রনিতা ম্যাডাম স্বাভাবিক চেহারায় ফিরে এলেন৷ ঠোঁটে আঙুল তুলে ইশারায় সমর্পিতাকে চুপচাপ থাকতে বললেন৷
‘কই, কোথায় আগুন লেগেছে?’ পুরুষের গলা : ‘ঘর অন্ধকার কেন?’
‘কে অমন চিৎকার করছিল গো?’ মহিলার কণ্ঠস্বর : ‘কী-করে আগুন লাগল বলো দেখি…৷’
সমর্পিতা পিছন ফিরে চারজনকে দেখতে পেল৷ ওরা তখন বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে হুড়মুড় করে টিচার্স রুমে ঢুকে পড়েছে৷
সমর্পিতা কিছু বলে ওঠার আগেই মানুষের ছদ্মবেশে থাকা পিশাচটা বলে উঠল, ‘এই তো, এই তারটা শর্ট সার্কিট হয়ে আর-একটু হলেই আগুন লেগে যাচ্ছিল৷ ভাগ্যিস আমি এই ডাস্টারটা দিয়ে সঙ্গে-সঙ্গে চেপে ধরেছি—৷’
টেবিল থেকে একটা ডাস্টার তুলে নিয়ে দেখালেন রনিতা৷
সম্পি স্থির চোখে ওঁকে দেখছিল৷ পিশাচরা তা হলে অভিনয়টা ভালোই জানে!
রনিতা বললেন, ‘সমর্পিতা থাকায় একটা বড় হেলপ হয়েছে৷ ও সঙ্গে-সঙ্গে ওরকম না চেঁচালে তোমরা কি এত চটপট আসতে?’ সমর্পিতার দিকে তাকিয়ে হাসলেন : ‘থ্যাংক য়ু, সমর্পিতা৷ তোমাকে আমি কাল একটা রিওয়ার্ড দেব…৷’
ঠিক তখনই সাদা আলোর ঝলকানি, আর তারপরই কড়কড় শব্দে বাজ পড়ল কোথাও৷
.
৷৷আট৷৷
সমর্পিতা স্কুল বিল্ডিং-এর বাইরে এসে দাঁড়াল৷ বৃষ্টির তেজ খানিকটা কমে এসেছে৷ মেঘলা আকাশের সঙ্গে সন্ধের অন্ধকার মিশে গিয়ে ছাই রং অনেক গাঢ় হয়েছে৷
সমর্পিতার ব্যাগে ছাতা আছে কিন্তু ও ছাতা বের করল না৷ একে তো ওর সর্বাঙ্গ চুপচুপে ভেজা—ছাতা ওকে নতুন কোনও নিরাপত্তা দিতে পারবে না৷ বরং বৃষ্টির জল ওকে রনিতা ম্যাডামের মতো ভয়ংকর প্রাণীগুলোর হাত থেকে বাঁচাবে৷
সমর্পিতা বড়-বড় শ্বাস নিচ্ছিল, থরথর করে কাঁপছিল৷ ওর বুকের ভেতরে ঢিপঢিপ করে শব্দ হচ্ছিল৷ তার সঙ্গে বেশ শীত করছিল৷
ও কালো আকাশের দিকে তাকাল৷ বৃষ্টি উপহার দেওয়ার জন্য ঈশ্বরকে মনে-মনে কৃতজ্ঞতা জানাল৷
স্কুল বিল্ডিং-এর কাছ থেকে পিচের রাস্তা এঁকেবেঁকে চলে গেছে মেন গেটের দিকে৷ সেই রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করল সম্পি৷ হেঁটে যাওয়ার সময় ও বারবার বাঁ-দিকের ঝোপঝাড় আর গাছপালার দিকে তাকাচ্ছিল৷ এই গাছপালার আড়ালে রনিতা ম্যাডামের মতো কেউ লুকিয়ে নেই তো?
কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গেই ওর মনে হল, যেরকম জোরে বৃষ্টি পড়ছে তাতে খোলা জায়গায় ওরা থাকতে সাহস পাবে না৷ বৃষ্টিতে গায়ে ফোসকা পড়ে যাবে৷ আর যদি সেদিনের মতো ছাতা মাথায় দিয়ে ঘোরাঘুরির কথা ভাবে তাতেও লাভ নেই৷ কারণ, এ-বৃষ্টি ছাতায় তেমন মানবে না৷
সম্পি তাড়াতাড়ি হাঁটছিল৷ বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে যাবে৷ স্কুল থেকে বেরিয়েই বাস কিংবা অটো পেলে হয়৷
ভেজা পিচের রাস্তায় বৃষ্টির ফোঁটা আছড়ে পড়ছে৷ রাস্তার ধারে লাগানো সোডিয়াম ভেপার ল্যাম্পের আলো রাস্তায় পড়ে কমলা রঙের আলোর ফুলকি তৈরি করছে৷ স্কুলের দু-চারজন মেয়ে তাদের গার্জেনের সঙ্গে ফিরছে৷ এ ছাড়া রাস্তাটা বেশ ফাঁকা-ফাঁকা৷ আর দূরের খেলার মাঠটা বৃষ্টিতে ঝাপসা৷
‘এই, সম্পি—৷’
সমর্পিতা চমকে উঠল৷ বুক ধড়াস করে উঠল৷ ডাক লক্ষ্য করে ফিরে তাকাল৷
ও খেয়ালই করেনি, একটা বড় নিমগাছের নীচে দুটো মেয়ে ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে রয়েছে৷
ইলিনা আর সজনী৷
ওরা দুজনে সম্পির কাছে এগিয়ে এল৷
‘তোর জন্যে চিন্তা হচ্ছিল৷ তাই বাড়ি যাইনি—ওয়েট করছি৷’ ইলিনা বলল, ‘রনিতা ম্যাডাম কী শাস্তি দেয় না দেয়৷ আমি ওয়েট করব শুনে সজনীও থেকে গেল৷’
‘তুই ভিজছিস কেন? ছাতা নেই?’ সজনী জিগ্যেস করল৷
‘তুই এরকম কাঁপছিস কেন?’ ইলিনা৷
সমর্পিতা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না৷ ইলিনাকে জাপটে ধরে হাউ-হাউ করে কাঁদতে শুরু করল৷
ইলিনা হকচকিয়ে গেল৷ কোনও-রকমে ছাতা সামলে সম্পির ভেজা পিঠে হাত বোলাতে লাগল আর বারবার বলতে লাগল, ‘কী হয়েছে রে, সম্পি—কী হয়েছে?’
সম্পি কাঁদতেই থাকল৷ ওর শরীরটা কেঁপে-কেঁপে উঠতে লাগল৷ আর একইসঙ্গে পাগলের মতো মাথা নেড়ে বলতে লাগল, ‘কিছু হয়নি, কিছু হয়নি৷’
ইলিনা আর সজনী কিছুতেই ওকে শান্ত করতে পারছিল না৷
একটু পরে দু-পাশ থেকে সম্পিকে জাপটে ধরে ওরা মেন গেটের দিকে এগিয়ে চলল৷ ইলিনার মনে হল, রনিতা ম্যাডাম নিশ্চয়ই সম্পিকে সাংঘাতিক অপমান করেছেন, কিংবা চড়-থাপ্পড় মেরেছেন বা কান মূলে দিয়েছেন৷
ওরা যখন স্কুলের গেটের কাছাকাছি এসে পড়েছে তখন একটা গাড়ির হেডলাইটের জোরালো আলো ওদের চোখে-মুখে এসে পড়ল৷
আলোর দিকে তাকিয়ে ওদের চোখ ধাঁধিয়ে গেল৷ বৃষ্টির ফোঁটাগুলোকে ওরা স্পষ্ট দেখতে পেল৷ কিন্তু আলোর পিছনে সব অন্ধকার—কিছুই দেখা যাচ্ছে না৷
গাড়িটা ওদের দিকে ধীরে-ধীরে এগিয়ে আসতে শুরু করল৷
সেটা দেখে ইলিনারা পিচের রাস্তার পাশে ঘাসজমির দিকে সরে গেল৷ কিন্তু গাড়িটা গতিপথ বদলে ওদের মুখোমুখি এসে পথ আগলে দাঁড়াল৷
ইলিনা একটু ভয় পেয়ে গেল৷ সজনীও৷ গাড়িটা ওদের পথ আগলে দাঁড়াল কেন?
ঠিক তখনই গাড়ি থেকে কে যেন ডেকে উঠল, ‘ইলিনা, এসো—সবাই গাড়িতে উঠে এসো…৷’
অনুষ্কার গলা৷
অনুষ্কা এখনও বাড়ি যায়নি? ছুটির পর এতক্ষণ ধরে ও কী করছে?
ওরা তিনজনে গাড়ির পাশে গিয়ে দাঁড়াল৷ দেখল সামনের জানলার কাচটা সামান্য নামানো৷ সেখানে আবছাভাবে অনুষ্কার মুখ দেখা যাচ্ছে৷ ওর পাশেই স্টিয়ারিং-এ ওর বাবা৷
