অনুষ্কা যে মাইকেল জ্যাকসনের ভক্ত সেটা দেওয়ালের পোস্টারটা দেখেই বোঝা গিয়েছিল৷ তার সঙ্গে জানা গেল ও নিজেও হারমোনিয়াম বাজিয়ে গানের চর্চা করে৷
ইলিনার গানের ‘চর্চা’ বলতে শুধু গান শোনা৷ ওর প্রিয় বিষয় হল ছবি আঁকা আর ট্যাটুর ডিজাইন৷ দেওয়ালে লাগানো পূর্ণিমার রাতের ছবিটা অনেকক্ষণ ধরেই ওর চোখ টানছিল৷ তাই ও হঠাৎই জিগ্যেস করল, ‘এই ছবিটা এখানে কী জন্যে লাগিয়েছ? এটার কি স্পেশাল কোনও ব্যাপার আছে?’
অনুষ্কা ছবিটার দিকে তাকিয়ে একটু ইতস্তত করে বলল, ‘না, মানে… স্পেশাল কোনও ব্যাপার নেই৷ ছবিটা আমার ভালো লাগে, তাই—৷’
‘ওরে বাবা, আমার তো ওটার দিকে তাকালেই গা-টা কেমন শিরশির করছে! ভয়-ভয় করছে৷ ওই বাড়িটা যেন কেমন৷’
হাসল অনুষ্কা : ‘আমার ভয়-টয় একটু কম…৷’
অনুষ্কার দিকে তাকিয়ে রইল ইলিনা৷ হঠাৎই ওর মনে একটা প্রশ্ন উঠে এল৷
অনুষ্কা ওকে আজ হঠাৎ বাড়িতে ‘নেমন্তন্ন’ করল কেন? আগে ও যখন গায়ে পড়ে ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে গেছে তখন অনুষ্কা এতটুকুও আগ্রহ দেখায়নি৷ অথচ আজ হঠাৎ উলটো ব্যাপার৷
তা হলে কি অনুষ্কা স্কুলের ওই ভয়ানক কাণ্ডটা ইলিনার কাছ থেকে সামনাসামনি বসে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে শুনতে চেয়েছিল? সব শোনার পর সেটা নিয়ে গোয়েন্দার মতো অনেক প্রশ্নও করেছে ও৷ ওর কথাবার্তায় ইলিনার মনে হয়েছে অনুষ্কা যেন এই রহস্যের গভীর পর্যন্ত জানে৷ কারণ, ও বলেছে, ‘আমি জানি৷ সব জানি—৷’
খাওয়া শেষ করে ইলিনা উঠে দাঁড়াল৷ পড়ার টেবিলে রাখা একটা জলের বোতল ওর দিকে এগিয়ে দিল অনুষ্কা৷ আলতো গলায় বলল, ‘তুমি খুব সাবধানে থেকো৷’
ঢকঢক করে জল খেল ইলিনা৷ তারপর বিছানা থেকে ওর স্কুল-ব্যাগটা তুলে নিল : ‘রাত হয়ে যাচ্ছে—এবার আমি যাই…৷’
ঘর থেকে বেরিয়ে ওরা দুজনে সিঁড়ির দিকে এগোল৷
.
৷৷ছয়৷৷
অনুষ্কাকে ঘিরে ইলিনার মনে কিছু প্রশ্ন, জিজ্ঞাসা আর রহস্য তৈরি হয়েছিল৷ কিন্তু ওর প্রতি অলৌকিক এক টান এইসব দ্বিধা আর সংশয়কে ফিকে করে দিয়েছিল৷ শুধু একটা কথা ওর কানে বারবার বেজে উঠছিল : ‘আমি জানি৷ সব জানি—৷’
ক্লাসের পড়ায় ইলিনার মন বসছিল না৷ ও একটা খাতার শেষ পাতায় একটা ট্যাটুর ডিজাইন আঁকছিল : একটা ফুল—তাকে ঘিরে দুটো সাপ৷ এই নকশাটার মধ্যে কী আছে কে জানে! এটা অনুষ্কার এত প্রিয় কেন?
ইলিনা আজ সমর্পিতা আর সজনীর মাঝে বসেছে৷ ক’দিন ধরেই তাই বসছে৷ সমর্পিতার পাশে বসলে ও কেমন যেন ভরসা পায়৷ ওর মনে হয়, কোনও বিপদ-আপদ হলে দশাসই সম্পি সেটা ঠিক রুখে দেবে৷ কিন্তু ঠিক কীরকম বিপদ-আপদ সেটা ইলিনা জানে না৷
অরুণিমা ম্যাডাম বাংলা ব্যাকরণ পড়াচ্ছিলেন৷ ওঁর ভীষণ রোগা চেহারা, মাথায় অনেক সাদা চুল৷ খুব শিগগিরই রিটায়ার করে যাবেন৷ ক্লাসে শুধু হাই তোলেন আর চেয়ারে বসে মাঝে-মাঝেই ঘুমিয়ে পড়েন৷
অরুণিমা ম্যাডাম খুব ঠান্ডা আর ভালোমানুষ টাইপের৷ পড়া না পারলে শাস্তি দেওয়া তো দূরের কথা বকাবকিও করেন না৷ শুধু ক্লাসে গোলমাল না করলেই হল৷
সেই ‘নিয়ম’ মেনে ইলিনারা চাপা গলায় কথা বলছিল৷
ইলিনা ট্যাটু আঁকা থামিয়ে হঠাৎ বলল, ‘সম্পি, তোর সেই শাড়ির পাড়ের ডিজাইনের গল্পটা তো দেখলাম অনেকেই জেনে গেছে৷ বড়দিকে তুই কী বলেছিলি মনে নেই—যে সবটাই তোর দেখার ভুল?’
সম্পি বাঁকাভাবে হাসল৷ বলল, ‘সবাই যা বলে তাই করে নাকি? আমি ইচ্ছে করেই ব্যাপারটা একটু রটিয়ে দিয়েছি৷’
সজনী জিগ্যেস করল, ‘কেন রে?’
‘যাতে কথাটা সেই শয়তান ম্যাডামের কানে যায়৷ তা হলে সেই ম্যাডাম একটু চাপে থাকবে৷’
‘চাপে থাকলে কী হবে?’
‘দেখাই যাক না কী হয়৷’ ঠোঁট টিপে বলল সম্পি, ‘হয়তো শয়তান ম্যাডামটা চালে কোনও ভুল করে ফেলতে পারে…৷’
হঠাৎই সম্পি প্রসঙ্গ পালটে ইলিনাকে জিগ্যেস করল, ‘সেদিন দেখলাম তুই ছুটির সময় অনুষ্কার গাড়িতে উঠলি…৷’
ইলিনা অপ্রস্তুতভাবে বলল, ‘আমার শরীরটা ভালো লাগছিল না৷ ওকে বলেছিলাম—তাই ও আমাকে বাড়ির কাছে নামিয়ে দিয়েছে৷’
‘ওরা খুব বড়লোক, না রে?’ সজনী গলা বাড়িয়ে জিগ্যেস করল৷
‘কী জানি!’ ঠোঁট ওলটাল ইলিনা : ‘তবে অনুষ্কা বলছিল, ও সব জানে৷ ও তোকে—’ সম্পির দিকে তাকাল ইলিনা : ‘খুব কেয়ারফুল থাকতে বলেছে, কোনও রিসক নিতে বারণ করেছে৷’
সম্পি এ-কথায় ভয় তো পেলই না, উলটে ‘ডোন্ট কেয়ার’ হাসি হাসল৷ তারপর কৌতূহল নিয়ে জিগ্যেস করল, ‘অনুষ্কা সব জানে মানে?’
‘কী জানি! সেসব ক্লিয়ার করে বলেনি৷’
‘তোরা চিন্তা করিস না৷ ব্যাপারটার পেছনে আমি লেগে আছি৷’
‘তুই কিন্তু কেয়ারফুল থাকিস…৷’ ইলিনা ফিসফিস করে সম্পিকে আবার বলল৷
সম্পি কোনও কথা বলল না৷ শুধু চোখের ইশারায় বোঝাল, ও কেয়ারফুল থাকবে৷
বাংলা ব্যাকরণের পর আরও দুটো ক্লাস পার হয়ে গেল৷ সম্পি কেমন যেন ছটফট করছিল৷ কোনও কিছুতেই ঠিকমতো মন বসাতে পারছিল না৷
ইলিনা খেয়াল করেছে, সম্পি ক’দিন ধরেই স্কুল ক্যাম্পাসের আনাচেকানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ ওই মরা গাছটার কাছে গিয়ে তার আশপাশটা খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখছে৷ গত পরশু স্কুল ছুটি হওয়ার পর ও সার্ভেন্টস কোয়ার্টারের সামনে দাঁড়িয়ে বলাইদার সঙ্গে কীসব যেন কথাবার্তা বলছিল৷ তারপর গতকাল টিফিনের সময় আগাছার জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে এদিক-ওদিক চষে বেড়াচ্ছিল৷
