সমর্পিতা এমন লম্বা-চওড়া যে, স্কুল-ইউনিফর্ম পরে থাকলেও ওকে ইলিনাদের চেয়ে বয়েসে অনেক বড় বলে মনে হয়৷ লেখাপড়া ছাড়া অন্য যে-কোনও কাজে ওর উৎসাহ অনেক বেশি৷ স্কুলের সবরকম অ্যাক্টিভিটিতে সম্পি সবার আগে হাজির৷ দিদিমণিদের কোনও ব্যক্তিগত কাজের জন্যেও ওর ডাক পড়ে৷ দিদিরা সবাই ওকে ভালোবাসেন, স্নেহ করেন৷ আর বন্ধুদের মতো ওর বড় মাপের নামটাকে ছোট করে ‘সম্পি’ বলে ডাকেন৷
ইলিনা সম্পির গায়ে ছোট্ট ঠেলা দিয়ে বলল, ‘কী রে, কীসের আওয়াজ?’
সম্পি বলল হাত নেড়ে, ‘ছাড় তো, ও কিছু নয়৷ ওই লাস্ট ইয়ারে যেমন শোনা গিয়েছিল৷ তারপর খোঁজ নিয়ে দেখবি হয়তো কাকু কিংবা মাসিদের কোয়ার্টারে কোনও ছেলেপিলে মেঝেতে নারকোলের মালা ঠুকে আওয়াজ করে খেলছে…৷’
এটা ঠিকই যে, স্কুলের অনেক কর্মী—বলাইদা কিংবা আশাদির মতো—ক্যাম্পাসের মধ্যেই সংসার নিয়ে কোয়ার্টারে থাকে৷ টিনের চালে ছাওয়া ছোট-ছোট পাকা ঘরগুলোই ওদের কোয়ার্টার৷ ওদের কোনও ছেলেমেয়ে এই ভূতুড়ে কাণ্ড করতেই পারে৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও ইলিনার তেমন ভরসা হচ্ছিল না৷
যেন ওকে সাহস দিতেই সমর্পিতা উঠে দাঁড়াল৷ তারপর গটগট করে পা ফেলে এগিয়ে গেল খোলা জানলার দিকে৷
কাকলি ম্যাডাম ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘সম্পি, কী করছ! যেয়ো না, যেয়ো না…৷’
ম্যাডামের কথা সমর্পিতা শুনল না৷ জানলার কাছে পৌঁছে গেল৷ এবং ওর পিছু-পিছু রওনা হল ইলিনা, সজনী আর অঙ্গনা৷
ভয় যে ওদের করছিল না তা নয়—কিন্তু কৌতূহলটাও কিছু কম ম্যাথাচাড়া দিচ্ছিল না৷
রবিনা ম্যাডামের ভয়-টয়ের কোনও বালাই নেই৷ তিনিও কখন যেন ইলিনাদের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন৷ অন্য মেয়েরা তখন শতরঞ্চিতে বসে ভয় আর কৌতূহলের চোখে ইলিনাদের দিকে দেখছে৷
জানলার বাইরে বৃষ্টি আর অন্ধকার৷ আকাশে মাঝে-মাঝে বিদ্যুতের ঝিলিক৷ তারই মধ্যে নজর চালিয়ে সম্পি ব্যাপারটা ভালো করে দেখতে চেষ্টা করল৷
বাস্কেটবল গ্রাউন্ডের দিক থেকে ঘোড়ার খুরের শব্দ আসছে ঠিকই, কিন্তু সাদা আলোর দু-একটা বিন্দুও চোখে পড়ছে যেন৷ মাপে জোনাকি পোকার মতো, কিন্তু অনেক উজ্জ্বল৷ বিন্দুগুলো চঞ্চলভাবে এদিক-ওদিক ছিটকে বেড়াচ্ছে৷
আকাশে গুড়গুড় শব্দে মেঘ ডাকল৷ কিন্তু তাতে ঘোড়ার টগবগ শব্দ চাপা পড়ল না৷
অঙ্গনা জিগ্যেস করল, ‘ওই আলোগুলো কীসের? মনে হচ্ছে কারা যেন মিনি সার্চলাইট জ্বেলেছে৷’
একইসঙ্গে ইলিনা টের পেল অঙ্গনা ওর গায়ের কাছে সরে এসেছে৷
সমর্পিতা বলল, ‘কীসের আলো সেটা গিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে৷’
কাকলি ম্যাডাম হারমোনিয়ামের কাছে বসেছিলেন৷ সেখান থেকেই চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘না, না—যাওয়ার কোনও দরকার নেই৷ তা ছাড়া বৃষ্টি পড়ছে দেখছ না!’
রবিনা ম্যাডাম জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলেন৷ সেদিকে চোখ রেখেই বললেন, ‘এমন কিছু বৃষ্টি পড়ছে না—৷’
এ-কথা শেষ হতে-না-হতেই সম্পি দৌড়ল হলের দরজার দিকে৷
পিছন থেকে কাকলি ম্যাডাম, অঙ্গনা, ইলিনা সবাই ‘সম্পি! সম্পি!’ বলে ডাকতে লাগল৷
কিন্তু সেসব ডাক সম্পির কানে বোধহয় ঢুকল না৷ ও ততক্ষণে হলের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেছে৷
রবিনা ম্যাডাম আর দেরি করলেন না৷ সম্পির পিছন-পিছন দৌড়লেন৷ আর ওঁর সঙ্গে-সঙ্গে ছুট লাগাল ইলিনা আর সজনী৷
বাইরেটা অন্ধকার, জলে ভেজা৷ সামনে পিচের রাস্তা, তারপর ছোট্ট একটা পার্কের মতো৷ এই পার্কে পতাকা তোলার ফাংশান হয়৷
পার্কের চারপাশের রেলিং বেশ খাটো৷ ওরা দেখল, শর্টকাট করার জন্য সম্পি লাফিয়ে পার্কের রেলিং ডিঙিয়ে ওপারে পৌঁছে গেছে৷ ইলিনা আর রবিনা ম্যাডামরা পার্কটাকে পাশ কাটিয়ে সম্পিকে ধরার জন্য দৌড়ল৷
পার্ক পেরিয়ে একটা সবুজ মাঠ৷ তারপর বাস্কেটবল গ্রাউন্ড৷ সম্পি সেখানে পৌঁছে কয়েক লহমা দাঁড়াল৷ তারপর রেলিং ঘিরে দৌড়তে যাবে তখনই রবিনা ম্যাডাম ওকে ধরে ফেলল৷ একটু পরেই ইলিনা আর সজনী সেখানে পৌঁছে গেল৷
বাস্কেটবল গ্রাউন্ডের রেলিং উঁচু, তাই সেটা ডিঙোনোর প্রশ্ন ওঠে না৷ সেইজন্যই সম্পি বোধহয় দাঁড়িয়ে পড়েছিল৷ ভাবছিল এরপর কী করবে৷ তা ছাড়া ঘোড়ার খুরের আওয়াজটা এখন আর শোনা যাচ্ছিল না৷
কিন্তু সাদা আলোর বিন্দুগুলো আরও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল৷
স্কুল-ক্যাম্পাসের নানা জায়গায় পিচের রাস্তা এঁকেবেঁকে চলে গেছে৷ রাস্তার একপাশে অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে লাইটপোস্ট৷ তার ঝিমিয়ে পড়া আলো অন্ধকারের সঙ্গে অসম লড়াই করছে৷
ওরা সবাই দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ভিজছিল আর হাঁপাচ্ছিল৷ তাকিয়ে ছিল খাঁ-খাঁ বাস্কেটবল গ্রাউন্ডের দিকে৷ রাস্তার আলো সেখানে ছিটকে এসে পড়েছে৷ কংক্রিটে বাঁধানো গ্রাউন্ড বৃষ্টির জল পড়ে চকচক করছে৷
রবিনা ম্যাডাম বললেন, ‘এবার ফিরে চল৷ ওই ঘোড়ার খুরের শব্দ…ওটা হয়তো ভুল শুনেছি৷ তা ছাড়া ওটা শুধু শব্দ…ভয়ের কিছু নেই৷ তোদের কাকলি ম্যাডাম একটুতেই ভয়-টয় পায়৷ চল…৷’
রবিনা ম্যাডামের কথার পিঠে সমর্পিতা বলল, ‘সে না হয় বুঝলাম, ম্যাডাম৷ কিন্তু ওই আলোগুলো কীসের? এখন দেখছেন, ওগুলো কেমন এদিক থেকে ওদিকে লাফাচ্ছে!’
সত্যিই তাই৷ আলোগুলো এখন লাফিয়ে উঁচু থেকে নীচে নামছে, আবার নীচ থেকে লাফিয়ে ওপরে উঠছে৷ কখনও ওগুলো আবার দপ করে নিভে যাচ্ছে৷
