনও জবাব দিল না৷ বলো দেখি, কী মুশকিল!
‘তা ছাড়া ক’দিন ধরে খাবারদাবার কিছু মুখে তুলছে না৷ শুধু বলছে খিদে নেই৷ তোমরা ওকে একটু বুঝিয়ে বলো তো৷ ঠিকঠাক না খেলে শরীরে জোর পাবে কেমন করে?’
সম্পির মা একটানা কথা বলে যাচ্ছিলেন৷ আর অনুষ্কা শান্ত চোখে সম্পির দিকে তাকিয়ে ওকে দেখছিল৷
‘ও, হ্যাঁ৷ তোমাদের একজন দিদিমণি বাড়িতে ফোন করেছিলেন৷ সম্পি কেমন আছে সে-খবর নিচ্ছিলেন৷ বললেন, সম্পি ওঁর খুব প্রিয় স্টুডেন্ট…৷’ মেয়ের দিকে ঘুরে তাকালেন : ‘অ্যাই, কী নাম যেন ওই দিদিমণির? তোকে যে সেদিন বললাম…৷’
সম্পি নিষ্প্রাণ স্বরে বলল, ‘রনিতা ম্যাডাম৷’
ইলিনা আর সজনী মুখচাওয়াচাওয়ি করল৷ কিন্তু কোনও কথা বলল না৷
একটু পরে সম্পির মা ঘর ছেড়ে চলে যেতেই অনুষ্কা বলল, ‘সম্পি, রনিতা ম্যাডাম তোমাকে থ্রেট করেছেন?’
সম্পি চুপ করে রইল৷ বিছানার চাদরের দিকে তাকিয়ে রইল৷ আঙুল খুঁটতে লাগল৷
‘আমি সব জানি, সম্পি৷ রনিতা ম্যাডাম এখন আর মানুষ নেই— অন্য কিছু হয়ে গেছেন৷ পরানের মার্ডারে রনিতা ম্যাডাম ইনভলভড…৷’
সমপির্তা চমকে মুখ তুলে তাকাল৷ ইলিনা আর সজনীও তাকাল অনুষ্কার দিকে৷
‘তুমি কেমন করে জানলে?’ সম্পি অস্পষ্ট গলায় জিগ্যেস করল৷
‘আমি জানি—’ আত্মবিশ্বাসের জোর ফুটে বেরোল অনুষ্কার উত্তরে : ‘সেদিন ঠিক কী হয়েছিল আমাকে খুলে বলো৷’ অনুষ্কা সম্পির কাঁধে একটা হাত রাখল : ‘কোনও ভয় নেই৷ আমরা তোমাকে হেলপ করতে চাই…৷’
তিনজনে মিলে আরও খানিকক্ষণ বোঝাতেই সম্পি নরম হল৷ ও দুর্বল গলায় ধীরে-ধীরে সেদিনকার সব ঘটনা খুলে বলল৷
শুনতে-শুনতে ইলিনা আর সজনীর ভেতরে ভয়ের হিমেল স্রোত ছড়িয়ে পড়ল৷ এসব কী বলছে সম্পি!
ওর কাহিনি শুনতে-শুনতে অনুষ্কা উত্তেজিত হয়ে পড়ল৷ ওর ফরসা গালে গোলাপি আভা ছড়িয়ে পড়ল৷
একসময় ওরা তিনজন উঠে পড়ল৷ বাড়ি ফিরতে হবে৷ বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছে৷
ক’দিন ধরেই রোজ ভালো বৃষ্টি হচ্ছে৷ রাস্তায় জল জমে যাচ্ছে৷
আজ সম্পির বাড়ি আসার ব্যাপারে অনুষ্কা একটু কিন্তু-কিন্তু করেছিল৷ বলেছিল, যদি সম্পির বাড়ির রাস্তায় জল জমে যায় তা হলে কিছুতেই ও গাড়ি থেকে নামতে পারবে না৷
শেষ পর্যন্ত সেরকম বৃষ্টি হয়নি৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও অনুষ্কা রেনকোট এবং ছাতা দুটোই নিয়ে বেরিয়েছে৷ এ নিয়ে ইলিনা আর সজনী ওকে ঠাট্টা করতে ছাড়েনি৷ কিন্তু অনুষ্কা সেই পুরোনো কথাই বলেছে : বৃষ্টি ওর ভালো লাগে না৷
সম্পির বাড়ি থেকে ফেরার পর তিনটে দিন অনুষ্কা কীরকম যেন আনমনা ছিল৷ তারপর আজ ইলিনাকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে এসেছে৷
ইলিনা অন্ধকার প্রাসাদের ছবিটার দিকে তাকিয়ে ছিল৷ না, ও মোটেই ভুল দেখছে না৷ আজ সত্যি-সত্যিই দুটো জানলায় আলো জ্বলছে!
‘এই ছবিটার মধ্যে নিশ্চয়ই কোনও মিস্ট্রি আছে৷’ প্রাসাদের ছবিটার দিকে আঙুল দেখিয়ে ইলিনা বলল, ‘আজ দেখছি দুটো জানলায় আলো জ্বলছে! আমার স্পষ্ট মনে আছে, প্রথম যেদিন তোমার বাড়িতে এসেছিলাম সেদিন…৷’
ওকে থামিয়ে দিয়ে অনুষ্কা বলল, ‘বাড়িটার একটা জানলায় আলো জ্বলছিল৷’ তারপর ইলিনার পাশে বসে পড়ল : ‘সেদিন তোমাকে বলিনি—আজ বলছি৷ এই বাড়িটা আমাদের পূর্বপুরুষের—তিনহাজার বছরের পুরোনো৷ আমাদের মতন যারা…মানে, ইয়ে…তাদের প্রত্যেকের বাড়িতে এই ছবিটা লাগানো আছে৷ এই ছবিটার একটা সুপারন্যাচারাল পাওয়ার আছে৷ ওটা নিজে-নিজে অনেক কিছু করতে পারে—৷’
কথা বলতে-বলতে অনুষ্কা লক্ষ করল ইলিনার মুখে ভয়ের রেখা ফুটে উঠেছে৷ ও বিছানায় ঘষটে অনুষ্কার কাছ থেকে পিছিয়ে যেতে চাইছে৷
অনুষ্কা ওর হাত চেপে ধরল৷ অনুনয়ের গলায় বলল, ‘ইলিনা, প্লিজ… বিলিভ মি৷ আমি তোমার বন্ধু—বেস্ট ফ্রেন্ড৷ এটা ঠিকই যে, আমাদের লাইফ আর লাইফ স্টাইল তোমাদের চেয়ে আলাদা৷ কিন্তু বিশ্বাস করো, আমরা কখনও মানুষের ক্ষতি করার কথা ভাবতে পারি না৷ তুমি কি বিশ্বাস করবে, আমরা প্রায় চারশো বছর ধরে মানুষের রক্তের তেষ্টা ভুলে গেছি! তার বদলে আমরা ইঁদুর, কাঠবিড়ালি, চড়াই, পায়রা এসব দিয়ে খিদে-তেষ্টা মেটাই! আমার বাপি আর মা কী বলেন জানো? বলেন, আমাদের অবজেকটিভ হল রেগুলার চেষ্টা করে-করে ফাইনালি ভেজিটারিয়ান হয়ে ওঠা৷ হ্যাঁ, এটাই আমাদের চরম মুক্তি৷’
