এসব কথা শুনে প্রীতি দত্তের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল৷ তার ওপর মলিনাদি বলল, সার্ভেন্টস কোয়ার্টারের কারা যেন বড়দির পারমিশান না নিয়ে এর মধ্যেই পুলিশে খবর দিয়ে দিয়েছে৷
ইলিনা, সম্পি আর সজনী ভয়ে রীতিমতো কাঁপছিল৷ পরানের মৃতদেহের যে-সংক্ষিপ্ত বর্ণনা মলিনাদি দিয়েছে তাতেই ওরা রক্তশূন্য ছাইরঙা ডেডবডিটা যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিল৷
প্রীতি দত্ত টেবিল থেকে গ্লাস তুলে নিয়ে দু-ঢোঁক জল খেলেন৷ কয়েকটা বড়-বড় শ্বাস নেওয়ার পর কিছুটা সামলে উঠলেন৷ তারপর তড়িঘড়ি সম্পিদের বিদায় দিলেন৷ আপনমনেই বললেন, ‘কী-সর্বনাশ! মনে হচ্ছে, স্কুল ক’দিন ছুটি দিতে হবে…৷’
মলিনা ভয় পাওয়া গলায় বলল, ‘আমি বডিটা স্বচক্ষে দেখে এলুম, দিদি৷ এ একেবারে অপঘাতে মিত্যু৷ নিঘঘাৎ ডাকিনি-পিশাচের কাজ৷ সারা শরীরটায় রক্ত নেই৷ একেবারে সাদা৷ এবারে কী হবে, দিদি?’
মলিনার আর্ত আবেদন বড়দির কানে পৌঁছল কি না বোঝা গেল না৷ তিনি তখন টেবিল থেকে মোবাইল ফোন হাতে তুলে নিয়েছেন৷ কপালে ভাঁজ ফেলে চোখ সরু করে মলিনার উচচারণ করা মারাত্মক দুটো শব্দ নিয়ে ভাবছেন৷
এই স্কুলে ডাকিনি আর পিশাচ এল কোথা থেকে?
.
৷৷পাঁচ৷৷
তিন দিন স্কুল ছুটি দেওয়া হল৷ তার সঙ্গে রবিবার জুড়ে গিয়ে চার দিন৷ সেই চারদিনে পুলিশি তদন্ত মোটামুটি একটা জায়গায় এসে দাঁড়াল৷ কিন্তু পরানের দেহের রক্তশূন্যতার কোনও ব্যাখ্যা পাওয়া গেল না৷ পুলিশের রিপোর্টে হায়েনা, গোসাপ কিংবা বড়সড় কোনও বেজির আক্রমণের সম্ভাবনার কথা বলা হল—যদিও পুলিশের লোকজনের কাছে প্রচুর প্রশ্নচিহ্ন থেকে গেল৷
ব্যাপারটা নিয়ে জল ঘোলা যাতে কম হয় সেইজন্য প্রীতি দত্ত পুলিশের কাছে স্টেটমেন্টে শুধু রবিনা ম্যাডামের কথা বলেছেন৷ বলেছেন, সেই রাতে ওইসব আজগুবি কাণ্ডকারখানা রবিনা ম্যাডাম একা দেখেছেন—ছাত্রীরা কেউ দেখেনি৷ তাই ইলিনারা পুলিশের জেরা থেকে রেহাই পেয়ে গেছে৷
সোমবার স্কুলে গিয়ে স্কুলটাকে নতুন চোখে দেখতে চাইল ইলিনা৷
আজ বৃষ্টি নেই৷ আকাশে মেঘের চেহারা অনেক ফিকে৷ কিন্তু সেই রাতের ঘটনাটা চোখের সামনে থেকে কিছুতেই সরে যাচ্ছে না৷
কালো মেঘ৷ লিকলিকে শাখা-প্রশাখা ছড়ানো মরা গাছ৷ অন্ধকার রাত৷ আর সেই উজ্জ্বল আলোর চোখ৷
ঘটনার পরদিন সকালে স্কুলের দিকে আসার সময় মরা গাছটার কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিল ইলিনা৷ ওটার চারপাশে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে নজর বুলিয়েছিল৷ কিন্তু গতকাল রাতের ওই ঘটনার কোনও চিহ্ন খুঁজে পায়নি৷ তা সত্ত্বেও ওর গা ছমছম করছিল৷
তারপর, পরানের অপঘাতে মারা যাওয়ার খবরটা পাওয়ার পর, ওর মনে হয়েছে, ওই ‘খারাপ’ প্রাণীগুলো কখনও চিহ্ন রেখে যায় না৷
আজ সকালেও স্কুলে আসার সময় দূর থেকে ওই মরা গাছটার দিকে ইলিনা তাকিয়ে থেকেছে৷ আর তখনই এক অদ্ভুত শিরশিরানি টের পেয়েছে শরীরে৷
আজ ক্লাসে ঢুকে অনুষ্কাকে দেখতে পেয়ে ওর খুব ভালো লাগল৷ সুন্দর টলটলে মুখটি নিয়ে চুপচাপ নিজের ডেস্কে বসে আছে৷ ওর মুখের ডানপাশে জানলা দিয়ে আলো এসে পড়েছে৷ সেই আলোয় ওকে কেমন যেন স্বপ্নের মতো দেখাচ্ছে৷ নিজের চিন্তায় ডুবে থাকা এক রূপসী৷
অনুষ্কার দু-পাশে রেখা আর সঞ্চিতা বসে৷ দুজনের মধ্যে রেখার সঙ্গে ইলিনার রিলেশানটা বেটার৷ তাই ও রেখাকে বলে বসার জায়গা অদলবদল করল৷ পিঠের ব্যাগ হাতে নিয়ে অনুষ্কার পাশের ডেস্কে বসে পড়ল৷
‘অনেকদিন তোমাকে দেখিনি৷’ ইলিনা হেসে বলল৷
‘স্কুল তো ছুটি ছিল৷ তা ছাড়া সেই বাজে দিনটায় আমি তো আসিনি…তার পরের দিনও আসিনি৷’
না এলেও অনুষ্কা ফোনে-ফোনে সব ঘটনাই জেনে গেছে৷ বড়দি যতই বারণ করে থাকুন, এই ভয়ংকর বিচিত্র ব্যাপারটা নিয়ে চাপা কথাচালাচালি মোটেই বন্ধ হয়নি৷
ইলিনাও এই ছুটির মধ্যে অনুষ্কাকে ফোন করেছিল৷ ওর সঙ্গে ফোনে কথা বলে ইলিনার মনে হয়েছিল অনুষ্কা যেন কিছু বলতে চায় কিন্তু বলতে পারছে না৷
ক্লাস শুরু হতে এখনও সাতমিনিট বাকি৷ তাই গোটা ক্লাসে ভোমরার গুনগুন চলছিল৷ ইলিনা অনুষ্কার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলল, ‘জানো, আমার না এখন স্কুলে আসতে ভয় করে…৷’
‘কেন?’ অনুষ্কা ভুরু তুলে তাকাল৷
‘ওই রাতটার কথা বারবার মনে পড়ে…৷’
অনুষ্কা একটা হাত রাখল ইলিনার হাতে৷ ওর ছোঁয়া ইলিনার ভালো লাগল৷ সেই ছোঁয়ায় কেমন যেন একটা ভরসা ছিল৷
কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর অনুষ্কা আলতো গলায় বলল, ‘আজ ছুটির পর তুমি বরং আমার বাড়িতে চলো৷ বাপি গাড়ি নিয়ে আমাকে নিতে আসবে৷ তারপর বাড়িতে গিয়ে আমরা অনেক গল্প করব৷ সময়টা দারুণ কাটবে৷ তুমি—৷’
‘তোমার কোনও প্রবলেম হবে না তো!’ ইলিনা কথাটা বলল বটে, কিন্তু ওর ভেতরে-ভেতরে খুব আনন্দ হচ্ছিল৷ সেই প্রথম দিন থেকেই ও অনুষ্কার সঙ্গে আলাপ করতে চেয়েছে, বন্ধুত্ব করতে চেয়েছে৷ আর আজ অনুষ্কা নিজে থেকেই ওকে ওর বাড়িতে যেতে বলছে! এই প্রথম৷
‘না, না, প্রবলেম কীসের!’ অনুষ্কা তাড়াতাড়ি বলল, ‘আমিই তো তোমাকে আসার জন্যে রিকোয়েস্ট করছি৷’
‘কিন্তু বাড়িতে ফোন করে একটু বলতে হবে—নইলে মা ভীষণ টেনশান করবে৷’
স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহার করা শুধু নয়, সঙ্গে করে নিয়ে আসাটাই বারণ৷ এ নিয়ে গত বছরে একটা বড়সড় গোলমাল হয়েছিল৷ সুতরাং ইলিনার মুখে চিন্তার রেখা ফুটে উঠল৷ ওদের কারও কাছে সেলফোন নেই৷ মা-কে ফোন করে খবরটা দেবে কেমন করে!
