রবিনা ম্যাডাম একটু ইতস্তত করলেন৷ বোধহয় ভাবলেন, ছাত্রীর কাছে সাহসের পরীক্ষায় তিনি হেরে যেতে চান না৷ তাই বললেন, ‘চল তা হলে, একবার কাছ থেকে দেখে আসি…৷’
বাস্কেটবল গ্রাউন্ডকে পাশ কাটিয়ে ওরা এগিয়ে গেল৷ সামনে বড়-বড় গাছপালা, আর তার পরেই বিশাল খেলার মাঠ৷ এই মাঠে খেলাধুলো ছাড়াও স্কুলের অ্যানুয়াল স্পোর্টস হয়৷ সেই মাঠটার একপাশে প্রায় তিনতলা সমান উঁচু একটা প্রকাণ্ড গাছ আছে৷ ওই গাছটা দেখলেই ইলিনার ভয় করে৷ কারণ, অত বড় গাছটায় একটিও পাতা নেই৷ শুধু অসংখ্য শুকনো ডালপালা কঙ্কালের মতো আকাশের দিকে ছড়িয়ে গেছে৷ হঠাৎ করে মনে হয়, কেউ যেন একশো হাতের পাঁচশো আঙুল আকাশের দিকে তুলে ভগবানের কাছে মুক্তি চাইছে৷
বাস্কেটবল গ্রাউন্ড পেরিয়ে গাছপালার গাঢ় অন্ধকার এলাকায় ঢুকে পড়ল ওরা৷ ইলিনার এবার বেশ ভয় করছিল৷ মনে হচ্ছিল, রাতের অন্ধকারে জঙ্গলের মধ্যে ওরা কোনও অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়েছে৷
গাছপালার পাতায় বৃষ্টি আটকালেও পাতা থেকে টপটপ করে জল ঝরে পড়ছিল৷ সজনী ইলিনার হাত চেপে ধরেছিল৷ মনে হচ্ছিল, এইভাবে ওদের শরীরে আর মনে ভরসার আদানপ্রদান হচ্ছিল৷
সমর্পিতা রবিনা ম্যাডামকে বলল, ‘ওই দেখুন ম্যাডাম, আলোগুলো আরও কতটা দূরে…৷’
‘মনে হয়, ওই মরা গাছটার কাছে…৷’ রবিনা ম্যাডাম বললেন৷
ওরা জলের ওপরে পায়ের ছপছপ শব্দ তুলে এগোতে লাগল৷
আরও অনেকটা এগোতেই ওরা দৃশ্যটা ঠিকঠাক দেখতে পেল৷ কারণ, সেই মুহূর্তেই আকাশে নীল বিদ্যুৎ ঝলসে উঠেছে, আর বাজ পড়ার শব্দ কানে আসার আগেই ওরা শুনতে পেল খিলখিল হাসির শব্দ৷
মরা গাছটা ইলিনাদের কাছ থেকে এখন অন্তত তিরিশ-চল্লিশ মিটার দূরে৷ কিন্তু তার জন্য দেখতে কোনও অসুবিধে হল না৷
তিনটে প্রাণী ওই মরা গাছটার ডালে নানান উচ্চতায় উবু হয়ে বসে আছে৷ তাদের প্রত্যেকের মাথায় ছাতা৷ আর ছাতার নীচের অন্ধকারে দুটো করে সাদা আলোর চোখ জ্বলছে৷
ওরা খিলখিল করে হাসছে আর বিদ্যুতের ঝিলিকের মতো এ-ডাল থেকে সে-ডাল লাফাচ্ছে৷ কখনও লাফিয়ে ভিজে মাঠে নেমে আসছে, কখনও-বা মাঠ থেকে সোঁ করে লাফিয়ে উঠে যাচ্ছে ডালে৷ ওদের হাতে ধরা ছাতাগুলো অনেকটা প্যারাশুটের মতো লাগছে৷
সজনী ভয়ে চাপা চিৎকার করে উঠতেই ইলিনা চট করে ওর মুখে হাত চাপা দিল৷
রবিনা ম্যাডাম মরা গাছটার দিকে চোখ রেখেই ভয়ের গলায় জিগ্যেস করলেন, ‘ওগুলো কী—মানুষ, না পশু?’
প্রশ্নটা কাকে লক্ষ্য করে সেটা বোঝা যায়নি বটে কিন্তু সমর্পিতা উত্তর দিল, ‘ওগুলো মানুষ নয়, ম্যাডাম৷ মনে হচ্ছে, খারাপ কিছু…৷’
সেই ‘খারাপ কিছু’-টা যে কী সেটা ওরা চারজন হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে বুঝতে চেষ্টা করল৷
এমন সময় আবার বিদ্যুৎ চমকে উঠল৷ ওদের হাসির শব্দ স্পষ্ট শোনা গেল৷ তারপরই বাজ পড়ার বিকট শব্দে সেটা কিছুক্ষণের জন্য চাপা পড়ে গেল৷
ইলিনারা অন্ধকারে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে রুদ্ধশ্বাসে সেই অলৌকিক সার্কাস দেখতে লাগল৷
সজনী কাঁপা গলায় বলল, ‘ম্যাডাম, ফিরে চলুন৷ আমার…আমার ভয় করছে…৷’
‘ফিরে যাব কেন?’ বকুনির সুরে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন রবিনা ম্যাডাম৷ আঁচলে জড়ানো হাতের মুঠোয় ধরা টর্চটা বের করে মাটির দিকে তাক করে জ্বেলে ধরলেন৷ টর্চের জোরালো সাদা আলোয় বৃষ্টি-ভেজা ঘাস আর পাতা চোখে পড়ল৷ রবিনা বললেন, ‘আমরা চারজন আছি—ভয় কীসের! আমরা সবাই মিলে তাড়া করলে ওরা…মানে, ওই অ্যানিম্যালগুলো পালাবে৷’
রবিনার কথা শেষ হওয়ামাত্রই একটা চমকে ওঠা ঘটনা ঘটে গেল৷ সমর্পিতার ভেতরে কেউ যেন আচমকা সাহস এবং অ্যাকশনের সুইচ অন করে দিল৷ মেয়েটা ‘অ্যাই, তোরা কে রে?’ বলে কান-ফাটানো চিৎকার করে ভেজা মাঠের ওপর দিয়ে মরা গাছটা লক্ষ্য করে ছুটতে শুরু করল৷ আর একইসঙ্গে ‘চোর! চোর!’ বলে চেঁচাতে লাগল৷
রবিনা ম্যাডাম ‘সম্পি! সম্পি!’ বলে চিৎকার করে উঠলেন৷ তারপর টর্চ জ্বেলে সেটাকে সামনে পিস্তলের মতো বাগিয়ে ধরে সম্পির পিছন-পিছন ছুটতে শুরু করলেন৷ অবাক হয়ে ভাবলেন, মেয়েটা চেহারায় দশাসই হলেও বেশ জোরে ছুটতে পারে দেখছি!
রবিনা ‘চোর! চোর!’ বলে চিৎকার করছিলেন আর ইলিনাদের কাছ থেকে ক্রমশ দূরে সার যাচ্ছিলেন৷
ইলিনা আর সজনী ভয় পেয়ে গেল৷ কারণ, ওদের দুই সাহসী সদস্য এখন আর ওদের পাশে নেই৷ তাই ওরাও রবিনা ম্যাডামকে লক্ষ্য করে দৌড়তে শুরু করল৷ আর একইসঙ্গে ‘চোর! চোর!’ বলে চিৎকার করতে লাগল৷
ওদের চারজনের চিৎকারে সার্ভেন্টস কোয়ার্টার থেকে লোকজন বেরিয়ে এল৷ কিন্তু অন্ধকার আর বৃষ্টির জন্য ওরা ভালো করে কিছু ঠাহর করতে পারছিল না৷
সম্পিদের ‘চোর! চোর!’ চিৎকারে প্রাণীগুলো কিন্তু মোটেই ভয় পায়নি৷ বরং ওদের হাসাহাসি আর লাফালাফির খেলা চালিয়ে যাচ্ছিল৷ কিন্তু সম্পি খুব কাছাকাছি এসে পড়তেই ওরা লাফিয়ে মাটিতে নামল৷ তারপর হাসি বন্ধ করে মাথার ওপরে ছাতা ধরে স্থির হয়ে দাঁড়াল৷
রবিনা ম্যাডাম সম্পিকে প্রায় ধরে ফেলেছিলেন৷ শাড়ি পরে থাকলেও ওঁর অ্যাথলেটিক শরীর ওঁকে দ্রুত দৌড়তে সাহায্য করছিল৷
ঘোলাটে অন্ধকারে রবিনা প্রাণীগুলোকে ভালো করে দেখতে পাচ্ছিলেন না৷
সম্পি রবিনার তুলনায় খানিকটা এগিয়ে ছিল৷ কিন্তু ও-ও ঠিকঠাক দেখতে পাচ্ছিল না৷ শুধু গাঢ় কালচে তিনটে ছাতার নড়াচড়া বুঝতে পারছিল৷
