দোতলার এই চাতালটাকে অনেকটা ছাদের মতো দেখায়৷ চাতালের গা ছুঁয়ে একটা কৃষ্ণচূড়া আর একটা কাঁঠাল গাছ উঠেছে৷
চাতালের একপাশে বেশ বড়সড় টিচার্স রুম৷ সম্পি কোনাকুনিভাবে চাতালটা পেরিয়ে টিচার্স রুমের কাছে গেল৷ তখন টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে৷
রুমের চওড়া দরজায় বাদামি রঙের ভারী পরদা ঝুলছে৷ পরদার পাশ দিয়ে ঘরটা একচিলতে দেখা যাচ্ছে৷ আর ভেতর থেকে কথাবার্তার শব্দ শোনা যাচ্ছে৷
চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল সমর্পিতা৷ নিজেকে সাহস জোগানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল৷ রনিতা ম্যাডাম আর যা-ই করুন নিশ্চয়ই মারধোর করবেন না!
বুকের ভেতরে ধকধক শব্দ শুনতে পাচ্ছিল সম্পি৷ ওর হাত সামান্য কাঁপছে নাকি?
দূর! যা হয় হবে!
এক হাতে ভারী পরদা সরাল ও৷ তারপর জুতোয় শব্দ তুলেই ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল৷
ঘরে মাত্র দুজন টিচার : রনিতা ম্যাডাম আর রবিনা ম্যাডাম৷ ওঁরা পাশাপাশি দুটো চেয়ারে বসে হোম লোন আর ব্যাঙ্ক ইন্টারেস্ট নিয়ে কীসব আলোচনা করছিলেন৷ সমর্পিতাকে দেখেই ওঁরা চুপ করে গেলেন৷ তারপর রনিতা বললেন, ‘এসো, সমর্পিতা, এসো…৷’
রবিনা ম্যাডাম উঠে দাঁড়ালেন৷ ম্যাডামের দিকে তাকিয়ে সমর্পিতা ছোট্ট করে হাসল৷ কিন্তু ম্যাডাম ওর দিকে তাকালেন শুধু—হাসলেন না৷ টেবিলে রাখা নস্যি রঙের কাঁধব্যাগটা তুলে নিয়ে চুপচাপ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন৷ ওঁর হাবভাব দেখে মনে হল তিনি যেন সমর্পিতার ঘরে ঢোকার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন৷ নিশ্চয়ই রনিতা ম্যাডাম ওঁকে বলে রেখেছিলেন যে, সম্পিকে তিনি কথা বলার জন্য টিচার্স রুমে ডেকে পাঠিয়েছেন৷
টিচার্স রুমে ঢুকে সবচেয়ে প্রথমে যেটা চোখে পড়ে সেটা হল প্রকাণ্ড একটা টেবিল৷ টেবিলটা প্রায় কুড়ি ফুট লম্বা, পাঁচ ফুট চওড়া৷ মেহগনি কাঠের তৈরি, ঝকঝকে পালিশ৷ টেবিলের আটটা পায়া আটটা সিংহের থাবা৷ টেবিলের নানান নকশা আর কারুকাজ দেখে বোঝা যায় এ টেবিল ব্রিটিশ আমলের কনফারেন্স টেবল৷
ঘরের একপাশে চারটে কাঠের আলমারি, আর তার পাশে একটা স্টিলের আলমারি৷
তার ঠিক বিপরীতে একটা কাঠের র্যাক—তাতে অনেকগুলো ক্লাস রেজিস্টার, চকের বাক্স আর ডাস্টার৷ র্যাকের পাশে বড়-বড় তারিখওয়ালা একটা ক্যালেন্ডার৷
ঘরে তিনটে চার ব্লেডের সিলিং ফ্যান—তবে এখন একটা চলছে৷ তার হাওয়ায় রনিতা ম্যাডামের কানের পাশে চুল উড়ছে৷
আকাশ মেঘলা থাকায় ঘরে দুটো টিউবলাইট জ্বলছে৷ রনিতা ম্যাডামের পিছনে তিনটে বিশাল-বিশাল জানলা—সম্পিদের ক্লাসরুমের মতো৷ খোলা জানলা দিয়ে আকাশের মেঘ দেখা যাচ্ছে, তার সঙ্গে বাতাসে মাথা ঝাঁকানো পাগল গাছপালা৷
কোকিলের ডাক শুনতে পেল সম্পি৷ এই ডাকটা ওকে যেন ভরসা জোগাল৷
সম্পি টেবিলের কাছে এগিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু বসেনি৷ কারণ, ম্যাডাম ওকে বসতে বলেননি৷
টেবিলের এপার থেকে ও রনিতা ম্যাডামকে দেখছিল৷
রনিতা ম্যাডামের সামনে তিন-চার ভাগে ভাগ করে রাখা ক্লাস টেস্টের খাতা৷ খাতার ওপরে লোহার পেপার-ওয়েট চাপানো৷ খাতার পাতার কোনাগুলো পাখার হাওয়ায় উড়ছে৷
খাতাগুলোর পাশে রনিতার কাঁধ-ব্যাগ৷ গাঢ় নীল রঙের ব্যাগ—ব্যাগের খোলা মুখ দিয়ে ছাতার রঙিন বাঁট দেখা যাচ্ছে৷
‘এদিকে এসো, সমর্পিতা—এপাশটায় এসো…৷’ হাতের ইশারায় ওকে নিজের কাছে ডাকলেন ম্যাডাম৷
‘না, ম্যাডাম—এখানেই ঠিক আছি৷’ কথা বলতে-বলতে হাতে ঝোলানো স্কুল-ব্যাগটা টেবিলের ওপরে রাখল সম্পি৷
হাসলেন রনিতা ম্যাডাম৷ বললেন, ‘কোনও ভয় নেই, সমর্পিতা— এপাশটায় এসো, আমার কাছে এসো৷ তোমাকে আমি কানও মুলব না, মারধোরও করব না৷ তবে হ্যাঁ—’ চওড়া করে হাসলেন রনিতা : ‘একটু বকাবকি হয়তো করব৷ এসো…এপাশটায় এসো—৷’
এরপর আর আপত্তি করা যায় না৷
টেবিলের পরিসীমা ধরে ধীরে-ধীরে এগোতে শুরু করল সমর্পিতা৷ ম্যাডাম মুখে বলছেন বটে ‘কোনও ভয় নেই’, কিন্তু যদি রাগের মাথায় কান-টান মুলে দেন! তা হলে কিন্তু বড় প্রেস্টিজের ব্যাপার হবে৷
‘আজকাল তোমার পড়াশোনায় একটুও মন নেই কেন বলতে পারো?’ বকুনির পালা শুরু করে দিলেন রনিতা : ‘ক্লাসে সবসময় দেখি অন্যমনস্ক৷ এরকম করলে তো তোমার রেজাল্ট অনেক নীচে নেমে যাবে!’
সমর্পিতা ততক্ষণে ম্যাডামের বেশ কাছে পৌঁছে গেছে—তবে মোটেই হাতের নাগালের মধ্যে নয়৷ কাঁচমাচু মুখ করে দাঁড়িয়ে ও ম্যাডামের ভর্ৎসনা গায়ে মাখছিল৷
‘আজও ক্লাসে দেখলাম তুমি কোনও পড়া বলতে পারছ না৷ ইতিহাস বলে যে একটা সাবজেক্ট আছে সেটাই বোধহয় তুমি ভুলে গেছ৷’ কথা বলতে-বলতে উঠে দাঁড়ালেন রনিতা : ‘সত্যি করে বলো তো, তোমার কী প্রবলেম হয়েছে? লেখাপড়া ছেড়ে তুমি এখন কী নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছ?’
সমর্পিতা মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে ছিল৷ মিনমিনে গলায় বলল, ‘কিছু নিয়ে তো মাথা ঘামাচ্ছি না, ম্যাডাম—পড়ছি…৷’
‘ছাই পড়ছ!’ ধমকে উঠলেন রনিতা, ‘আসলে তুমি স্কুলের ওই অ্যাক্সিডেন্টটা নিয়ে বড্ড বেশি ইনভলভড হয়ে পড়েছ, তাই না?’
সমর্পিতা চুপ করে রইল৷
জানলার বাইরে মেঘ ডাকল৷ বৃষ্টিও জোরে শুরু হল৷ রনিতা বৃষ্টির শব্দে জানলার দিকে একবার তাকালেন৷ তারপরই ব্যাগ থেকে ছাতাটা টেনে বের করে নিজের হাতের কাছে রাখলেন৷
সম্পিকে চুপ করে থাকতে দেখে ম্যাডামের ধৈর্য কয়েক ডিগ্রি কমে গেল৷
