সমর্পিতা বেশ দমে গেল৷ ওর মুখ দেখে সেটা বোঝা গেল৷ আর কোনও কথা না বলে ও গুম হয়ে বসে পড়ল৷ কিন্তু ওর ভেতরে-ভেতরে একটা রাগ তৈরি হল৷ সবকিছু ও নিজের চোখে দেখেছে৷ তা সত্ত্বেও ব্যাপারটা ওকে ‘দেখার ভুল’ বলে মানতে হবে!
এটা ঠিকই যে, আকাশে মেঘ ছিল, বৃষ্টি ছিল, অন্ধকার ছিল৷ কিন্তু বিদ্যুতের আলোও তো ছিল! তার সঙ্গে টর্চের আলো৷ তা ছাড়া ওদের চোখগুলো জ্বলছিল!
বড়দি ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে সজনী আর ইলিনা ব্যাগ-ট্যাগ নিয়ে সম্পির দু-পাশে এসে বসে পড়ল৷ তারপর চাপা গলায় ফুসুর-ফুসুর শুরু করল৷ টিফিনের সময় বড়দির মুখোমুখি হওয়ার সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে লাগল৷ কাকলি ম্যাডামের ক্লাসের দিকে ওদের আর মন রইল না৷
সম্পি চাপা গলায় ইলিনাকে বলল, ‘আমি স্পষ্ট দেখেছি, দুজনের গায়ে আমাদের মতো স্কুল-ড্রেস ছিল৷ আর-একজনের ছিল শাড়ি৷’
সম্পিদের কাছ থেকে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও স্কুল-ড্রেস-এর ব্যাপারটা ইলিনা আর সজনীরও নজরে পড়েছিল৷ তাই ‘হুঁ’ বলে ওরা দুজনে ঘাড় নাড়ল৷
সম্পি বলল, ‘তার মানে, দুজন আমাদের স্কুলেরই স্টুডেন্ট—নাইন অথবা টেন-এর…৷’
ওর এ-কথা বলার কারণ, সিনিয়ার স্কুলের ক্লাস নাইন আর টেন-এর স্টুডেন্টদের ড্রেস সাদা টপ আর সবুজ স্কার্ট৷ ফাইভ থেকে এইট পর্যন্ত স্কুল-ড্রেসটা অন্যরকম—সাদা ফ্রক, সবুজ টিউনিক৷ আর জুনিয়ার স্কুলের বিল্ডিংও আলাদা, ড্রেসও আলাদা : সবুজ পাড় আর পাইপিং লাগানো সাদা ফ্রক৷
সম্পি আবার বলল, ‘আর শাড়িটা দেখেছিলি? ওটার রং ঠিকঠাক বুঝতে পারিনি, তবে পাড়ের চওড়া ডিজাইনটা আমার মনে আছে…৷’
‘তাতে কী হয়েছে?’ ইলিনা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল৷
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর সম্পি ফিসফিস করে বলল, ‘কাল ওই ডিজাইনের শাড়ি পরে আমাদের একজন ম্যাডাম স্কুলে এসেছিল…৷’
ইলিনা আর সজনীর শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল৷
কাল ওদের একজন ম্যাডাম সেই একই ডিজাইনের শাড়ি পরে স্কুলে এসেছিলেন? তারপর সেই ম্যাডাম অন্ধকার আর বৃষ্টির মধ্যে খেলার মাঠের ওই মরা গাছটার ডাল থেকে ডালে ছাতা মাথায় লাফিয়ে বেড়াচ্ছিলেন? এ কী সর্বনেশে ব্যাপার!
‘তুই জানিস কে সেই ম্যাডাম?’ উত্তেজনায় কেঁপে যাওয়া গলায় জানতে চাইল সজনী৷
‘হ্যাঁ, জানি৷’ দুষ্টুমির চোখে একে-একে ইলিনা আর সজনীকে দেখল সম্পি৷ তারপর : ‘কিন্তু নামটা তোদের এখন বলব না৷ আমি চুপচাপ থেকে ক’টা দিন ওই ম্যাডামের ওপরে নজর রেখে দেখি৷ তারপর…৷’
ইলিনা সম্পির দিকে তাকাল৷
সম্পির ফোলা-ফোলা গাল, অথচ তা সত্ত্বেও চোয়ালের শক্ত রেখা বেশ স্পষ্ট৷ ক্লাসরুমের পাখা বনবন করে ঘুরছে, কিন্তু সম্পির গালে, কপালে বিন্দু-বিন্দু ঘাম৷
দেখে মনে হচ্ছিল, সম্পি ব্যাপারটা নিয়ে রীতিমতো ছানবিন করবে বলে শপথ নিয়েছে৷
ইলিনার ভয়-ভয় করে উঠল৷ কারণ, কাল রাতের তিনটে প্রেতিনীর মড়ার মতো মুখ ও অস্পষ্টভাবে হলেও দেখতে পেয়েছে৷ তা ছাড়া ওই খিলখিল হাসি!
ইলিনা আমতা-আমতা করে জিগ্যেস করল, ‘বড়দির কাছে গিয়ে কী বলবি?’
‘এসব কিচ্ছু বলব না৷ বলব আমি যা দেখেছি…৷’
কথাটা সম্পি আর শেষ করল না৷ কারণ, ঠিক তখনই বাংলার ক্লাস শেষ হওয়ার ঘণ্টা পড়ল৷
টিফিনের স্বতঃস্ফূর্ত হইচই আজ বেশ কম মনে হল৷ কারণ, গতকালের অদ্ভুত খবরটা ফিসফিসে প্রচারে অনেকটাই ছড়িয়ে গেছে৷
অনুষ্কার ডেস্কের দিকে চোখ গেল ইলিনার৷ ও আজ আসেনি৷ সকাল থেকেই ইলিনার চোখ বারবার অনুষ্কার ডেস্কের দিকে চলে যাচ্ছে৷ কেন কে জানে!
ইলিনা, সজনী আর সমর্পিতা তাড়াহুড়ো করে টিফিন খাওয়া শেষ করল৷ বড়দির ঘরে ডাক পড়েছে বলে তিনজনের বুক দুরদুর করছিল৷ ইলিনা ক্লাসরুমের বড় জানলা দিয়ে বাইরে একবার তাকাল৷ আকাশ মেঘলা৷ তার সঙ্গে সকাল থেকেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি৷
বড়দির কাছে গিয়ে কী বলবে সেটা সম্পি, ইলিনা আর সজনী বেশ কয়েকবার চাপা গলায় রিহার্সাল দিল৷ সম্পি বারবার বলছিল, ‘আমি যা দেখেছি সেটাই স্ট্রেটকাট বড়দিকে বলব৷ যা সত্যি, তাই৷ লুকোনোর কী আছে?’
ইলিনা আর সজনী ওকে বোঝাতে লাগল৷
এ নিয়ে অনেক সময় কেটে গেল৷ শেষ পর্যন্ত ওরা তিনজনে প্রায় হাতে হাত ধরে বড়দির ঘরের দিকে রওনা হল৷ সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল৷
একতলায় প্রীতি দত্তর বিশাল ঘর৷ ঘরের দু-পাশে দুটো করে জানলা৷ তাদের মাপ এত বড় যে, সাধারণ বাড়ির দরজাকেও হার মানায়৷ ডানদিকের খোলা জানলা দিয়ে স্কুলের লাগোয়া ফুলের বাগান দেখা যাচ্ছে৷ বাগান পেরোলেই চোখে পড়ছে খাটো পাঁচিল ঘেরা এলাকা—তার ভেতরে ছোট-ছোট সার্ভেন্টস কোয়ার্টার৷
সময়ের আঁচড়ে ময়লা হয়ে যাওয়া একটা প্রকাণ্ড মাপের সেক্রেটারিয়াট টেবিল৷ তার পিছনে বড়দি মুখ ভার করে বসে আছেন৷ টেবিলের ওপরে পেন স্ট্যান্ড, রাইটিং প্যাড, একটা মোবাইল ফোন, আর রাজ্যের খাতাপত্র ছড়ানো৷ টেবিলের একপাশে একটা পুরোনো মডেলের কম্পিউটার৷ আর বড়দির সামনে একটা গোলাপি রঙের কোঁচকানো রুমাল, তার পাশে একটা প্লাস্টিকের চাকতি দিয়ে ঢাকা দেওয়া কাচের গ্লাসে আধগ্লাস জল৷
বড়দির মুখোমুখি চারটে হাতল-ওয়ালা কাঠের চেয়ার৷ চারটেই খালি৷ চেয়ারের পিঠ ধরে ইলিনারা সার বেঁধে দাঁড়িয়ে পড়ল৷ চুপচাপ দাঁড়িয়ে বড়দির কথার অপেক্ষা করতে লাগল৷
