মাথার ওপরে কাঠের ব্লেডওয়ালা ঢাউস সিলিং ফ্যান ‘ক্যাঁচক্যাঁচ’ শব্দে ঘুরছিল৷ সেই বাতাসের ঝাপটায় ট্যালকাম পাউডারের হালকা গন্ধ ওদের নাকে আসছিল৷ আর বড়দির গলায় পাউডারের ছোপ চোখে পড়ছিল৷
প্রীতি দত্ত ঠান্ডা চোখে সম্পির দিকে তাকালেন৷ অন্তত দশ সেকেন্ড স্থিরভাবে চেয়ে রইলেন—যেন ওকে হিপনোটাইজ করার চেষ্টা করছেন৷
তারপর অতিরিক্ত মোলায়েম স্বরে বললেন, ‘সমর্পিতা…তাই তো নাম তোমার?’
সম্পি চুপচাপ মাথা নাড়ল৷ যার মানে, হ্যাঁ৷
‘…এবার বলো তো, কাল রাতে তুমি ঠিক কী দেখেছ?’
ইলিনা বড়দির শাড়িটা লক্ষ করছিল৷ আজ বড়দি একটা টাঙ্গাইল শাড়ি পরে এসেছেন৷ চওড়া পাড়ে গাঢ় সবুজ রঙের নকশা তোলা৷ হালকা সবুজ জমির ওপরে গাঢ় সবুজের কলকা বোনা৷
‘মনে হয়…মনে হয়…’ মেঝের দিকে তাকিয়ে আঙুল খুঁটতে লাগল সম্পি৷ বারকয়েক হোঁচট খেয়ে বলল, ‘মনে হয়…মনে হয় আমি…ভুল দেখেছি, বড়দি৷ ওই অন্ধকার, মেঘ, তার ওপরে বৃষ্টি…৷’
ইলিনা আর সজনী অবাক চোখে সমর্পিতার দিকে তাকাল৷
এসব কী বলছে সম্পি? একটু আগেই না বলছিল, একজনের শাড়ির পাড়ের ডিজাইনটা ও লক্ষ করেছে! গতকাল একজন ম্যাডাম ওইরকম শাড়ি পরে স্কুলে এসেছিলেন৷ সেই ম্যাডামের ওপরে ও নজর রাখছে৷ এবং যা সত্যি তাই বলবে বড়দিকে৷
তা হলে?
ইলিনা আর সজনীকে আরও অবাক করে দিয়ে সম্পি বড়দিকে বলল, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন, বড়দি৷ কাল রাতে আমার মাথাটা কেমন ঘুরে গিয়েছিল৷ মানে, ব্যাপারটা মনে হয় আমার দেখার ভুল৷ মানে…ওই যে আপনি বললেন না…হ্যালু…৷’
‘হ্যালুসিনেশান৷’ একগাল হেসে ওকে কথাটা ধরিয়ে দিলেন প্রীতি দত্ত, ‘এই তো ভালো মেয়ের মতো কথা৷ গুড গার্ল৷’ এবার তিনি ইলিনা আর সজনীর দিকে তাকালেন : ‘তোমরা কিছু বলবে?’
অবাক ভাবটা কাটিয়ে ইলিনা আর সজনী একইসঙ্গে মাথা নাড়ল : ‘না, বড়দি, আমরা কিছুই দেখতে পাইনি—৷’ ওরা তখনও আড়চোখে বারবার সম্পিকে দেখছিল৷
‘গুড৷’ খুশির গলায় বললেন প্রীতি৷ তারপর স্নেহমাখা মোলায়েম গলায় আরও বললেন, ‘তোমরা এখন বড় হয়েছ৷ স্কুলের ভালোমন্দ অনেকটাই বুঝবে৷ জানো, সুনাম তৈরি করতে বহু বছর লেগে যায়! কিন্তু দুর্নাম?’ একটু থামলেন৷ তারপর : ‘দুর্নাম হওয়ার জন্যে একটা দিনই যথেষ্ট৷ আসলে…৷’
বড়দির বক্তব্যের স্রোতে বাধা পড়ল৷ কারণ, মলিনাদি ঘরে এসে ঢুকল৷
মলিনাদি বড়দির খাসবেয়ারা৷ তা ছাড়া ক্লাসে-ক্লাসে নোটিস নিয়ে যায়৷
মলিনাদি বেশ মোটাসোটা৷ রং কালো, মাথায় কাঁচাপাকা চুল৷ চোখে কালো ফ্রেমের চশমা—তার একটা ডাঁটিতে তাপ্পি লাগানো৷
ইলিনারা লক্ষ করল মলিনাদি বেশ হাঁপাচ্ছে, আর চোখগুলো গোল-গোল৷
‘কী হয়েছে, মলি?’ কথা থামিয়ে প্রীতি দত্ত প্রশ্ন করলেন৷
বড়-বড় শ্বাস টেনে-টেনে মলিনা বলল, ‘বলাইদার ছেলে…বলাইদার ছেলে…পরান…পরান…৷’
‘কী হয়েছে পরানের? কী হয়েছে?’ বড়দি প্রশ্ন করতে-করতে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছেন৷
‘পরান…পরান মারা গেছে গো, দিদি, মারা গেছে!’ এ-কথা বলেই মলিনা চাকরিজীবনে কখনও যা করেনি তাই করে বসল৷ বড়দির সামনেই ধপাস করে একটা খালি চেয়ারে বসে পড়ল এবং বুকে দু-হাত চেপে উত্তেজনাটাকে সামাল দিতে চেষ্টা করল৷
মলিনার অসংলগ্ন কথা থেকে প্রীতি দত্ত অনেক কষ্টে গোটা গল্পটা উদ্ধার করলেন৷
স্কুলের ঘণ্টা বাজায় যে-বলাইদা, সে সার্ভেন্টস কোয়ার্টারে থাকে৷
তার বয়েস অনেক৷ মাথার মাঝখানে টাক৷ তার চারদিকে সাদা ঝালরের মতো চুল৷ মুখে খোঁচা-খোঁচা সাদা দাড়ি৷ খানিকটা কুঁজো হয়ে থাকা বৃদ্ধ শরীর৷ ধীরে-ধীরে হাঁটা-চলা করে৷ কিন্তু বলাইদার ঘণ্টা বাজানোর জোর অবাক করে দেওয়ার মতো৷
সেই বলাইদার জোয়ান ছেলে পরান কাছাকাছি একটা রেশন-দোকানে চাকরি করে৷ অনেক সময় হিসেবনিকেশের চাপে পরান রাতে সেই দোকানেই থেকে যায়৷ কাল রাতেও সেরকম কিছু একটা হয়েছে বলে বলাইদারা ভেবেছিল৷ কিন্তু আজ সকালে পরান না ফেরায় বলাইদারা অপেক্ষা করে-করে শেষ পর্যন্ত বেলায় পরানের খোঁজ করতে সেই দোকানে যায়৷ গিয়ে শোনে, গতকাল রাতে পরান বৃষ্টির মধ্যেই বাড়ি রওনা হয়ে গিয়েছিল৷ বৃষ্টি থেকে মাথা বাঁচানোর জন্য ও দোকান থেকে শুধু একটা পলিথিনের প্যাকেট নিয়েছিল৷
তখন বলাইদারা পাগলের মতো পরানের খোঁজ করতে থাকে৷ হাসপাতালে, থানায়, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে—সব জায়গায়৷
কিন্তু পরানকে পাওয়া যায়নি৷
তারপর, একটু আগে, কোয়ার্টারের একটা বাচ্চা ছেলে স্কুলের পিছনদিকের পাঁচিলের কাছে ‘ছোট বাইরে’ করতে গিয়ে পরানের ডেডবডি দেখতে পায়৷
চারটে বড়-বড় আমগাছ আর কৃষ্ণচূড়া গাছের মাঝে বৃষ্টির জলে ভেজা আগাছা আর ঘাস-পাতার ওপরে পরানের দেহটা পড়ে ছিল৷ ওর মাথাটা ছিল একটা পলিথিনের প্যাকেটে ঢাকা৷
বাচ্চা ছেলেটা বুঝতে না পেরে ‘পরানদা, পরানদা—’ বলে পলিথিনের প্যাকেটটা ধরে টান মারে৷ জলে ভেজা প্যাকেটটা খুলে আসতেই পরানের ফ্যাকাশে মুখটা দেখা যায়৷
পরানের গায়ের রং শ্যামলা হলেও দেখা গেল, ওর সারাটা শরীর সাদাটে, রক্তশূন্য৷ চোখ দুটো বড়-বড়, যেন ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসবে৷ আর ঘাড়ে-গলায় চার-পাঁচ জায়গায় গভীর ক্ষতের দাগ৷ সেখানে কালচে রক্ত জমাট বেঁধে আছে৷
