ওর মনের কথা অনুষ্কা বোধহয় টের পেল৷ বলল, ‘তোমার কোনও চিন্তা নেই৷ বাপির সঙ্গে মোবাইল থাকে৷ ছুটির পর বাপির ফোন থেকে তুমি আন্টিকে ফোন করে দিয়ো৷ তার সঙ্গে বোলো, আন্টি যেন তোমার ফেরার চিন্তা না করেন৷ বাপি তোমাকে গাড়ি করে পৌঁছে দিয়ে আসবে—অবশ্য বাপির সঙ্গে আমিও থাকব৷’ হেসে কথাটা শেষ করল অনুষ্কা৷ কিন্তু তারপরই হঠাৎ চাপা গলায় বলল, ‘আমার বাড়িতে যাচ্ছ এ-কথাটা কাউকে এখন বোলো না…প্লিজ…৷’
‘বলব না৷’ মাথা হেলিয়ে বলল ইলিনা৷ ভাবল, অনুষ্কাটা এত মুখচোরা কেন কে জানে! তা ছাড়া ওর বাড়িতে যাওয়ার ব্যাপারটা গোপন করারই বা কী আছে?
ইলিনার একটু অবাক লাগছিল৷ যে-অনুষ্কা সবার সঙ্গে আলাপ-টালাপ করার ব্যাপারটা সবসময় এড়িয়ে চলে সে হঠাৎ ইলিনাকে বাড়িতে নেমন্তন্ন করছে! এ-ক’দিনে ও হঠাৎ পালটে গেল কেন?
সে যাই হোক, ইলিনার মনটা খুশি-খুশি হয়ে উঠল৷ আর তখনই স্কুলের প্রথম ক্লাস শুরু হওয়ার ঘণ্টা পড়ল৷
একটার পর একটা ক্লাস পেরিয়ে সময়টা ক্রমশ বিকেলের দিকে গড়াতে লাগল, আর ইলিনার উৎফুল্লতা তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়তে লাগল৷
টিফিনের সময় অনেকের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে গিয়ে ইলিনা বুঝল, এমনিতে সবাই চুপচাপ থাকলেও পরানের ব্যাপারটা নিয়ে ভালোরকম ফিসফাস কানাকানি হচ্ছে৷
খবরটা কোনও নিউজ চ্যানেলে দেখায়নি কিংবা কাগজেও ছাপেনি৷ হয়তো প্রীতি দত্তের অনুরোধে কিংবা প্রভাবে পুলিশ মুখে কুলুপ এঁটেছে আর মিডিয়া হাত গুটিয়ে বসে থেকেছে৷ কিন্তু ‘হুইসপারিং ক্যাম্পেন’ বসে থাকেনি৷
টিফিনের সময় ইলিনা একা-একাই টিফিন খেল৷ ওর শত অনুরোধেও অনুষ্কা ওর টিফিন শেয়ার করল না৷ বারবার সুন্দর করে হেসে বলল, ‘আমি বাড়ি থেকে খেয়ে এসেছি৷ তা ছাড়া আমার চট করে খিদে পায় না৷’
ইলিনার বেশ খটকা লাগলেও কিছু বলল না৷
ছুটির সময় যতই এগিয়ে এল আকাশ ততই কালো হয়ে উঠল৷ মেঘও ডেকে উঠল দু-চারবার৷ অনুষ্কা অপছন্দের মুখে জানলার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বর্ষাকালটা খুব বিচ্ছিরি৷ আমার ভাল্লাগে না৷’
ইলিনা ওর দিকে তাকাল শুধু—কিছু বলল না৷
সাড়ে চারটের সময় ছুটির ঘণ্টা পড়তেই ওরা সিঁড়ি নেমে চলে এল একতলায়৷ গাড়িবারান্দার বাইরে বেরিয়ে আকাশের দিকে একবার তাকাল৷ মেঘের যা চেহারা তাতে মনে হচ্ছে জলকণার ভারে মেঘের দল কাবু হয়ে পড়েছে৷ যে-কোনও মুহূর্তে মেঘের চাদর ফুঁড়ে জলের ধারা নীচে নামবে, পৃথিবী ভাসিয়ে দেবে৷
অনুষ্কা ইলিনার হাত ধরে টান মারল : ‘শিগগির চলো৷ বাপি গাড়িটাকে ওপাশটায় দাঁড় করায়—৷’
পিচের রাস্তা ধরে ওরা দুজনে তাড়াতাড়ি পা চালাল৷ অন্য মেয়েরাও চটপট এগিয়ে চলেছে মেন গেটের দিকে৷ কেউ-কেউ আবার ছুটছে৷ নিউ কাটের খটখট শব্দে বাস্কেটবল গ্রাউন্ডের ভূতুড়ে ঘোড়সওয়ারদের কথা মনে পড়ে গেল ইলিনার৷
পিচের রাস্তার বাঁ-দিকটা বলতে গেলে জঙ্গলে ঢাকা৷ আগাছার জংলা ঝোপ, আর তার মাঝে-মাঝে কয়েকটা বড়-বড় গাছ৷ গাছের পাতার আড়াল থেকে কোকিল ডাকছে৷ দুটো ফিঙে ঘূর্ণি নাচের ভঙ্গিতে উড়ছে৷ বোধহয় উড়ন্ত পোকামাকড় ধরছে৷ একটা কাঠবিড়ালি একটা বড় গাছের ডালে বসে ইলিনাদের দিকে তাকিয়ে আছে৷ তবে সামান্য ছুতোয় ছুটে পালানোর জন্য সে বেশ তৈরি বলেই মনে হল৷ মেঘলার জন্য ঘোলাটে ছায়া থাকলেও কাঠবিড়ালিটাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল৷
অনুষ্কা কাঠবিড়ালিটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল৷ ওর চোখে আকাঙ্ক্ষার আলতো ছোঁয়া দেখতে পেল ইলিনা৷ জিগ্যেস করল, ‘কাঠবিড়ালি তুমি ভালোবাসো?’
অনুষ্কা চমকে ঘুরে তাকাল : ‘দারুণ ভালোবাসি৷’
‘তা হলে ধরে নিয়ে চলো—পুষবে৷’
কথাটা ইলিনা খুব হালকাভাবেই বলেছিল৷ কিন্তু ওর কথা শেষ হতে না হতেই অনুষ্কা একটা আজব কাণ্ড করে বসল৷
রাস্তা ছেড়ে পলকে ছুটে গেল জঙ্গলের দিকে৷ এবং কাঠবিড়ালিটাকে লক্ষ্য করে শূন্যে লাফ দিল৷
কাঠবিড়ালিটা আর দেরি করেনি৷ অনুষ্কা তাকে তাক করে লাফানোমাত্রই সে গাছের ডাল বেয়ে সড়সড় করে আরও ভেতরদিকে ছুটে গেল৷
কিন্তু অনুষ্কাও হাল ছাড়ার পাত্রী নয়৷ ও-ও তৎপর ভঙ্গিতে লাফের পর লাফ মেরে আগাছা আর গাছের আড়ালে হারিয়ে গেল৷
ইলিনা থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল৷ পিঠে স্কুল-ব্যাগের বোঝা চাপানো অবস্থায় অনুষ্কা যে-স্পিডে কাঠবিড়ালিটাকে তাড়া করল তাতে ও অবাক হয়ে গিয়েছিল৷ মনে হল, অনুষ্কা যেন লং জাম্প আর ট্রিপল জাম্পে তুখোড় কোনও অ্যাথলিট৷
অনুষ্কার ব্যাপারটা আরও দু-চারজন মেয়ের চোখে পড়েছিল৷ তারাও মজা দেখার লোভে ইলিনার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে পড়েছে৷
আগাছার ঝোপ আর গাছের পাতা নড়াচড়ার শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল৷ কিন্তু মেঘলা ছায়াতে অনুষ্কাকে ভালো করে দেখা যাচ্ছিল না৷ তবে ওর সাদা টপের ঝলক দেখা যাচ্ছিল৷
একটু পরেই অনুষ্কা গাছপালার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এল৷ ওর স্কার্ট আর টপের এখানে-সেখানে গাছের পাতার টুকরো-টাকরা লেগে আছে৷ আর ডানহাতের মুঠোয় ধরা একটা কাঠবিড়ালি৷ চিঁ-চিঁ করে ডাকছে৷
ইলিনা তো অবাক৷ ছুটে গিয়ে কেউ কাঠবিড়ালি ধরেছে এমনটা ও কখনও শোনেনি৷ আর অনুষ্কার ক্ষিপ্রতা কোনও শিকারি চিতাকেও হার মানাবে!
অবাক হল বাকি সব মেয়েরাও৷ ওরা অনুষ্কাকে ঘিরে কাঠবিড়ালি দেখতে লাগল৷
