যদি ওরা প্রাণীগুলোকে ঠিকমতো দেখতে পেত তাহলে আর এগোত না৷
এমন সময় আকাশে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল৷ পরপর দু-বার৷
সম্পিরা দেখতে পেল ওদের৷ সঙ্গে-সঙ্গে ডাকাবুকো সম্পি আর রবিনা ম্যাডাম থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন৷ ওঁদের চিৎকার থেমে গেল৷
ছাতার নীচে তিনটে ফ্যাকাশে সাদা বিকৃত মুখ৷ চোখগুলো পুরোটা কালো—তাতে সাদা অংশ বলে কিছু নেই৷ শুধু মাঝখানে দুটো উজ্জ্বল আলোর বিন্দু ধকধক করে জ্বলছে৷ ওদের ঠোঁট জোড়া টুকটুকে লাল—যেন লিপস্টিকে রাঙানো৷ তিনজনেরই ঠোঁটজোড়া ফাঁক হয়ে আছে৷ আর সেই ফাঁক দিয়ে ওদের দাঁত দেখা যাচ্ছে৷ এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসানো ঝকঝকে ইস্পাতের দাঁত৷ দাঁতগুলো মাপে ছোট, কিন্তু অসংখ্য৷
এরা কারা? কোথা থেকে এল এখানে?
বিদ্যুতের আলো নিভে গেল৷ চারপাশ আবার ছায়া-অন্ধকার৷
রবিনা ম্যাডামের হাত থরথর করে কাঁপছিল৷ সেই কাঁপা হাতে তিনি টর্চের আলো ছুড়ে দিলেন একজনের মুখে৷ তারপর আর-একজনের৷ তারপর…৷
আবার দেখা গেল সেই ভয়ংকর মুখ৷ আরও ভয়ংকর ওদের পোশাক৷
একজনের পরনে রঙিন শাড়ি৷ আর অন্য দুজনের গায়ে স্কুল-ড্রেস৷ সবুজ স্কার্ট আর সাদা টপ৷ মাথায় জোড়া বিনুনি করে ফিতে বাঁধা৷
টর্চের আলোয় সাদা টপে রক্তের দাগ চোখে পড়ল যেন৷
সঙ্গে সঙ্গে সম্পি ভয়ে চিৎকার করে উঠল৷
রবিনা ম্যাডামের গলা দিয়ে কোনও আওয়াজ বেরোচ্ছিল না৷ ওঁর হাতে ধরা টর্চের আলোটা ভীষণ কাঁপছিল৷ তখনই বিদ্যুৎ চমকে উঠল আবার৷ তারপর কড়কড় শব্দে বাজ পড়ল৷ বৃষ্টি আরও জোরে শুরু হল৷
তিনটে মানুষ—কিংবা অমানুষ—আচমকা শূন্যে লাফ দিল৷ হাউইবাজির মতো ছিটকে চলে গেল দূরে৷
তারপর আবার লাফ৷ আরও দূরে৷
শেষে মিশে গেল অন্ধকারে৷
এরকম লাফ মানুষ দিতে পারে না৷
একটা অদ্ভুত ‘গোঁ-গোঁ’ শব্দ করে রবিনা ম্যাডাম অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন৷ ওঁর হাতের টর্চ ছিটকে পড়ল দূরে৷
সম্পি ওঁর শরীরের ওপরে ঝুঁকে পড়ে ‘ম্যাডাম! ম্যাডাম!’ বলে ডাকতে লাগল৷ পিছনে তাকিয়ে দেখল অনেকে ওদের দিকে এগিয়ে আসছে৷ ফেস্টিভ্যাল হলের আলো আর সার্ভেন্টস কোয়ার্টারের আলোর পটভূমিতে মানুষগুলোর ছায়া দেখা যাচ্ছে৷
.
৷৷চার৷৷
পরদিন স্কুলে হইচই যেটা হল সেটার ধরনটা অনেকটা ভ্রমরের গুঞ্জনের মতো৷
মেয়েদের মধ্যে চাপা ফিসফাস, তর্কবিতর্ক চলতে লাগল৷ আর সমর্পিতাকে ঘিরে যত উত্তেজনা, যত আলোড়ন৷ ও যেন সাহসের জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়ে গেছে৷ ওকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি ভিড়৷ তারপর হালকাভাবে ঘেরাও হয়েছে ইলিনা, সজনী, আর রিহার্সালে হাজির থাকা বাকি মেয়েরা৷
ক্লাসের ফাঁকে-ফাঁকে কিংবা ক্লাসের মধ্যেই সম্পিকে একই কাহিনি বারবার বলতে হচ্ছে৷ অন্য মেয়েরা এক-একটা ক্লাসের পর পালা করে বসার জায়গা পালটে সম্পির পাশে গিয়ে বসছে৷ এইভাবে গতকাল রাতের ভয়ংকর কাহিনি ছড়িয়ে গেল প্রায় সব ক্লাসেই৷
স্কুলের হেডমিসট্রেস মিসেস প্রীতি দত্ত বেশ রাশভারী মানুষ৷ মাথায় কাঁচাপাকা চুল, চোখে সরু মেটাল ফ্রেমের চশমা৷ ওঁকে খুব কম সময়েই হাসতে দেখা যায়৷
তিনি সকাল থেকে প্রতিটি ক্লাসে ভিজিট করে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলেছেন, যাতে এই ব্যাপারটা নিয়ে বেশি গুজব না ছড়ায়৷
ইলিনাদের ক্লাসে হেডমিসট্রেস এলেন৷ তখন কাকলি ম্যাডামের বাংলা ক্লাস চলছিল৷ ছাত্রীদের লক্ষ করে বড়দি বললেন, ‘শোনো, মেয়েরা৷ কাল রাতে যা হয়েছে সেটা আমার কানে এসেছে৷ ব্যাপারটা আর কিছুই নয়, সিম্পলি একটা…মানে…অ্যাক্সিডেন্ট৷ একে তো রাত, তার ওপরে মেঘ-বৃষ্টি৷ বুঝতেই পারছ ব্যাপারটা হ্যালুসিনেশান…মানে, দেখার ভুল হতে পারে৷ তা ছাড়া রবিনার তো শরীর ভালো নয়—লো প্রেশারে ভোগে৷ তাই ও হঠাৎ করে সেন্সলেস হয়ে গেছে…৷
‘যাই হোক, ব্যাপারটা নিয়ে তোমরা কারও সঙ্গে আর আলোচনা কোরো না৷ বরং বেস্ট হবে, যদি তোমরা সবাই এই ইনসিডেন্টটা ভুলে যাও৷ তা না হলে কথার পিঠে কথা ছড়াবে…তারপর কোন সময় দেখবে পুলিশ আর টিভি চ্যানেলের লোকজন স্কুলে এসে হাজির হবে, আর হাজারটা কোয়েশ্চেন করে আমাদের সবাইকে জ্বালিয়ে খাবে৷ তা ছাড়া আমাদের স্কুলের একটা নামডাক আছে৷ সম্মান আছে৷
‘তা হলে মনে থাকবে তো? ব্যাপারটা আর কিছুই নয়…রাতবিরেতে দেখার ভুল৷ বুঝলে?’
ক্লাসের সব মেয়ে একসঙ্গে ঘাড় নেড়ে বলল, ‘মনে থাকবে, বড়দি৷’
কাকলি ম্যাডামও কাঁচুমাচু মুখে ঘাড় কাত করলেন৷
হঠাৎই সমর্পিতা উঠে দাঁড়াল : ‘বড়দি—৷’
প্রীতি দত্ত ভুরু কুঁচকে বড়সড় চেহারার ছাত্রীটির দিকে তাকালেন৷
ইলিনা আর সজনীর বুক দুরদুর করে উঠল৷ ওরা আঁচ করতে পারল সম্পি কী বলতে চলেছে৷ এই বোধহয় ও বড়দির বকুনি খেল!
‘বড়দি, আমি কাল রাতে রবিনা ম্যাডামের সঙ্গে ছিলাম৷’
‘হ্যাঁ৷ জানি৷ তো?’ ভুরুজোড়া আরও কাছাকাছি চলে এল৷
‘রবিনা ম্যাডাম…অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন৷ আমি হইনি৷ আমি…সবটা নিজের চোখে দেখেছি—৷’
‘হ্যাঁ, শুনেছি৷ রবিনা বলেছে৷ কিন্তু এখন আর কোনও কথা শুনতে চাই না৷ তুমি, ইলিনা আর সজনী বরং টিফিনের সময় আমার রুমে এসো—তখন সব শুনব, আর আমার যা বলার বলব৷’ চোখের চশমাটা ঠিকঠাক করে নাকের ওপরে বসালেন প্রীতি দত্ত : ‘মোট কথা, এ-ব্যাপারে যেন একটা শব্দও বাইরে না যায়৷ আমাদের স্কুলের সুনামই হচ্ছে প্রথম এবং শেষ কথা৷ বুঝেছে?’ শেষ শব্দটায় ধমকের সুর আরও স্পষ্ট শোনাল৷
