অনুষ্কা বাঁ-হাতে স্কার্ট ঝাড়তে-ঝাড়তে বলল, ‘কী কিউট, না? এটা আমি পুষব৷’
ইলিনা বলল, ‘বাব্বা, তোমার কী স্পিড! স্পোর্টসে নাম দিলে তুমি অনেক প্রাইজ পাবে৷’
অনুষ্কা হাসল শুধু—কোনও কথা বলল না৷
এমন সময় মেঘ ডাকল আবার৷ দু-এক ফোঁটা বৃষ্টিও পড়তে শুরু করল৷
সঙ্গে-সঙ্গে অনুষ্কা যেন শক খেয়ে চমকে উঠল৷ ‘শিগগির চলো—বৃষ্টি পড়ছে’ বলে পিচের রাস্তা ধরে ছুট লাগাল৷
অন্য মেয়েগুলো একটু অবাক হয়ে গেল৷ এ-বৃষ্টি ভেজার মতন কিছু নয়৷ তাই অনুষ্কার দৌড়টা ওদের বেখাপ্পা মনে হল৷ আর ইলিনার মনে পড়ে গেল প্রথম দিন আলাপের সময় অনুষ্কা বলেছিল, ‘…বৃষ্টি আমার ভাল্লাগে না…৷’
ইলিনা একটুও দেরি না করে অনুষ্কার পিছন-পিছন দৌড়ল৷
দূরে মরা গাছটা দেখা যাচ্ছে৷ সেই রাতের দৌড়টার কথা ওর মনে পড়ে গেল৷
পিচের রাস্তা ধরে বাঁ-দিকে বাঁক নিতেই সার বেঁধে পার্ক করা কয়েকটা প্রাইভেট কার চোখে পড়ল৷ তার পাশে হলদে রঙের তিনটে স্কুলবাস৷
একটা সাদা গাড়ির সামনে বড় একটা ছাতা মাথায় দিয়ে সুপুরুষ একজন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে ছিলেন৷ ভদ্রলোকের মাথায় কুচকুচে কালো কোঁকড়ানো চুল, চোখে সরু ফ্রেমের চশমা, আর মুখে একগাল হাসি৷ ওঁকে দেখতে এত সুন্দর যে, স্রেফ দেখেই বোঝা যায় উনি অনুষ্কার বাবা৷
ছুটন্ত অনুষ্কার দিকে ছাতা বাড়িয়ে ধরলেন তিনি৷ আর একইসঙ্গে গাড়ির সামনের প্যাসেঞ্জার সিটের দরজাটা খুলে ধরলেন৷ ইলিনা লক্ষ করল, গাড়ির জানলায় টিন্টেড গ্লাস লাগানো৷
গাড়িতে উঠতে-উঠতে অনুষ্কা বলল, ‘বাপি, ও ইলিনা—আমার ক্লাসমেট…আমার খুব বন্ধু৷ ও আমাদের সঙ্গে এখন যাবে—৷’
‘তাই?’ চওড়া করে হাসলেন অনুষ্কার বাপি : ‘গুড—ভেরি গুড৷ এসো, এসো—উঠে পড়ো গাড়িতে৷ বৃষ্টিতে ভিজো না৷’ পিছনের একটা দরজা খুলে ইলিনাকে গাড়িতে ওঠার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন৷
ইলিনা গাড়িতে উঠে পিঠের স্কুল-ব্যাগটা খুলে সিটের ওপরে রাখতেই বাপি দরজাটা বন্ধ করে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসলেন৷ গাড়িতে স্টার্ট দেওয়ার সময় ছোট্ট কাঠবিড়ালিটা বাপিকে দেখাল অনুষ্কা৷
‘এই দ্যাখো, বাপি, এই কাঠবিড়ালিটা স্কুলের বাগান থেকে ধরেছি৷ এটা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পুষব…৷’
কাঠবিড়ালিটা তখন কিচকিচ করে শব্দ করছে, ওর কালো চোখের তারা চঞ্চলভাবে এদিক-ওদিক দেখছে৷
কাঠবিড়ালিটার দিকে একদৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন বাপি৷ তারপর জোরে হেসে বললেন, ‘ওটা আগেই আমি দেখেছি৷ বাঃ, গুড—ভেরি গুড৷ কিন্তু কত কিছুই তো তুমি পুষবে বলে ধরে আনো৷ তারপর কতটুকু কী পোষা হয় তা তুমি ভালোই জানো!’ মেয়ের দিকে অর্থপূর্ণ চোখে তাকিয়ে কী এক গোপন রসিকতায় হেসে উঠলেন৷ তারপর একপলক ইলিনাকে দেখে নিলেন৷
কাঠবিড়ালিটার গায়ে একবার আদরের হাত বুলিয়ে গাড়ি চালাতে শুরু করলেন বাপি৷
অনুষ্কা বলল, ‘বাপি, তোমার ফোনটা দাও৷ ইলিনা ওর বাড়িতে একটা ফোন করবে—নইলে ওর মা-বাবা চিন্তা করবে…৷’
‘ওহ শিয়োর—এই নাও৷’ জামার বুকপকেট থেকে রুপোলি রঙের একটা ছোট্ট মোবাইল ফোন বের করে মেয়ের দিকে এগিয়ে দিলেন৷
অনুষ্কা আর ইলিনা চটপট বোতাম টিপে ফোনের কাজটা সেরে নিল৷
গাড়ির ভেতরে একটা অদ্ভুত পারফিউমের গন্ধ পাচ্ছিল ইলিনা৷ মনে হচ্ছিল, মিহি দারচিনি গুঁড়ো কেউ বাতাসে ভাসিয়ে দিয়েছে৷
এই গন্ধটা ও অনুষ্কার কাছে কখনও পায়নি৷ তা হলে কি ওর বাপি এরকম অফবিট পারফিউম লাগিয়েছেন? নাকি এটা স্পেশাল টাইপের কোনও কার পারফিউম?
অনুষ্কার বাপি গাড়ি চালাতে-চালাতে নানান বিষয়ে বকবক করছিলেন আর মাঝে মাঝেই হেসে উঠছিলেন৷ তবে ওঁর বেশি আগ্রহের বিষয় যে সিনেমা আর নাটক সেটা বোঝা যাচ্ছিল৷ গল্প করার ফাঁকে তিনি থেকে-থেকেই বলছিলেন, ‘এই তো, এসে গেলাম…৷’
গাড়ি নানান রাস্তা ধরে চলছিল৷ ইলিনা কোনও রাস্তাই চিনতে পারছিল না৷ অবশ্য ওর চেনার কথাও নয়৷ ওর শুধু মনে হচ্ছিল, অনুষ্কা ওর ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ হতে চলেছে৷ আর সেই চিন্তাটা ওর মনে খুশির বাতাস ছড়িয়ে দিচ্ছিল৷
একটু পরেই গাড়ি যে-বাড়িতে এসে ঢুকল সেটা মাপে ছোট হলেও অনায়াসে তাকে বাগানবাড়ি বলা যায়৷ কারণ, অবহেলায় ফেলে রাখা বাগানের একপাশে একটা ছোট দোতলা বাড়ি৷ বাড়ি আর বাগান জং ধরা রেলিঙে ঘেরা৷ তার কোথাও-কোথাও এমনভাবে ভাঙা যে, কুকুর-বেড়াল কি অন্যান্য ছোট প্রাণী সহজেই ঢুকে পড়তে পারে৷
বাড়িটা পুরোনো ধাঁচের, তবে সদ্য রং করা হয়েছে৷ সেই রংটা গরিব পথশিশুর গায়ে ঝকঝকে নতুন জামা-প্যান্টের মতো দেখাচ্ছে৷
বাড়ির ছাদের কার্নিশে অনেক গোলাপায়রা বসে আছে৷ মাঝে-মাঝে পায়রাগুলো এদিকে-ওদিকে উড়ে যাচ্ছে৷
আকাশ মেঘে-মেঘে কালো৷ বৃষ্টি এখন নেই, কিন্তু যে-কোনও সময় শুরু হতে পারে৷
গাড়ি বাড়ির কাছে গিয়ে থামল৷ ওরা তিনজনে নেমে বাড়িতে ঢুকল৷ অনুষ্কার হাতে ধরা কাঠবিড়ালিটা তখনও কিচকিচ করে শব্দ করছে৷
বাড়িতে ঢোকার সময় অনুষ্কার বাপি ইলিনাকে বললেন, ‘ওয়েলকাম, ইলিনা—ওয়েলকাম টু আওয়ার লিটল হাউস৷ যাও, অনুষ্কার সঙ্গে ওপরে যাও৷ ওর ঘরে বসে গল্প করো, টিভি দ্যাখো, চুটিয়ে আড্ডা মারো—এনজয় করো…৷’ একটু থেমে অনুষ্কার দিকে হাত বাড়িয়ে চাপা গলায় বললেন, ‘দাও, ওটা আমাকে দাও৷ জায়গামতো রেখে দিই…৷’
