‘চুপ করে আছ কেন? বলো৷ পরানের অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথটা নিয়ে তুমি একটু বাড়াবাড়ি রকমের ইনভলভড হয়ে পড়েছ না?’
সমর্পিতা আর চুপ করে থাকতে পারল না৷ আলতো গলায় বলল, ‘ম্যাডাম, ওটা অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথ নয়—মার্ডার৷’
‘তোমাকে কে বলেছে মার্ডার?’ ধৈর্য আরও কমে গেল : ‘পুলিশ ইনভেস্টিগেট করে যা রিপোর্ট দেওয়ার দিয়ে দিয়েছে৷ তা ছাড়া সবাই জানে এই স্কুলটা একটু ইয়ে…মানে, ভূতুড়ে…একটু দোষ আছে৷ আর সেদিন রাতে তুমি বা রবিনা যা দেখেছ সবটাই—৷’
‘হ্যালুসিনেশান৷ আমাদের দেখার ভুল—তাই তো?’ ম্যাডামের কথার খেই ধরে সমর্পিতা বলল৷
সম্পির কথার সুরে ব্যঙ্গ আর বিদ্রোহের ছোঁয়া পেয়ে রনিতা খেপে উঠলেন : ‘তোমার আস্পর্ধা তো কম নয়! শিক্ষা-দীক্ষা পাওনি? বাজে নোংরা মেয়ে!’
সম্পির মাথায় আগুন জ্বলে গেল৷ ও ভুলে গেল কাকে কী বলছে৷ ক্ষিপ্ত গলায় ও চেঁচিয়ে উঠল, ‘আমি বাজে নোংরা মেয়ে! তুই কী? তোর সেই শাড়িটা কোথায়? ওই যে, পাড়ের কাছে শঙ্খের ডিজাইন করা৷ যেটা পরে সেদিন অন্ধকারে ছাতা মাথায় দিয়ে ওই মরা গাছটায় হনুমানের মতো লাফাচ্ছিলি৷ শাড়িটা আছে, না পুড়িয়ে ফেলেছিস?’
ঘরের ভেতরে যেন বাজ পড়ল৷ সম্পির কথাগুলো বুলেটের মতো বিঁধে গেল রনিতা ম্যাডামের গায়ে৷
.
৷৷সাত৷৷
ওঁর মুখটা অলৌকিকভাবে পালটে যেতে লাগল৷ গাল দুটো বসে গেল৷ রং ফ্যাকাশে হয়ে গেল! ঠোঁটজোড়া টুকটুকে লাল৷ চোখ দুটো কোটরে ঢুকে গিয়ে দুটো কালো অন্ধকার গর্ত তৈরি হল৷ সেই গর্তের কেন্দ্রবিন্দুতে দুটো উজ্জ্বল সাদা ফুটকি—হাই পাওয়ারের জোনাকির মতো জ্বলছে৷
রনিতা ম্যাডাম অদ্ভুত এক কর্কশ গলায় বললেন, ‘তোর লপচপানি বড্ড বেড়েছে৷ তোকে ঠিক পথে আনা দরকার৷ আমাদের যে কতটা শক্তি তুই জানিস না…৷’
সম্পি ভয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল৷ গল্পে পড়া কিংবা সিনেমায় দেখা আজগুবি ব্যাপারটা যে ওর চোখের সামনে ঘটে যাচ্ছে সেটা কিছুতেই ও বিশ্বাস করতে পারছিল না৷ ওর ভেতর থেকে সমস্ত বেপরোয়া ভাব আর সাহস চুঁইয়ে-চুঁইয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল৷ ভয়ে ওর জিভ শুকিয়ে গেছে, পা দুটো মেঝেতে এঁটে বসেছে৷
খপ করে হাত বাড়িয়ে টেবিলে রাখা একটা পেপারওয়েট তুলে নিলেন রনিতা৷ ওঁর হাতের আঙুলগুলো কেমন কালো-কালো হাড্ডিসার হয়ে গেছে৷ আর আঙুলের নখগুলো এখন কেমন লম্বা আর বাঁকানো৷
রনিতা খলখল করে হাসলেন৷ তারপর কর্কশ গলায় বললেন, ‘এটা খুব ছোঁয়াচে রোগ৷ কী করে কখন যে হয়ে গেছে একটুও টের পাইনি৷ তোর গায়ে একটা কামড় বসালে তুইও একপলকে আমাদের মতন হয়ে যাবি৷ তখন তেষ্টায় পাগল হয়ে ঘুরবি…আর যদি মরণকামড় দিই তা হলে তুই পরানের মতো শেষ হয়ে যাবি৷ সে-রাতে পরানকে শুষে শেষ করে আমরা আনন্দে ওই মরা গাছটায় নাচানাচি করছিলাম৷ তুই কি চাস আরও একবার তাই করি?’
আকাশে এমনভাবে বিদ্যুৎ চমকাল যেন মেটাল হ্যালোজেন বাতি ঝলসে উঠল৷ সমর্পিতা আর রনিতা ম্যাডামের মুখে-গায়ে সাদা আলো ঝিলিক মেরেই মিলিয়ে গেল৷
সমর্পিতা অনেক কিছুই করার কথা ভাবছিল, কিন্তু কোন এক অলৌকিক অভিশাপ ওকে যেন পায়ে পেরেক ঠুকে মেঝেতে দাঁড় করিয়ে রেখেছে৷
ও একবার খোলা দরজার দিকে তাকাচ্ছিল, আর-একবার জানলার দিকে৷ ও কি একছুটে বাইরের চাতালে চলে যেতে পারবে? তারপর চেঁচিয়ে লোক জড়ো করতে পারবে না? কিন্তু এখন কি ম্যাডামরা কেউ আছেন? বড়দিও হয়তো বাড়ি চলে গেছেন৷ এখন শুধু সার্ভেন্টস কোয়ার্টারের লোকজনই যা ভরসা৷ কিন্তু এখান থেকে চিৎকার করলে সেই আওয়াজ কি সার্ভেন্টস কোয়ার্টার পর্যন্ত পৌঁছবে? এই বৃষ্টিতে কেউ কি আসবে?
সম্পি পাগলের মতো হয়ে যাচ্ছিল৷ ওই তো, রনিতা পিশাচটা খলখল করে হাসছে৷ ওকে ঠেকাতে কিছু একটা করতে হবে, করতেই হবে৷
সম্পি হঠাৎ কোথা থেকে শক্তি খুঁজে পেল কে জানে! ও দু-হাতের দুটো প্রচণ্ড ঘুসি বসিয়ে দিল টেবিলে৷ ভয়ংকর শব্দ হল৷ বিশাল টেবিলটা থরথর করে কেঁপে উঠল৷
আর রনিতা ব্যঙ্গের হাসি হেসে উঠলেন৷ তারপর বড় করে হাঁ করলেন৷
টিউবলাইটের আলোয় পিশাচের দাঁতগুলো ঝিকিয়ে উঠল৷ সম্পির দেখতে কোনও অসুবিধে হল না৷
রনিতার দু-পাটিতেই হাঙরের মতো কয়েক সারি করে ইস্পাতের দাঁত৷ ঝকঝকে এবং ছুঁচলো৷
পপকর্ন খাওয়ার ভঙ্গিতে লোহার পেপারওয়েটটা হাঁ করা মুখের ভেতরে ছুড়ে দিলেন৷ তাপর কড়মড়-কড়মড় করে ওটা চিবোতে লাগলেন৷ ঠিক যেন তালমিছরির ডেলা চিবিয়ে গুঁড়ো করছেন৷
একটু পরেই লোহার গুঁড়ো থু-থু করে টেবিলে উগরে দিলেন রনিতা৷ তারপর পাতলা ঠোঁটের ওপরে কয়েকবার জিভ বুলিয়ে নিয়ে সম্পিকে লক্ষ করে হাসলেন৷
সম্পির শিরদাঁড়া বেয়ে বরফজলের স্রোত নেমে গেল৷ এই পিশাচের সঙ্গে শক্তিতে পেরে ওঠা অসম্ভব৷ সম্পি একমাত্র পালানোর চেষ্টা করতে পারে৷ কিন্তু পা দুটো যে কিছুতেই নড়তে চাইছে না৷
টেবিলে ঘুসি মারার পর থেকেই সম্পির দু-হাতের মুঠো ব্যথা করছিল৷ ও হাত কচলে ব্যথা তাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল৷ কিন্তু ভয়…ভয়টা তাড়ানো যায় কেমন করে?
রনিতা ঘষা-ঘষা গলায় বললেন, ‘শোন মেয়ে, এই মুহূর্তে তুই যা-যা দেখছিস সবই তোর দেখার ভুল৷ এ-কথা মনে থাকে যেন! সব হ্যালুসিনেশান৷’ তারপর একটু রাগি কর্কশ স্বরে বললেন, ‘তোর সাহস তো কম নয়! আমাদের সঙ্গে মোকাবিলা করতে আসিস! এই দেখ…৷’
