শালিখ দেখতে গিয়ে ইলিনার চোখ গেল অনুষ্কার দিকে৷ মনে হল, ইলিনার মতো ওরও ইতিহাসে মন নেই, আর ও-ও যেন আনমনাভাবে খাতায় আঁকিবুকি কেটে চলেছে৷
অনুষ্কাকে কেমন অদ্ভুত বলে মনে হয় ইলিনার৷ মাত্র সাতদিন আগে মেয়েটা ক্লাস টেন-এ ওদের সেকশানে এসে ভরতি হয়েছে৷ ওর বাবা সরকারি চাকরি করেন৷ ঝাড়খণ্ড থেকে ট্রান্সফার হয়ে কলকাতায় এসে পড়েছেন৷ তাই অনুষ্কা এই স্কুলে ভরতি হতে পেরেছে৷ নইলে ইলিনাদের স্কুলে ক্লাস টেন-এ কাউকে ভরতি নেওয়া হয় না৷
অনুষ্কাকে দেখতে খুব সুন্দর৷ এত সুন্দর যে, অন্য মেয়েরা যখন-তখন ওর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে৷ ইলিনার খুব বিশ্বাস, কোনও ফিল্ম ডিরেক্টর ওকে দেখামাত্র সিনেমা কি টিভি-তে চান্স দিয়ে দেবে৷
রনিতা ম্যাডাম আনমনা অনুষ্কাকে খেয়াল করেছিলেন৷ তাই ওকে ‘শিক্ষা’ দেওয়ার জন্য ওর দিকে আঙুল তুলে বললেন, ‘অনুষ্কা, তুমি বলো..৷’
অনুষ্কা শান্তভাবে উঠে দাঁড়াল৷ নিষ্পাপ ফুটফুটে মুখে তাকাল ম্যাডামের দিকে৷
রনিতা ম্যাডাম ক্লাস নাইন-এর কয়েকটা চ্যাপ্টার রিভাইজ করাচ্ছিলেন৷ তাই সম্রাট অশোকের ধর্মের বিষয়ে পড়াচ্ছিলেন৷
অনুষ্কাকে রনিতা ম্যাডাম জিগ্যেস করলেন, ‘সম্রাট অশোক যে ধর্ম প্রচার করেছিলেন, বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে তার সূক্ষ্ম তফাত কোথায় ছিল?’
রনিতা ম্যাডামের রোগা চেহারা৷ চশমার পিছনে চোখ দুটো বেশ রাগি৷ কপালে ভাঁজ৷ সবসময় ছাত্রীদের হেনস্থা করেন, শাস্তি দেওয়ার ফিকির খোঁজেন৷
ইলিনা বুঝল, আজ অনুষ্কার রেহাই নেই৷ কপালে চূড়ান্ত বকুনি আছে৷ তারপর, যদি কপাল আরও খারাপ হয়, তা হলে ক্লাস সিক্সের রুমের সামনে গিয়ে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে৷
ইলিনার বুকের ভেতরটা অকারণেই ঢিপঢিপ করতে লাগল৷ ও স্থির চোখে অনুষ্কার দিকে তাকিয়ে রইল৷ অপেক্ষা করতে লাগল৷
কিন্তু কী আশ্চর্য!
অনুষ্কা মিষ্টি গলায় ধীরে ধীরে উত্তর দিল, ‘ম্যাডাম, বৌদ্ধধর্মের তুলনায় অশোকের প্রচার করা ধর্ম অনেক বেশি উদার আর মানবতাবাদী ছিল৷ অশোক তাঁর ধর্মে ব্যক্তিগত জীবন আর সমাজজীবনকে পরিশুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন৷ সেই কারণেই তিনি দান, দয়া প্রভৃতি বারোটি গুণের অনুশীলন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন৷ তাঁর প্রচলিত ধর্মে নানা ধর্মের সার কথাগুলো জায়গা পেয়েছিল…৷’
রনিতা ম্যাডাম কেমন যেন হকচকিয়ে গেলেন৷ শিকার হাতছাড়া হওয়ার দুঃখের চেয়ে ভ্যাবাচ্যাকা ভাবটাই বেশি করে ফুটে উঠল ওঁর মুখে৷ তিনি স্পষ্ট দেখেছেন, মেয়েটা অন্যমনস্ক হয়ে খাতায় কী যেন করছিল৷ তা হলে কী করে ওঁর এইমাত্র পড়ানো লাইনগুলো হুবহু বলে দিল!
অনুষ্কা কি ওঁর বলা কথাগুলো খাতায় টুকছিল? তারপর প্রশ্নের উত্তরে সেই লেখাগুলোই রিডিং পড়ে দিল?
কিন্তু উত্তর দেওয়ার সময় মেয়েটা তো খাতার দিকে তাকায়নি!
মরিয়া হয়ে ডায়াস থেকে নেমে এলেন রনিতা ম্যাডাম৷ মেয়েটার খাতাটা একবার দেখা দরকার৷
‘দেখি, তোমার খাতাটা দেখি—৷’ চটপটে পায়ে জানলার পাশ দিয়ে হেঁটে অনুষ্কার কাছে চলে এলেন৷
অনুষ্কা কোনও কথা না বলে ডেস্কের ওপরে রাখা খোলা খাতাটা দিদিমণির দিকে এগিয়ে দিল৷
রনিতা ম্যাডাম দেখলেন৷ পাতা দুটোয় কিছু লেখা নেই৷ শুধু ডানদিকের পাতার নীচের কোনার দিকে কয়েকটা হিজিবিজি দাগ৷
খাতাটা ওকে ফেরত দিয়ে সামান্য ধমকের সুরে ‘বোসো’ বলে ডায়াসের দিকে ফিরে গেলেন৷ ওঁর ফিরে যাওয়ার ভঙ্গিতে কেমন যেন একটা ‘হেরে যাওয়া’ ভাব ছিল৷
ইলিনার খুব আনন্দ হচ্ছিল৷ ওর মনে হল অনুষ্কা যেন রনিতা ম্যাডামকে পালটা একটা ‘শিক্ষা’ দিল৷ অনুষ্কাকে একটা চুমু খেতে ইচ্ছে করল ওর৷ ওর সঙ্গে জমিয়ে গল্প করতেও ইচ্ছে করল৷
কিন্তু সেটা বোধহয় সম্ভব নয়৷ কারণ, প্রথম দিন থেকেই ইলিনা লক্ষ করেছে, অনুষ্কা ভীষণ একা-একা আর চুপচাপ থাকে—কারও সঙ্গে মিশতে চায় না৷ ইলিনা দু-একবার আলাপ জমানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু কথাবার্তা তেমন এগোয়নি৷
রনিতা ম্যাডাম মঞ্চে উঠে আবার পড়াতে শুরু করেছিলেন, কিন্তু ওঁর যান্ত্রিক আত্মবিশ্বাসে কেমন যেন চিড় ধরে গিয়েছিল৷ তাই পড়ানোর তাল আর লয় বারবার গোলমাল হয়ে যাচ্ছিল৷
ইলিনা ভাবছিল, পিরিয়ডটা শেষ হলে বাঁচি৷ কারণ, তারপরই টিফিন৷ তখন অন্তত আধঘণ্টা হাঁফ ছেড়ে বাঁচা যাবে৷
আজ ওর পড়াশোনার মুড নেই৷ শুধু গল্প করতে ইচ্ছে করছে আর গান শুনতে ইচ্ছে করছে৷ কে জানে কেন—হয়তো আকাশটা মেঘলা বলেই৷ আর তার সঙ্গে ঝিরঝিরে বৃষ্টি মনখারাপের ইন্ধন জোগাচ্ছে৷
হঠাৎই টিফিনের ঘণ্টা পড়ল৷ টিফিনের ঘণ্টার একটা বিশেষ ঢং আছে৷ ছুটির ঘণ্টারও তাই৷ ঠিক ফুটবল খেলায় হাফটাইম আর গোলের বাঁশি বাজানোয় যেমন তফাত থাকে৷
ওদের স্কুলের ঘণ্টাটা দারুণ৷ একতলার বারান্দায় সিলিং থেকে ঝোলানো বড় পিতলের ঘণ্টা—ঠিক পূর্ণিমার চাঁদের মতো৷ বৃদ্ধ বলাইদা কাঠের হাতুড়ি দিয়ে সেই ঘণ্টাটা টাইমে-টাইমে বাজিয়ে দেয়৷
টিফিন হতেই গোটা ক্লাসটা স্বাধীন এবং এলোমেলো হয়ে গেল৷ কেউ-কেউ জানলার কাছে চলে গেল৷ আকাশ, বৃষ্টি আর গাছপালা দেখতে লাগল৷ বেশ কয়েকজন মেয়ে স্কুলব্যাগ থেকে টিফিনবক্স বের করে টিফিন খেতে বসল৷
আজ বৃষ্টির মধ্যে অন্য দিনের মতো একতলার উঠোনে কিংবা বাগানে গিয়ে ছুটোছুটি করে খেলার উপায় নেই৷ তাই অনেকে ক্লাসরুমের লাগোয়া করিডরে গিয়ে হইহুল্লোড় করতে লাগল৷
