ইলিনা টিফিনবক্সটা ব্যাগ থেকে বের করে নিল৷ তারপর তাকাল অনুষ্কার দিকে৷
অনুষ্কা একটা খাতা খুলে তাতে মনোযোগ দিয়ে কী যেন লিখছিল৷ ওর দু-পাশে পারমিতা আর সুচন্দ্রা বসে৷ এখন ওরা কেউ সিটে নেই৷ বোধহয় টিফিন খেতে বাইরের করিডরে কোথাও গেছে৷
ইলিনার কেমন একটা জেদ চেপে গেল৷ আজ ও অনুষ্কার সঙ্গে আলাপ করবেই৷ গায়ে পড়ে হলেও ওর সঙ্গে আজ আলাপ করতে ভীষণ ইচ্ছে করছে৷
তাই ইচ্ছে আর জেদ সঙ্গী করে ও সরাসরি অনুষ্কার কাছে চলে গেল৷ ওর ডানপাশের খালি চেয়ারটায় ধপ করে বসে পড়ে বলল, ‘কী করছ?’
অনুষ্কা চোখ তুলে তাকাল ইলিনার দিকে৷
কী সুন্দর গভীর দুটো চোখ! টানা-টানা, ঘন চোখের পাতার সীমানায় ঘেরা৷ হঠাৎ করে দেখলে মনে হয় কাজল পরে এসেছে৷ ওর চোখের মণির ভেতরে চক্রের মতো অনেকগুলো বৃত্ত৷ সেগুলোর দিকে তাকালে মনে হয় বৃত্তগুলো কোন পাতালে চলে গেছে৷
‘একা-একা বসে কী করছ?’ ইলিনা আবার জিগ্যেস করল৷
‘কিছু না৷’ নীচু গলায় অনুষ্কা বলল৷
ওর খাতার দিকে চোখ গেল ইলিনার৷ সেখানে অদ্ভুত একটা ছবি বারবার আঁকা—ছোট-বড় নানান মাপে৷ একটা ফুলকে ঘিরে দুটো সাপ—তাদের লেজের কাছটা একে অপরের সঙ্গে জড়ানো৷
দেখে কোনও একটা প্রতীকচিহ্ন গোছের ছবি বলে মনে হয়৷ অথবা কোনও ট্যাটুর নকশা৷
‘এটা কীসের ছবি?’ ছবিটার দিকে আঙুল দেখিয়ে জানতে চাইল৷
‘ও কিছু না…৷’
‘দারুণ হয়েছে কিন্তু৷ অনেকটা ট্যাটুর ডিজাইনের মতো৷ তুমি তো জানো আমি ট্যাটুর ডিজাইন আঁকি৷ খাতাটা পরে আমাকে দিয়ো—আমি ডিজাইনটা তুলে নেব৷’
কথাটা শুনেই শক খাওয়ার মতো চমকে উঠল অনুষ্কা৷ কেমন একটা ভয়ের চোখে তাকাল ইলিনার দিকে : ‘না, না—এটা বাজে ছবি৷ এটার কোনও মানে হয় না৷ ওয়ার্থলেস—৷’
এ-কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে অনুষ্কা ছবিগুলোর ওপরে এলোমেলো কাটা-কুটি দাগ আঁকতে লাগল৷ ছবিগুলো নিপুণভাবে নষ্ট করতে লাগল৷
‘কী করছ! কী করছ! সুন্দর ছবিগুলো নষ্ট করছ কেন?’
কিন্তু অনুষ্কা ইলিনার কথায় মোটেই কান দিল না৷ কাটাকুটি দাগ কাটতে-কাটতেই বিড়বিড় করে বলল, ‘সুন্দর নয়, বাজে ছবি…বাজে ছবি…৷’
ইলিনা কেমন যেন অপ্রস্তুত হয়ে গেল৷ ওর আলাপের শুরুটা এভাবে ধাক্কা খাবে ও ভাবেনি৷
প্রসঙ্গ পালটাতে ও টিফিনবক্স খুলে ফেলল৷ সঙ্গে-সঙ্গে ফ্রেঞ্চ টোস্টের জিভে-জল-আনা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল৷ মা-মণি টিফিনবক্সে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছে৷ একটা খোপে চার পিস ফ্রেঞ্চ টোস্ট৷ তার পাশের খোপে একটা মিষ্টি৷ আর একটা ছোট পলিপ্যাকে টমেটো সস৷
‘এসো, আমার টিফিন শেয়ার করো…৷’
‘টিফিন?’ খানিক যেন দিশেহারা হয়ে ইলিনার দিকে তাকাল অনুষ্কা : ‘টিফিন তো আমার খাওয়া হয়ে গেছে…৷’
ইলিনা বেশ অবাক হয়ে গেল৷ স্কুল বসেছে সকাল এগারোটায়৷ তারপর, চারটে পিরিয়ড শেষ হলে এই টিফিন ব্রেক৷ সুতরাং টিফিন ব্রেকের আগে টিফিন খাওয়ার কোনও সুযোগ নেই৷ তাহলে অনুষ্কা এসব কী বলছে? ওর টিফিন খাওয়া হয়ে গেছে!
‘কখন টিফিন খেলে তুমি! আমাকে এত বোকা পেয়েছ!’ বন্ধুত্বে ভরা মজার সুরে বলল ইলিনা, ‘নাও, ফ্রেঞ্চ টোস্ট খাও! আমার মা-মণি ভেজে দিয়েছে—৷’
‘না, মানে…আমার ঠিক খিদে নেই৷’ নরম গলায় বলল, ‘প্লিজ, তুমি কিছু মাইন্ড কোরো না…৷’
অনুষ্কার মিষ্টি মুখে কাতর এক অনুনয় ফুটে উঠেছিল৷ সেদিকে তাকিয়ে ইলিনা আর কিছু বলতে পারল না৷ তবে একইসঙ্গে ওর মনে পড়ল এই ছ’দিনে অনুষ্কাকে ও কোনওদিন টিফিন খেতে দেখেনি৷ অর্থাৎ, অনুষ্কা টিফিন খাচ্ছে এমন দৃশ্য ওর চোখে পড়েনি৷
মুহূর্তের মধ্যে খটকাটা ডিঙিয়ে ও ফ্রেঞ্চ টোস্ট টমেটো সস-এ ছুঁইয়ে কামড় বসাল৷ খেতে-খেতে প্রসঙ্গ পালটে চলে গেল রনিতা ম্যাডামের দিকে৷
‘রনিতা ম্যাডামকে তুমি আজ দারুণ টাইট দিয়েছ৷ আমি ভাবতেই পারিনি তুমি ওই সাডেন অ্যাটাকের মুখে ওরকম ঠিক-ঠিক আনসার দিতে পারবে…৷’
‘উঁ৷’ বলে ছোট্ট একটা শব্দ করল অনুষ্কা৷
‘কী করে পারলে বলো তো!’ ইলিনা বলেই চলল, ‘ফ্যানট্যাস্টিক! তুমি যে ক্লাসে এত মনোযোগ দিয়ে শোনো সেটা তোমাকে দেখে কিন্তু বোঝা যায় না…৷’
অনুষ্কা শান্ত চোখে তাকাল ইলিনার দিকে৷ বলল, ‘মনোযোগ দিতে হয় না৷ আমাদের এমনিতেই সব মনে থাকে…৷’
ইলিনা ফ্রেঞ্চ টোস্টে কামড় দিতে গিয়ে থমকে গেল৷
‘আমাদের এমনিতেই সব মনে থাকে’ মানে?
সে-কথাই ও জিগ্যেস করল, ‘ ‘‘আমাদের’’ বলছ কেন? আমাদের মানে?’
চমকে উঠল অনুষ্কা৷ তাড়াতাড়ি শুধরে নিয়ে বলল, ‘আমাদের মানে আমার৷ আমার এমনিতেই সব মনে থাকে…৷’ কথা শেষ করে হাসল৷
ইলিনা অবাক চোখে অনুষ্কার দিকে তাকিয়ে রইল৷ একে তো অপরূপ সুন্দরী, তার ওপর এত গুণ! বাব্বাঃ! এমনিতেই সব মনে থাকে!
ভগবানের ওপরে রাগ হল ইলিনার৷ একজনকে উজাড় করে সবকিছু দেওয়ার কী দরকার ছিল? মনে থাকার ব্যাপারটা তিনি যদি কাইন্ডলি ইলিনাকে দিতেন তা হলে পরীক্ষার রেজাল্টটা অনেক ভালো হতে পারত৷ বাপি আর মা-মণির কাছ থেকে রেগুলার বকাবকি শুনতে হত না৷
জানলার ফ্রেমে বাঁধানো আকাশটা আরও কালো হয়ে গিয়েছিল৷ বিদ্যুৎ সেই কালোর ওপরে মাঝে-মাঝেই সাদা তরোয়াল ঘোরাচ্ছিল৷
ইলিনা সেদিকে তাকিয়ে বলল, ‘দেখবে, ছুটির সময় ঠিক বৃষ্টি হবে৷ তুমি ছাতা এনেছ তো? আমি এনেছি…৷’
