তা হলে সেই ছাতাওয়ালা প্রাণীগুলো পিশাচ? ওরাই কি পরানের রক্ত শুষে নিয়েছে? কিন্তু ওদের স্কুলের দুজন ছাত্রী আর একজন ম্যাডাম ওরকম পিশাচ হয়ে গেল কী করে?
ইলিনার চিন্তাগুলো দিশেহারাভাবে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছিল আর বারবার অদৃশ্য এক পাথরের দেওয়ালে মাথা খুঁড়ে মরছিল৷
অনুষ্কা বলল, ‘ইলিনা, তুমি ভয় পেয়ো না৷ আমি তো আছি! শুধু সম্পিকে বোলো খুব কেয়ারফুল থাকতে৷ ও যেন বেশি রিসক না নেয়৷’
ইলিনা কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ঘাড় নাড়ল৷ দারচিনির মিষ্টি গন্ধটা ওর নাকে এল আবার৷
অনুষ্কা প্রসঙ্গ পালটানোর জন্য জানলার কাচের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বৃষ্টিটা যে কখন থামবে কে জানে! রেইনি সিজনটা খুব বিচ্ছিরি৷’ মুখ ফিরিয়ে ইলিনার দিকে তাকাল : ‘আমার মায়ের সঙ্গে তোমার আলাপ হল না৷ মা বিকেলে কীসব কেনাকাটা করতে বেরিয়েছে—মনে হয়, বৃষ্টিতে আটকে গেছে৷ একটু পরে বাপি মা-কে ফোন করে দেখবে৷ যদি মায়ের ফিরতে প্রবলেম হয় তা হলে তোমাকে বাড়িতে ড্রপ করে বাপি মা-কে গিয়ে নিয়ে আসবে৷’
‘তোমার মা একা বেরিয়েছেন? রাত হয়ে গেলে যদি কোনও বিপদ-আপদ হয়! তার চেয়ে আমি এখনই চলে যাই—তোমার মা তা হলে তাড়াতাড়ি ফিরতে পারবেন…৷’
‘তুমি শুধু-শুধু চিন্তা করছ—’ মিষ্টি করে হাসল অনুষ্কা : ‘বিপদ-আপদকে আমরা ভয় পাই না৷ তা ছাড়া বাপি এখুনি তোমার জন্যে স্ন্যাক্স-ট্যাক্স কিছু নিয়ে আসবে৷ আর বাড়িটাও তো তোমাকে ঘুরিয়ে দেখানো হয়নি—চলো৷’ অনুষ্কা ওর হাত ধরে টানল৷ তারপর ঘর ছেড়ে ওরা চলে এল বাইরে, অলিন্দে৷
বাড়ির সব জায়গাতেই উজ্জ্বল আলো জ্বলছিল৷ সাদা টিউবলাইট অথবা নানান চেহারার সি. এফ. এল.৷ দোতলার ঘরগুলো দেখাতে- দেখাতে অনুষ্কা বলল, ‘আমাদের বাড়ির দুটো ফ্লোর একই প্যাটার্নে তৈরি৷ একতলার দুটো ঘরে উলটোপালটা জিনিস বোঝাই করা আছে, আর থার্ড ঘরটায় আমার…পোষা…মানে, পেটসরা থাকে৷ কাঠবিড়ালি, পায়রা, শালিখ, চড়াই এসব৷’
দোতলার তিনটে ঘর শেষ হতেই অনুষ্কা বলল, ‘ওপাশে ওই যে দুটো ছোট-ছোট ঘর—ওগুলো টয়লেট আর কিচেন—দেখানোর কিছু নেই৷’
ইলিনা জিগ্যেস করল, ‘তুমি রান্না জানো?’
‘ওরে বাবা!’ ভয় পাওয়ার কপট ভঙ্গি করল অনুষ্কা : ‘রান্না-টান্না আমি একটুও জানি না৷’
‘তোমার মা—মানে, আন্টি নিশ্চয়ই ভালো রান্না জানেন?’
‘উহুঁ—’ অনুষ্কা মাথা নাড়ল : ‘মা রান্না-টান্না তেমন জানে না…৷’
‘সে কী? তা হলে রোজ রান্না করে দেয় কে? তোমার স্কুলের টিফিন কে তৈরি করে? রান্নার মাসি?’
অনুষ্কাকে দেখে মনে হল, ও কেমন যেন দিশেহারা হয়ে গেছে৷ কী বলবে ভাবছে৷
‘না, মানে…রান্নার মাসি…আমাদের রান্নার মাটি-টাসি কেউ নেই৷’
অনুষ্কার কথাটা শেষ হওয়ার আগেই রান্নাঘরের দিকে পা বাড়িয়ে ভেতরে উঁকি মেরে দেখেছে ইলিনা৷
এবং বিস্ময়ে থ হয়ে গেছে৷
রান্নাঘর একেবারে পরিষ্কার৷ কয়েকটা থালা-বাসন ছুরি-চামচ ছাড়া সেখানে আর কিছু নেই৷ তাকে মশলাপাতির কোনও কৌটো নেই৷ এমনকী কোনও উনুন, স্টোভ, গ্যাস আভেন, গ্যাস সিলিন্ডার, বা মাইক্রোওয়েভ আভেন—কিচ্ছু নেই৷
বিস্ময়ের ধাক্কাটা সামলে ইলিনা ঘুরে তাকাল বন্ধুর দিকে৷
দুজনেই চুপচাপ৷ যেন ক্যামেরার ফ্রিজ শটে দুজনে ধরা পড়েছে৷ ওদের মুখে কোনও কথা নেই৷ শুধু বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের মতো বাজছিল৷
‘আমাদের রান্নাবান্নার কোনও ব্যাপার নেই৷ আমরা সবসময় কেনা খাবার খাই—৷’
অনুষ্কা এ-কথা বলতে না বলতেই ওর বাপির গলা পাওয়া গেল৷
‘ইলিনা, এই কেনা খাবারগুলো খেয়ে দ্যাখো—দারুণ লাগবে৷ খুব ফেমাস দোকান থেকে কেনা…৷’
কথার দিকে লক্ষ করে চোখ ফেরাল ইলিনা৷ এবং সরাসরি অনুষ্কার বাবাকে দেখতে পেল৷
অনুষ্কার ঘরের দরজায় বাপি দাঁড়িয়ে৷ হাতে একটা খাবারের প্লেট৷
ওরা বাপির কাছে এগিয়ে গেল৷ বাপি খাবারের প্লেটটা অনুষ্কার হাতে দিলেন : ‘নাও, বন্ধুকে ঘরে বসিয়ে খাওয়াও৷’ ইলিনার দিকে তাকালেন : ‘লজ্জা কোরো না, ইলিনা—পেট ভরে খাবে৷ তা কেমন লাগছে বলো৷ এনজয় করছ তো?’
ইলিনা সামান্য হেসে ঘাড় নাড়ল৷ নীচু গলায় বলল, ‘করছি—এনজয় করছি৷’
‘গুড—ভেরি গুড৷’ জোরে হেসে উঠলেন বাপি৷ তারপর চলে যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়ালেন : ‘হ্যাঁ, ভালো কথা৷ তুমি ফেরার সময় হলে বোলো৷ তোমাকে বাড়িতে ড্রপ পরে দেব…৷’
বাপি সিঁড়ি ধরে নামতে শুরু করলেন৷
ঘরে ঢুকে ইলিনার সামনে প্লেটটা এগিয়ে দিল অনুষ্কা : ‘নাও—খেয়ে নাও৷’
ইলিনা প্লেটটা নিয়ে বিছানায় বসল৷ ওর খুব খিদে পাচ্ছিল৷ খাবারগুলো সামনে পেয়ে খিদেটা যেন অনেক বেড়ে গেল৷ মনজিনিসের ফিশ এনভেলাপ, চিকেন বার্গার—তার পাশে দুটো বড় সন্দেশ৷
খাওয়া শুরু করার আগে ও অনুষ্কাকে জিগ্যেস করল, ‘তুমি খাবে না?’
ইলিনা জানত অনুষ্কা কী বলবে৷ কারণ, স্কুলে টিফিন শেয়ার না করার ব্যাপারটা ওর মনে ছিল৷
অনুষ্কা ঠিক তাই বলল, ‘নাঃ, আমার খিদে নেই—৷’
ইলিনা চিকেন বার্গারে কামড় বসিয়ে হাসল : ‘তোমার দেখছি কখনও খিদে-টিদে পায় না৷’
অনুষ্কা অস্বস্তি পেয়ে হাসল, বলল, ‘বোধহয় তাই৷ ডাক্তার দেখাব ভাবছি—৷’
এরপর ওদের গল্প ঘুরে গেল গানের দিকে৷ বাইরে বৃষ্টির শব্দ তখন অনেকটা কমে এসেছে৷
