‘তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে এসো—৷’ অনুষ্কা তাড়া দিল৷ গাড়ির পিছনের দরজাটা খুলে গেল৷
সম্পিকে গাড়িতে উঠতে বলল ইলিনা৷ তারপর ছাতা বন্ধ করে নিজে উঠল৷
সজনী ইতস্তত করছিল৷ বলল, ‘আমি বাড়ি যাব—৷’
অনুষ্কা বলল, ‘চিন্তা কোরো না—আমি সবাইকে বাড়িতে ড্রপ করে দেব৷’
ওরা তিনজনে পিছনের সিটে বসে দরজা বন্ধ করতেই গাড়ি ছেড়ে দিল৷
অনুষ্কা ওর বাবার সঙ্গে সম্পি আর সজনীর পরিচয় করিয়ে দিল৷ ওর বাবা গাড়িটা ইউ টার্ন নিয়ে ঘুরিয়ে বললেন, ‘কী বাজে বৃষ্টি! তোমরা সব একেবারে ভিজে গেছ দেখছি!’
ইলিনা সৌজন্যের ঢঙে বলল, ‘ও কিছু না, কাকু—বাড়িতে গিয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে নেব৷’
সমর্পিতার গা ঘেঁষে বসেছিল ইলিনা৷ তাই টের পাচ্ছিল সম্পি তখনও তিরতির করে কাঁপছে৷
ও চাপা গলায়, প্রায় ফিসফিস করে, জিগ্যেস করল, ‘সম্পি তোর কী হয়েছে রে? এবার শান্ত হ৷’
সমর্পিতা অস্পষ্টভাবে বলল, ‘কিচ্ছু না—৷’
অনুষ্কা ওদের কথা শুনতে পেয়েছিল৷ ও নরম সুরে বলল, ‘এখন ওকে ডিসটার্ব কোরো না৷ আমি সব জানি৷ পরে কখনও ওর সঙ্গে কথা বলব…৷’
সমর্পিতা অবাক হয়ে অনুষ্কার দিকে তাকাল, কিন্তু কিছু বলল না৷
ভিজে রাস্তায় গাড়ি চলতে লাগল৷
জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল সম্পি৷ বৃষ্টি এখনও পড়ছে৷ সেই বৃষ্টির ফোঁটার ঝিলিমিলির আড়ালে রনিতা ম্যাডামের পালটে যাওয়া মুখটা ও দেখতে পাচ্ছিল৷
আজ বৃষ্টি নেই৷ খোলা জানলার বাইরে অন্ধকার৷ বাতাসে গাছের পাতা নড়ছে৷
জানলার সামনে দাঁড়িয়ে অনুষ্কা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ছিল৷ কী দেখছিল কে জানে!
হঠাৎ করে ও ঘুরে দাঁড়াল৷ বিছানায় বসে থাকা ইলিনার দিকে সরাসরি তাকাল৷
বেশ কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকার পর গায়ের সবুজ রঙের টপটা কোমরের কাছ থেকে ইঞ্চিচারেক ওপরে তুলে ধরল ও৷
ওর নাভির ঠিক ওপরে কালো রঙে আঁকা একটা ছবি : একটা ফুলকে ঘিরে আছে দুটো সাপ—তাদের লেজের কাছটা একে অপরের সঙ্গে জড়ানো৷
ঠিক এই ছবিটাই লাগানো রয়েছে ওর ঘরের দেওয়ালে৷ এই ছবিটাই ওকে খাতার পাতায় আঁকতে দেখেছিল ইলিনা৷ তখন ওর ছবিটা ভালো লেগেছিল৷ ও তা থেকে ট্যাটুর ডিজাইন করতে চেয়েছিল৷ কিন্তু অনুষ্কা তাতে সায় দেয়নি৷ বাজে ওয়ার্থলেস ছবি বলে কাটাকুটি দাগ দিয়ে ছবিটা নষ্ট করে দিয়েছিল৷
অথচ সেই ছবিটাকেই বডি ট্যাটু করে বসে আছে ও!
‘এই ছবিটাকে তুমি বাজে ওয়ার্থলেস বলেছিলে—’ অভিযোগের সুরে বলে উঠল ইলিনা, ‘আর সেই ছবিটাকেই ট্যাটু করে বসে আছ! আশ্চর্য!’
অনুষ্কা অল্প হাসল৷ টপটা তুলে ধরা অবস্থায় কয়েকটা পা ফেলে ইলিনার খুব কাছে এগিয়ে এল৷ বলল, ‘তুমি ভুল করছ, ইলিনা—এটা মোটেই ট্যাটু নয়৷ হাত দিয়ে দ্যাখো…৷’
সত্যিই ইলিনা আঙুল ছোঁয়াল ছবিটায়৷ ছবিটা যে উল্কি নয় সেটা বুঝতে চাইল : ‘ট্যাটু নয় তো এটা তা হলে কী?’
‘এটা জন্মদাগ৷ মানে, জন্মচিহ্ন৷ আমাদের সবার পেটে আছে৷’
‘জন্মচিহ্ন মানে?’
‘জন্মচিহ্ন মানে জন্মের সময় থেকেই এই দাগটা আমাদের সবার পেটে থাকে…৷’
‘আমাদের সবার মানে কারা?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল ইলিনা৷
‘আমি, বাপি, মা—আমাদের সবার পেটে এই ছবি আছে—জন্মদাগ৷’
‘কেন? এ কী পিকিউলিয়ার ব্যাপার!’
টপটা ছেড়ে দিল অনুষ্কা৷ ওটা টেনেটুনে ঠিকঠাক করে নিল৷ তারপর ইলিনার চিবুকে হাত দিয়ে বলল, ‘পিকিউলিয়ার নয়, ইলিনা৷ ভ্যাম্পায়ারদের এটাই নিয়ম…৷’
‘ভ্যাম্পায়ার?’ ভয়ে সিঁটিয়ে গেল ইলিনা৷ অনুষ্কার হাতটা সরিয়ে দিল : ‘কী বলছ তুমি!’
‘হ্যাঁ, ইলিনা—’ নীচু গলায় বলল, ‘ভ্যাম্পায়ারদের চেনার এটাই সবচেয়ে বড় চিহ্ন৷ তা ছাড়া এই সিম্বলটা আমাদের কাছে খুব পবিত্র…’ দেওয়ালে লাগানো সাপ আর ফুলের ছবিটার দিকে দেখাল : ‘এটা আমাদের পোশাকের আড়ালে লুকিয়ে থাকে৷ তাই আমাদের দেখে সাধারণ মানুষ বলে মনে হয়…৷ অবশ্য এটা দেখতে পেলেও সবাই ট্যাটু ভাববে৷’
ইলিনা কাঁপছিল৷ ওর চোখ বড়-বড় হয়ে গিয়েছিল৷ ও ভয়ের চোখে সহপাঠীকে দেখছিল৷
অনুষ্কা ভ্যাম্পায়ার!
‘ইলিনা, প্লিজ…ভয় পেয়ো না৷ মানুষের মতো…আমাদের মধ্যেও… ভালো-খারাপ আছে৷ আমরা ভালো, ইলিনা, বিশ্বাস করো—৷’
ইলিনার মাথা ঝিমঝিম করছিল৷ চোখে ঝাপসা দেখছিল৷ ও মাথা পিছনে হেলিয়ে বিছানায় দু-হাতে ভর দিল৷
ওর চোখ গেল দেওয়ালে টাঙানো রাতের ছবিটার দিকে৷ জ্যোৎস্না ধোওয়া রাত৷ বিশাল প্রাসাদ৷ পূর্ণিমার চাঁদ৷
আগের দিন ছবিটা যেমন দেখেছিল আজ যেন একটু বদলে গেছে৷ প্রাসাদের ছায়ার পাশ থেকে চাঁদটা যেন অনেকটা দূরে সরে গেছে৷ আর আগের দিন, যতদূর ইলিনার মনে পড়ছে, বাড়িটার একটা জানলায় আলো জ্বলছিল৷
আজ আলো জ্বলছে দুটো জানলায়!
নিজেকে সামলে নিল ইলিনা৷ মাথা ঝিমঝিম করলে চলবে না৷ চোখে ঝাপসা দেখলে চলবে না৷
ও তাকাল অনুষ্কার মুখের দিকে৷
এই অপরূব রূপসী মেয়েটা ভ্যাম্পায়ার!
আজ টিফিনের সময় অনুষ্কা ইলিনাকে ডেকেছিল৷
ইলিনা ওর কাছে যেতেই ও বলেছে, ‘তোমার সঙ্গে অনেক কথা আছে৷ ভীষণ ইমপরট্যান্ট কথা৷ তুমি আজ ছুটির পর আমাদের বাড়ি চলো—প্লিজ৷’
অনুষ্কার মুখে আকুতির ভাব ফুটে উঠেছিল৷ মনে হচ্ছিল, এমন সব কথা ও ইলিনাকে বলতে চায় যেগুলো না বলতে পারলে ও কষ্ট পাবে৷
ইলিনা রাজি হয়েছিল৷ একইসঙ্গে ওর মনে হয়েছিল, রনিতা ম্যাডামের সমস্যাটা যদি সমাধান করতে হয় তা হলে অনুষ্কার সাহায্য দরকার৷ কারণ, সমর্পিতার ব্যাপারটা যে ইলিনা জানতে পেরেছে সেটা শুধু অনুষ্কার জন্য৷
