অনুষ্কা হাসল : ‘হ্যাঁ, এনেছি৷ ছাতা ছাড়া আমি চলতেই পারি না৷ তা ছাড়া বৃষ্টি আমার একদম ভালো লাগে না…৷’
‘কেন?’
বৃষ্টি পড়ছিল—তবে তেমন জোরে নয়৷ সেদিকে অপছন্দের চোখে তাকাল অনুষ্কা৷ বলল, ‘পরিবেশবিদরা বলেন, বৃষ্টির জলে অ্যাসিড থাকে…৷’
‘যাঃ, সে তো রেয়ার! তোমার এটা ভুল ধারণা—৷’
‘ভুল ধারণা হোক আর যা-ই হোক, বৃষ্টি আমার ভাল্লাগে না…৷’
মেঘের গর্জন শোনা গেল আকাশে৷
.
৷৷তিন৷৷
স্কুলের অ্যানুয়াল ফাংশান আর বেশি দূরে নেই—মাত্র দু-মাস বাকি৷ নাচ, গান, আবৃত্তি আর নাটকের রিহার্সাল শুরু হয়ে গেছে৷ স্কুলের যে-কোনও কালচারাল প্রোগ্রামে শম্পা ম্যাডাম আর কাকলি ম্যাডাম সবসময় দায়িত্ব নেন৷
শম্পা ম্যাডাম বেশ লম্বা, খুব সুন্দর নাচতে পারেন৷ আর সবসময় মুখে হাসি৷
কাকলি ম্যাডাম মাথায় খাটো৷ মোটাসোটা৷ মাথায় ঘন কোঁকড়ানো চুল৷ রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারেন ফাটাফাটি৷ কিন্তু ওঁর ভীষণ ভূতের ভয়৷
ইলিনাদের কালচারাল প্রোগ্রামের রিহার্সাল হয় ফেস্টিভ্যাল হলে৷ হলটা বিশাল বড়৷ ওলটানো ‘ভি’ অক্ষরের মতো টিনের চালে ঢাকা৷ অনেক সময় ছোটখাটো প্রোগ্রাম হলে এই হলঘরটাতেই সেরে নেওয়া হয়৷ কিন্তু স্কুলের অ্যানুয়াল ফাংশান মানে ঘ্যাম ব্যাপার৷ তখন খেলার মাঠে প্রকাণ্ড প্যান্ডেল বাঁধা হয়৷
গত বছর ইলিনারা ফেস্টিভ্যাল হলে সন্ধেবেলা গানের রিহার্সাল দিচ্ছিল৷ কাকলি ম্যাডাম ওদের ‘চিত্রাঙ্গদা’-র গানগুলো তোলাচ্ছিলেন৷ তখন পাশের বাস্কেটবল গ্রাউন্ড থেকে অদ্ভুত এক শব্দ ভেসে এসেছিল৷
স্কুলের বাস্কেটবল গ্রাউন্ডটা বড় মাপের, কংক্রিট দিয়ে বাঁধানো৷ তার চারপাশটা লোহার জালের উঁচু রেলিং-এ ঘেরা৷ যখন খেলা-টেলা থাকে না তখন গ্রাউন্ডে ঢোকার লোহার গেটটায় তালা দেওয়া থাকে৷ সেদিনও তাই ছিল৷ তবুও সেখান থেকে ভেসে আসছিল খটখট-খটখট শব্দ৷ যেন অনেকগুলো টগবগে ঘোড়া বাস্কেটবল গ্রাউন্ডের কংক্রিটের মেঝেতে পাগলের মতো ছুটে বেড়াচ্ছে৷
এরপর ওদের গানের রিহার্সাল ভন্ডুল হয়ে গিয়েছিল৷
ইলিনা স্কুলের কাজের মাসি আশাদির কাছে শুনেছে, এই স্কুলটা নাকি সাহেবি আমলে সৈন্যদের ছাউনি ছিল৷ স্কুলের বিশাল এলাকার নানান সব বিল্ডিং-এ সৈন্যরা থাকত৷ আর মেইন স্কুল বিল্ডিংটা ছিল হেস্টিংস সাহেবের কোয়ার্টার৷ একসময় হেস্টিংস রাজা চন্দ্রভানুকে এই বিশাল সম্পত্তি নামমাত্র দামে বিক্রি করে দেন৷
এই স্কুল ক্যাম্পাসে যে সন্ধেবেলা কখনও-সখনও ভূতুড়ে কাণ্ড শুরু হয় এমন দুর্নাম বরাবরই ছিল৷
কখনও মাঠের বড়-বড় গাছপালার ফাঁকে আলোর ফুটকি দেখা যায়৷ সেগুলো খসে পড়া তারার মতো ছুটোছুটি করে বেড়ায়৷
কখনও বাস্কেটবল গ্রাউন্ডে ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা যায়৷
একবার ক্লাস টেন-এর একটা মেয়ে দোতলার বারান্দা থেকে আর-একটা মেয়েকে নীচে লাফিয়ে পড়তে দেখেছিল—কিন্তু মেয়েটির পড়ার কোনও শব্দ শোনা যায়নি বা একতলায় ছুটে গিয়ে কোনও বডি পড়ে থাকতে দেখা যায়নি৷
কিন্তু এতসব গুজব, রটনা কিংবা দুর্নাম থাকলেও স্কুলটা যে এখনও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে তার কারণ পড়াশোনা৷ মাধ্যমিক পরীক্ষায় রাজা চন্দ্রভানু মালটিপারপাস গার্লস স্কুলের রেজাল্ট বরাবরই ঈর্ষা করার মতো৷
আজ অ্যানুয়াল ফাংশানের গানের রিহার্সাল চলছিল৷ কাকলি ম্যাডাম ছ’জনকে একসঙ্গে বসিয়ে একটা গান তোলাচ্ছিলেন৷ পাশে বসেছিলেন শম্পা ম্যাডাম আর রবিনা ম্যাডাম৷ রবিনা ম্যাডাম খুব ভালো আবৃত্তি করতে পারেন৷ ইলিনাদের প্রোগ্রামে সঞ্চালনা আর আবৃত্তির ব্যাপারটা তিনিই দেখাশোনা করেন৷ ম্যাডামের বয়কাট চুল আর মুখে কয়েকটা বসন্তের দাগ আছে বলে ওঁকে একটু রুক্ষ দেখায়৷ তবে ওঁর ব্যবহার খুব মিষ্টি আর দারুণ সাহস৷ একবার নাকি হেডমিসট্রেসের ভূতের ভয় তাড়াতে সন্ধে সাতটার সময় টর্চ ছাড়াই অন্ধকারে গোটা ক্যাম্পাসটা চক্কর দিয়ে এসেছিলেন৷
রবিনা ম্যাডাম ইলিনাদের সবসময় বলেন, ‘শোন, ভূত বলে কিছু নেই৷ আসলে তোরাই এক-একটা ভূত৷’
তখন ক্লাসের আর-একটি মেয়ে, সজনী, ফোড়ন কেটে বলে উঠেছিল, ‘ভূত না, ম্যাডাম—পেতনি…৷’ তাতে ক্লাসের সবাই হেসে উঠেছিল৷ আর রবিনা ম্যাডামও হাসি চাপতে পারেননি৷
বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল৷ মেঘও ডাকছিল আপন খেয়ালে৷ হলের টিনের চালে বৃষ্টির আওয়াজ হচ্ছিল৷ খোলা জানলা দিয়ে বিদ্যুতের ঝিলিক চোখে পড়ছিল৷
হলের মেঝেতে বিশাল মাপের তিনটে শতরঞ্চি পাতা৷ তার ওপরে সবাই বসেছিল৷ কাকলি ম্যাডাম ছ’জনকে গান তোলাচ্ছিলেন আর ইলিনারা দশ-বারো জন একটু দূরে বসে নিজেদের মধ্যে চাপা গলায় গল্পগুজব করছিল৷
হঠাৎই ঘোড়ার খুরের শব্দ কানে এল ওদের৷ মনে হল, বাস্কেটবল গ্রাউন্ডের কংক্রিট বাঁধানো চাতালে যেন অনেকগুলো ঘোড়া এলোমেলোভাবে ছুটে বেড়াচ্ছে৷
ইলিনা চমকে উঠল৷ ওর মনে পড়ল, প্রায় বছরখানেক এই শব্দটা শোনা যায়নি৷
শব্দটা যে কাকলি ম্যাডামও শুনতে পেয়েছেন সেটা বোঝা গেল৷ কারণ, তিনি গান থামিয়ে দিয়েছেন৷ আশা-আশঙ্কার চোখে রবিনা ম্যাডামের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন৷ যেন ভূত তাড়াতে রবিনা ম্যাডামই একমাত্র ভরসা৷
ইলিনার পাশে বসে ছিল সমর্পিতা—সম্পি৷ ওর দশাসই মোটাসোটা চেহারা, আর ডাকাবুকো বলে স্কুলে বেশ খ্যাতি আছে৷
