অনুষ্কা কোনও কথা না বলে কাঠবিড়ালিটা বাপির হাতে দিল৷ ওটার মাথায় ছোট্ট করে হাত বুলিয়ে বাপি বললেন, ‘সুইট স্কুইরেল…৷’
এই কথা বলে বাপি একতলার একটা ঘরে ঢুকে গেলেন৷ আর ওরা দুজনে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতে লাগল৷
বাড়িটা নতুন রং করা হয়েছে বলে ইলিনা রঙের গন্ধ পাচ্ছিল৷ কিন্তু তার সঙ্গে দারচিনির মিষ্টি গন্ধটাও ওর নাকে আসছিল৷
সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় বাড়িটা খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখছিল ইলিনা৷ ছিমছাম সাজগোজে বাড়িটাকে যথেষ্ট আধুনিক করার চেষ্টা হয়েছে৷
দরজা-জানলায় ভারী পরদা, দেওয়ালে ওয়াল হ্যাঙার, সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এ পেইন্টেড পট৷
এসব দেখতে-দেখতে অনুষ্কার ঘরে পৌঁছে গেল ইলিনা৷
অনুষ্কা আলো জ্বালতেই ঘরটা চোখের সামনে প্রকাশিত হল৷
একটা আলমারি, বুককেস, এল. সি. ডি টিভি আর পড়াশোনার টেবিল৷ তার পাশে কম্পিউটার টেবিল৷ ডানদিকের দেওয়াল ঘেঁষে পাতা সিঙ্গল খাট৷ তার বিছানার রঙিন চাদর এলোমেলো৷ তার ওপরে পড়ে আছে একটা বড়সড় হেডফোন৷
বিছানার একটু ওপরে দেওয়ালে জন আব্রাহাম আর মাইকেল জ্যাকসনের বিশাল পোস্টার৷ তার পাশেই একটা অন্যরকম ডিজিটাল প্রিন্ট৷
এই অন্যরকম ছবিটায় দেখা যাচ্ছে, আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ৷ জ্যোৎস্না ধোওয়া প্রান্তরে একটা বিশাল প্রাসাদ অতিকায় ডাইনোসরের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে৷ প্রাসাদের একটা ঘরে শুধু আলো জ্বলছে—বাকিটা ছায়া-ছায়া অন্ধকার৷
সেই ছবিটার পাশে একটা ছোট কাগজ দেওয়ালে সেলোটেপ দিয়ে লাগানো৷ তাতে লাল কালিতে একটা প্রতীক চিহ্ন আঁকা : একটা ফুলকে ঘিরে দুটো সাপ, তাদের লেজের ডগা দুটো জড়াজড়ি করে আছে৷ এই ছবিটা ইলিনা আগে অনুষ্কার খাতায় দেখেছে৷
হেডফোনটা ছুড়ে একপাশে সরিয়ে দিয়ে অনুষ্কা স্কুল-ব্যাগটা খুলে বিছানার কোণে রাখল৷ তারপর ধপাস করে বিছানায় বসে পড়ল, ইলিনাকেও বসতে বলল৷
ইলিনা স্কুল-ব্যাগটা খুলে বিছানায় নামিয়ে রাখল৷ তারপর হাত-পা ছড়িয়ে আরাম করে বসল৷ কিন্তু বারবার ওর চোখ চলে যাচ্ছিল ফুল আর সাপের ছবিটার দিকে৷
ইলিনা স্বপ্নেও ভাবেনি হঠাৎ করে এরকমভাবে অনুষ্কা ওকে এত কাছে টেনে নেবে৷ তাই একটা অপ্রত্যাশিত খুশির ঢেউ ওকে ভাসিয়ে দিচ্ছিল৷ অনুষ্কার ‘আহা মরি’ মুখের দিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা ওর কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না৷
দু-পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ওরা দুজনে প্রাণখোলা গল্পে মেতে উঠল৷ আর তারই মধ্যে কখন যেন ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল৷
ওদের গল্প আর হাসাহাসির ঢেউয়ের মাঝে হঠাৎ করেই পরানের ডেডবডির কথা ভেসে উঠল৷
অনুষ্কা টেলিফোনে ব্যাপারটা জেনেছে ঠিকই, কিন্তু মনে হল তাতে ওর কৌতূহল মেটেনি৷ কারণ, ও ইলিনাকে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে নানান প্রশ্ন করতে লাগল৷
সেই রাতের ঘটনা খুব ধীরে-ধীরে স্লো-মোশান সিনেমার মতো পরপর দু-বার বলতে হল ইলিনাকে৷
কপালে ভাঁজ ফেলে চোখ সরু করে গভীর মনোযোগে ইলিনার কথামালা শুনল অনুষ্কা৷
‘তোমরা ঠিক দেখেছ, দুজন টপ আর স্কার্ট পরে ছিল? মানে, আমাদের স্কুল-ড্রেস?’
‘হ্যাঁ, ঠিক দেখেছি৷’
‘আর-একজন শাড়ি?’
‘হ্যাঁ৷ আমাদের একজন ম্যাডাম ওইরকম শাড়ি পরে সেদিন স্কুলে এসেছিল৷ পাড়ের ডিজাইনটা দেখে সম্পি চিনতে পেরেছে৷’
‘কোন ম্যাডাম?’
‘সম্পি জানে৷ ও আমাদের এখনও বলেনি৷ লাস্ট দিন যখন ওর সঙ্গে কথা হয় তখন ও বলেছিল, ম্যাডামের নামটা এখন ও কাউকে বলবে না৷ কয়েকটা দিন ও ম্যাডামের ওপরে নজর রাখতে চায়…৷’
এ-কথা শুনে অনুষ্কা বেশ চিন্তায় পড়ে গেল৷ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর ও আনমনাভাবে বলল, ‘এতে তো সম্পির বিপদ হতে পারে! যদি সেই ম্যাডাম সম্পির ব্যাপারটা জানতে পেরে যায় তা হলে…৷’
ইলিনা হাত নেড়ে বলল, ‘জানলে জানবে! সম্পির গায়ে অনেক জোর—ও কাউকে ভয় পায় না…৷’
ইলিনার দিকে অদ্ভুত চোখে তাকাল অনুষ্কা৷ মলিন হেসে বলল, ‘সম্পি ওদের সঙ্গে পারবে না৷ ওদের গায়ে অমানুষিক শক্তি৷ ওরা লোহা চিবিয়ে গুঁড়ো করে দিতে পারে—৷’
ইলিনা অবাক হয়ে তাকাল : ‘তুমি জানলে কী করে?’
অনুষ্কা চুপ করে রইল৷ ওরা দুজনে বৃষ্টির ধারাপাত শুনতে লাগল৷
কিছুক্ষণ পর ইলিনা আবার জিগ্যেস করল, ‘তুমি জানলে কী করে?’
‘আমি জানি৷ সব জানি—৷’
‘কী জানো, বলো—৷’ অনুষ্কার আরও কাছে সরে এল ইলিনা৷
‘পরান ছেলেটা কীভাবে মারা গেছে আমি জানি৷’
বাইরে প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ল৷ পড়ল ইলিনার বুকের ভেতরেও৷ উত্তেজিত হৃৎপিণ্ডের ধকধক আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল ও৷
ফ্যালফেলে মুখে অনুষ্কার দিকে তাকিয়ে ছিল ইলিনা৷ হোঁচট খাওয়া গলায় কোনওরকমে প্রশ্ন করল, ‘কী-কীভাবে ম-মারা গেছে পরান?’
‘ওর সব রক্ত শুষে নিয়েছে কেউ…৷’
ইলিনার শীত-শীত করে উঠল৷
ঘরের দুটো জানলাতেই কাচের শার্সি লাগানো৷ বৃষ্টির ফোঁটা কাচের ওপরে আছড়ে পড়ছিল৷ তারপর কাচ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল৷ ল্যাম্পপোস্টের ছিটকে আসা আলোয় মনে হচ্ছিল কাচ বেয়ে কতকগুলো স্বচ্ছ ব্যাঙাচি সাঁতরে নামছে৷
ইলিনা শুধু যে অনুষ্কার কথায় ভয় পেয়েছে তা নয়৷ অনুষ্কা কী করে এসব জানল সে-কথা ভেবেও ওর ভয় করছে৷ অথচ অনুষ্কার প্রতি ওর টানটাও তো মিথ্যে নয়! তাই ভয় পেলেও ইলিনা এক অদ্ভুত টানে অনুষ্কার কাছে বসে রইল, ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল৷ আর নানান কথা ভাবতে লাগল৷
