ব্যাপারস্যাপার দেখে ইলিনার মনে হচ্ছিল, সমর্পিতা যেন শখের গোয়েন্দা হয়ে উঠেছে৷ এটা যেমন ইলিনাদের চোখে পড়ছে তেমন অন্যদেরও নিশ্চয়ই চোখে পড়ছে৷ তা হলে সেই রাতের ওই ভয়ংকর তিনজন…তারাও নিশ্চয়ই সমর্পিতার পাগলামো দেখছে৷ তারপর যদি…৷
ইলিনা আর ভাবতে পারছিল না৷ অনুষ্কার রহস্যময় কথাগুলো ওর মাথার ভেতরে ঝড় তুলছিল৷
টিফিনের পরের পিরিয়ডটায় রনিতা ম্যাডামের ইতিহাস৷ তিনি ক্লাসে এসে নিজস্ব বিরক্তিকর স্টাইলে পড়াতে লাগলেন৷ তারপর আজকের ‘বলির পাঁঠা’ হিসেবে সম্পিকে বেছে নিলেন৷ যত কঠিন-কঠিন প্রশ্ন ওর দিকে ছুড়ে দিলেন৷
সম্পি প্রায় কোনও প্রশ্নেরই উত্তর দিতে পারছিল না৷ ফলে ওকে হেনস্থা করার সাফল্যে রনিতা ম্যাডামের চোখ চকচক করছিল৷
সমর্পিতাকে বাঁচানোর জন্য অনুষ্কা বারবার উত্তর দিতে চেয়ে হাত তুলছিল, কিন্তু রনিতা ম্যাডাম সেটা যেন দেখেও দেখছিলেন না৷
একসময় তিনি ঠান্ডা চোখে অনুষ্কার দিকে তাকালেন৷ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ধারালো গলায় কেটে-কেটে বললেন, ‘আমি জানি তুমি সব জানো৷ কিন্তু তোমার কাছ থেকে আমি কিছু জানতে চাইছি না৷’
সম্পিকে যাচ্ছেতাইভাবে নাস্তানাবুদ করার পর ওকে ভালোরকম বকাবকি করলেন রনিতা ম্যাডাম৷ তারপর বললেন, ‘তুমি ছুটির পর আমার সঙ্গে দেখা করবে৷ তোমাকে ঠিক পথে আনা দরকার…৷’
সম্পি উঠে দাঁড়িয়ে মাথা নীচু করে ঘাড় নাড়ল৷
ইলিনা লক্ষ করল, সম্পির মুখচোখ লাল৷ প্রায় কাঁদোকাঁদো অবস্থা৷
রনিতা ম্যাডাম চলে যাওয়ার পর সম্পি ইলিনাকে বলল, ‘সবাই জানে আমি পড়াশোনায় বাজে…তাও কেন যে আমাকে রনিতা ম্যাডাম হ্যারাস করলেন কে জানে! আমার কপালে নির্ঘাত গার্জেন কল ঝুলছে৷’
ইলিনা আর সজনী ওকে ভরসা দিতে লাগল৷
আকাশে কালো-কালো মেঘের ছানা ভেসে বেড়াচ্ছিল৷ বৃষ্টি এখনও শুরু হয়নি—তবে যে-কোনও সময় শুরু হতে পারে৷ জানলা দিয়ে বড়-বড় গাছের মাথাগুলো দেখা যাচ্ছিল৷ এলোমেলো বাতাসে এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়ছে৷
সম্পিকে দেখে মনে হল, ও যেন একটু দমে গেছে৷ চুপচাপ কী যেন ভাবছে৷
ইলিনা বারবার ওকে জিগ্যেস করল, ‘কী রে, কী হয়েছে?’
সমর্পিতা অন্যমনস্কভাবে মাথা নাড়ল, বলল, ‘না, কিছু না…৷’
ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল ইলিনা৷ ওর মনে হল, ডাকাবুকো সম্পি ভয় পেয়েছে৷
শেষ পিরিয়ড শুরু হওয়ার আগে সম্পি একবার টয়লেটে যাওয়ার নাম করে বেরোল৷
ইলিনার কী মনে হল, সম্পির পিছন-পিছন ও-ও বেরিয়ে এল বারান্দায়৷ দেখল, সম্পি বারান্দার রেলিং-এর কাছে দাঁড়িয়ে ক্লাস নাইন-বি-র একটা মেয়ের সঙ্গে কথা বলছে৷
মেয়েটার নাম নিনা৷ সম্পিদের পাড়ায় থাকে—ওর বন্ধুও৷ আর সম্পির মতো নিনারও একটু ভয়ডর কম৷
ইলিনা চটপট ক্লাসে ফিরে এল আবার৷ একটু পরে সম্পি ফিরে এসে ওর পাশে বসল৷
প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই শম্পা ম্যাডাম ক্লাসে ঢুকে পড়েছেন৷
শম্পা ভূগোল পড়ান এবং খুব ভালো পড়ান৷ কিন্তু শেষ পিরিয়ডে ইলিনার হাই উঠছিল৷ ভাবছিল কখন ছুটি হবে, স্কুল বাসে করে বাড়ি যাবে৷
ও সম্পিকে বলল, ‘নিনার সঙ্গে কী কথা বলছিলি?’
সম্পি কী যেন চিন্তা করছিল, চটকা ভেঙে বলল, ‘রনিতা ম্যাডামের কাছে যাওয়ার সময় ওকে সঙ্গে নেব ভেবেছিলাম৷ তাই ওকে বলছিলাম৷ কিন্তু ওর কাজ আছে—বাড়ি ফেরার তাড়া আছে…৷’
‘ওকে সঙ্গে নিবি কেন?’
‘না, মানে…যদি কোনও প্রবলেম হয়…৷’
‘কী প্রবলেম?’
‘যদি বকাবকি করে, মারধর করে………তারপর গার্জেন কল……৷’ একটু থেমে সম্পি আবার বলল, ‘যাকগে, যা হয় হবে৷’
‘আমি তোর সঙ্গে যাব?’ ইলিনা জিগ্যেস করল৷
সমর্পিতা একলহমা কী যেন ভাবল, তারপর বলল, ‘নাঃ, থাক—দরকার নেই৷ দেখি না কী হয়!’
এরপর ও আর কোনও কথা বলল না৷ অন্যমনস্কভাবে শম্পা ম্যাডামের ভূগোল পড়ানো শুনতে লাগল৷
ইলিনা বুঝতে পারছিল, সম্পি কেমন একটা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছে৷ কী করবে ভেবে উঠতে পারছে না৷
কিন্তু কোনও টিচার পড়া না পারার জন্য সম্পিকে টিচার্স রুমে ডেকে পাঠাচ্ছেন এটা তো সম্পির কাছে নতুন নয়! তা হলে ও এরকম ঘাবড়ে যাচ্ছে কেন?
এসব ভাবতে-ভাবতে ইলিনা জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল৷ আকাশের কালো-কালো মেঘের ছানাগুলো কখন যেন একজোট হয়ে পড়েছে৷ এখন ওদের কালো দৈত্যের মতো দেখাচ্ছে৷ ওদের ঘন কালো শরীর ভেদ করে বিদ্যুতের রুপোলি তরোয়াল মাঝে-মাঝে ঝিলিক দিয়ে উঠছে৷ আর তারপরই গম্ভীর চাপা গর্জন৷
কখন যেন ছুটির ঘণ্টা পড়ল৷ গোটা ক্লাস সঙ্গে-সঙ্গে চঞ্চল হয়ে উঠল৷ কথার ফুলঝুরি ছিটকে পড়তে লাগল চারিদিকে৷
বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগেই বাড়ি রওনা হতে হবে এই চিন্তায় সবাই তাড়াহুড়ো শুরু করে দিল৷ কিন্তু সম্পি চুপচাপ বসে রইল৷ ধীর স্থির গম্ভীর৷
ইলিনা আর সজনী ক্লাস ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে সম্পির দিকে একবার তাকাল৷ ইলিনা জিগ্যেস করল, ‘কী রে, তোর সঙ্গে থাকব?’
‘না, না—তুই বাড়ি যা৷’ চটপট বলল সম্পি, ‘আমি একা ম্যানেজ করে নেব৷’
ইলিনার মনে হল, সমর্পিতা চায় না ওকে কেউ ভিতু বলুক৷
ও এখন মনের ভেতরে বাড়তি সাহস তৈরি করছে৷
ক্লাসরুম যখন ফাঁকা হয়ে গেল তখন সম্পি উঠে দাঁড়াল৷ ব্যাগটা হাতে ঝুলিয়ে চলে এল বাইরের অলিন্দে৷ অলিন্দ ধরে খানিকটা এগোলেই একটা বড় চৌকো চাতাল৷ তাকে ঘিরে কাস্ট আয়রনের ঢালাই করা নকশা কাটা রেলিং৷
