সমর্পিতাকে দিশেহারা কাবু অবস্থায় পেয়ে রনিতা যেন বেশ মজা পেয়ে গেছেন৷ ঠোঁটজোড়া ছুঁচলো করে টিউবলাইটগুলোর দিকে একবার তাকালেন৷ তারপর ক্ষণপ্রভার গতিতে চোখের পলকে পৌঁছে গেলেন দেওয়ালে গাঁথা ইলেকট্রিক ওয়ারিং-এর কাছে৷ তারগুলোর ওপরে হিংস্র কামড় বসিয়ে দিলেন৷
আলোর ফুলকি ছিটকে বেরোল৷ ‘ফট’ করে একটা শব্দ হল৷ এবং ঘরের আলো নিভে গেল৷ ঘুরন্ত পাখার গতি কমতে লাগল৷
ঘরটা কেমন অদ্ভুত আঁধারে ছেয়ে গেল৷ জানলার বাইরে মেঘ আর বৃষ্টি যেন অকালসন্ধ্যা তৈরি করে দিয়েছে৷ সম্পির চোখের সামনে রনিতা ম্যাডামের অপচ্ছায়া৷ তাঁর চোখের অন্ধকার কোটরে দুটো সাদা আলোর বিন্দু ধকধক করে জ্বলছে৷ আর একইসঙ্গে শোনা যাচ্ছে চাপা খিলখিল হাসি৷
কর্কশ গলায় পিশাচটা বলল, ‘এবার বুঝেছিস, আমাদের কী শক্তি! আজকের এসব ব্যাপার কাউকে বলবি না৷ কাউকে না৷ যদি বলিস, তা হলে—যা বললাম—তুইও পরানের মতো হয়ে যাবি…৷’
এমন সময় তীব্র বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল৷ পরক্ষণেই প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ল৷
সেই কানফাটানো আওয়াজে সম্পির আতঙ্কের ঘোরটা হঠাৎই কেটে গেল৷ ও ‘বাঁচাও! বাঁচাও!’ বলে চিৎকার করতে শুরু করল এবং কোন এক শক্তিতে খোলা দরজার দিকে মরণপণ ছুট লাগাল৷
পিশাচটা ছুটন্ত সম্পিকে লক্ষ করে লাফ দিল৷ দু-লাফে পৌঁছে গেল দরজার কাছে৷
কিন্তু সম্পি ততক্ষণে বাইরের চাতালে এসে পড়েছে৷ ঝুপুস বৃষ্টি ওকে যেন হারানো শক্তি ফিরিয়ে দিল৷ ও ফিরে তাকাল টিচার্স রুমের দরজার দিকে৷
রনিতা ম্যাডাম সম্পিকে তাড়া করার ঝোঁকে টিচার্স রুম ছেড়ে চাতালে এসে পড়েছিলেন৷ কিন্তু বৃষ্টির জল গায়ে পড়তেই আঁতকে উঠলেন৷ এমনভাবে কাতরে উঠলেন যেন বৃষ্টির ফোঁটায় গায়ে ফোসকা পড়ছে৷
যন্ত্রণার ‘উঃ! আঃ!’ শব্দ করে রনিতা একলাফে টিচার্স রুমে আবার ঢুকে গেলেন৷
সম্পি সেটা দেখে অবাক হয়ে অঝোর বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে ভিজতে লাগল৷ বৃষ্টির জলে কী এমন শক্তি আছে যে, এই পিশাচগুলো বৃষ্টির জলের ‘জ্বালা’ সইতে পারে না?
টিচার্স রুম এখন বেশ অন্ধকার৷ তাই রনিতা ম্যাডামকে সম্পি ভালো করে দেখতে পাচ্ছিল না৷ কিন্তু ম্যাডাম ঘরে ঢুকে পড়ার আগে সম্পি একটা ব্যাপার লক্ষ করেছে৷ ওঁর শরীরে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ামাত্রই সেখান থেকে সাদা ধোঁয়া বেরিয়েছে৷ গরম লোহার শিক আচমকা জলে ডোবালে যেমনটা হয়৷
তা হলে কি সত্যি-সত্যিই বৃষ্টির ফোঁটায় এই পিশাচগুলোর ছ্যাঁকা লাগে? সেইজন্যই কি সেই ভয়ংকর রাতে এদের মাথায় ছাতা ছিল?
সম্পি তখনও চিৎকার করছিল : ‘কে কোথায় আছ, শিগগির এসো! দোতলায় আগুন লেগেছে—আগুন!’
কিন্তু বৃষ্টির ফোঁটার ব্যাপারটা বুঝে ফেলার পর ওর হারানো সাহস খুব তাড়াতাড়ি ফিরে এল৷ তা ছাড়া ও লোকজনের ছুটে আসার শব্দ পাচ্ছিল৷
সম্পি আঁজলা করে বৃষ্টির জল ধরতে লাগল৷ এবং এগোতে লাগল টিচার্স রুমের দিকে৷ ওর ভেতরে এখন একটা রাগ টগবগ করে ফুটছিল৷
রনিতা ইলেকট্রিকের তারে কামড় বসানোমাত্রই শর্ট সার্কিট হয়ে স্কুল বিল্ডিং-এর অনেকটা অংশের আলো নিভে গেছে৷ সেই সময় দুজন দারোয়ান রোজকার মতো একতলার ঘরগুলোর জানলা-দরজা বন্ধ করে দরজায়-দরজায় তালা দিচ্ছিল৷ আচমকা অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় ওরা হকচকিয়ে যায়৷ আর তারপরই সম্পির চিৎকার ওদের কানে এল৷
সম্পির চিৎকার সার্ভেন্টস কোয়ার্টারেও পৌঁছেছিল৷ সেখান থেকে বলাইদা আর মলিনাদি হন্তদন্ত হয়ে এসে দারোয়ানদের সঙ্গে জড়ো হল৷ ওরা চারজন তাড়াতাড়ি সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতে শুরু করল৷ বুঝতে পারল, চিৎকারটা দোতলার চাতাল থেকে আসছে৷
তা হলে কি দোতলাতেই আগুন লেগেছে?
কিন্তু ওরা চারজনে চাতালে এসে কাউকে দেখতে পেল না৷ আর আগুনও দেখতে পেল না৷
কারণ, সম্পি তখন বৃষ্টির জল আঁজলা করে নিয়ে টিচার্স রুমে ঢুকে পড়েছে৷ ওর শরীর থরথর করে কাঁপছে৷ সারা গা সপসপে ভেজা৷ মাথার চুল থেকে জলের ধারা গড়িয়ে পড়ছে৷ চুলের গোছা কপালের ওপরে নেমে এসেছে৷ আর সেই ভেজা চুলের ফাঁক দিয়ে ওর দুটো রাগি চোখ দেখা যাচ্ছে৷
‘কোথায় গেলি? আয়, সামনে আয়—’ পিশাচকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল ডাকাবুকো মেয়েটা৷
রনিতা তখন একটা আলমারির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে লুকোতে চেষ্টা করছেন৷ ওঁর অন্ধকার গর্তের মতো চোখ দুটো সম্পির দিকে তাকিয়ে স্থির৷ আসলে ওরা তখন সম্পির আঙুলের ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে পড়া বৃষ্টির জলের দিকে লক্ষ রাখছিল৷ অপেক্ষা করছিল, কখন সেই চুঁইয়ে পড়া বন্ধ হবে৷ অর্থাৎ মেয়েটার এক আঁজলা জল কখন শেষ হবে৷
জল শেষ হয়ে যাবে বলে সমর্পিতার মনে কিন্তু ভয় ছিল না৷ ও জানে ওর পোশাক-আশাক থেকে শুরু করে সর্বাঙ্গ বৃষ্টির জলে ভিজে সপসপে৷ এই অবস্থায় ওর পিশাচটাকে জড়িয়ে ধরার খুব সাধ জাগছিল৷
সম্পি হঠাৎই খেয়াল করল, আলমারির পাশে দাঁড়ানো রনিতার চেহারা ধীরে-ধীরে বদলে যাচ্ছে—স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে আবার৷ একইসঙ্গে দোতলার চাতালে অনেকের পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে—কথা বলতে-বলতে কারা যেন টিচার্স রুমের দিকে এগিয়ে আসছে৷
সম্পির হাতের জল শেষ হয়ে গিয়েছিল৷ রনিতাকে ও এখন আরও স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছিল৷
রনিতা হিসহিস করে চাপা গলায় বললেন, ‘আজকে যা কিছু দেখলি কাউকে বলবি না৷ তা হলে তোর সর্বনাশ হবে৷ মনে রাখিস, আমি একা নই—আমরা সবাই মিলে তোকে অনায়াসে খতম করে দেব…৷’
