প্রকাণ্ড এলাকাটা রং-চটে-যাওয়া পাঁচিল দিয়ে ঘেরা৷ তারই এক জায়গায় সিং-দরজা৷ সব কিছু দেখে মনে হয় রাজা-রাজড়াদের ফেলে যাওয়া বাগান আর প্রাসাদ৷ এককালে তাদের হাতিশালে হাতি ছিল, ঘোড়াশালে ঘোড়া৷ আজ সবই পুরোনো স্মৃতি৷ শুধু রাজবাড়িটা অতীতের সাক্ষী হয়ে চুপচাপ মনের দুঃখে দাঁড়িয়ে আছে৷ আর তাকে ঘিরে বিষণ্ণ গাছগুলো৷
কিন্তু তাই কী? এখানে এখন কেউ থাকে না তা তো নয়!
কারণ, আমি মানুষের ঘ্রাণ পাচ্ছি৷ একটা-আধটা নয়, অনেক মানুষের৷
শুধু তাই নয়, এত দূর থেকেও আমি কত মানুষের কথা শুনতে পাচ্ছি৷ শুনতে পাচ্ছি ছেলেদের গলা, মেয়েদের গলা৷
উঁহু, বাড়িটা পুরোনো জীর্ণ হলেও এখানে অনেক মানুষ থাকে৷ আমাকে ওরা কোন অদৃশ্য টানে টানছে—কাছে টানছে৷
আমি আকাশের দিকে তাকালাম৷
আকাশে মেঘ জড়ো হচ্ছিল সকাল থেকেই৷ তার সঙ্গে দম আটকানো গুমোট৷ বৃষ্টি যে হবে তার গন্ধ আমি পাচ্ছিলাম৷ এও বুঝতে পারছিলাম, মেঘ আরও ঘন হবে, আরও কালো হবে৷ এখন দেখলাম আকাশটা একেবারে ছাই রঙের হয়ে গেছে৷ আর সেই রং-টা ক্রমশ কালোর দিকে ঢলে পড়ছে৷
বৃষ্টির জল আমার ভালো লাগে না৷ বৃষ্টির জল ওপর থেকে আসে৷ প্রাকৃতিক পবিত্র জল৷ ওই জল গায়ে লাগলে আমরা—মানে, আমি আর আমার মতো যারা—নিস্তেজ হয়ে পড়ি৷ তাই ঠিক করলাম, আপাতত এই বাড়িটায় আমি আশ্রয় নিই৷ অনেক মানুষে ভরা এই আস্তানাটা আমার মন্দ লাগবে না৷
সেদিকে এগোতে গিয়েই সিং-দরজার মাথায় বসানো হোর্ডিং-টা আমার চোখে পড়ল৷ তাতে বড়-বড় হরফে লেখা রয়েছে :
রাজা চন্দ্রভানু মালটিপারপাস গার্লস স্কুল
ও, এটা তা হলে স্কুল!
ওঃ, ক’শো বছর আগে যে আমি স্কুলে পড়তে গিয়েছিলাম তা মনে নেই৷ কিন্তু যুগে-যুগে আমি মানুষের কাছ থেকে শিখেছি৷ যখনই আমি কোনও মানুষের শরীর আর মন দখল করেছি তখনই তার সব অভিজ্ঞতা আর জ্ঞান আমার অস্তিত্বে মিশে গেছে৷ আমি বহু শতকের প্রাচীন হলেও সবসময় নবীনের কাছাকাছি থেকে শিখেছি৷ তাই প্রাচীন হলেও আমি সবসময় আধুনিক৷
এখনও চিনতে পারোনি আমাকে?
আমি একজন পিশাচ—যার মধ্যে রয়েছে অতি প্রাচীন এক অমানুষ প্রেতাত্মা৷
আমি একা৷ তবে ইচ্ছে হলেই অনেক হতে পারি—অ্যামিবার মতো৷
আর যদি আমি তোমার ওপরে ভর করি, তোমার মধ্যে বাসা বাঁধি, তা হলে তখন তুমি পিশাচ৷ হ্যাঁ, হ্যাঁ—তুমি৷
আকাশ থেকে বৃষ্টির দু-একটা ফোঁটা পড়ল৷
নাঃ, আর দেরি নয়৷ আমি সিং-দরজার দিকে এগোলাম৷ তালাবন্ধ দরজার জং ধরা লোহার রডের ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লাম৷ দারোয়ানরা কেউ আমাকে দেখতে পেল না—কারণ, আগেই বলেছি, আমাকে দেখা যায় না—শুধু টের পাওয়া যায়৷
সুন্দর পিচবাঁধানো রাস্তা আর ঘাসজমির ওপর দিয়ে প্রাচীন বাড়িটার দিকে যাওয়ার সময় আমি হঠাৎই একটা চেনা গন্ধ পেলাম৷ স্কুলবাড়ির দিক থেকেই আসছে গন্ধটা৷
চমকে উঠলাম আমি৷ এ তো আমার মতোই গন্ধ! আমার একজন বন্ধু তা হলে রয়েছে ওই স্কুলবাড়িতে! আমার আগেই আমার মতো কেউ এসে আশ্রয় নিয়েছে এখানে! অথবা আস্তানা গেড়েছে ওই বাড়ির মানুষজনের ভেতরে! আনন্দ আর খুশিতে মনটা নেচে উঠল৷
বৃষ্টির ফোঁটা হঠাৎই জোরে ঝরতে লাগল৷
আর আমিও দেরি না করে ঢুকে পড়লাম স্কুলবাড়ির ভেতরে৷
.
৷৷দুই৷৷
ইতিহাসের ক্লাস এমনভাবে চলছিল যেন টিভির নিউজ চ্যানেলে কোনও রোবট পরপর দুঃখের খবর পড়ে চলেছে৷
রনিতা ম্যাডাম এভাবেই ক্লাস নেন বরাবর৷ আর সেই জন্যই পড়ার দিকে ইলিনার মন ছিল না৷ ও অনুষ্কার কথা ভাবছিল৷ মাত্র সাতদিন হল অনুষ্কা ওদের ক্লাসে ভরতি হয়েছে৷
ইলিনার ডেস্কের ওপরে ইতিহাস বইয়ের পাতা খোলা ছিল৷ তার নীচে একটা রাফ খাতা৷ সেই খাতার শেষ পাতায় ইলিনা বারবার নিজের নাম লিখছিল৷ একবার ইংরেজিতে, আর-একবার বাংলায়৷ বেশ সুন্দর ডিজাইন করে অক্ষরগুলো তৈরি করছিল ও৷ সেগুলোর দিকে একবার তাকালেই বোঝা যায় ওর অলঙ্করণের হাত বেশ ভালো৷
ইলিনার খুব শখ ও ট্যাটু আর্টিস্ট হবে৷ এ পর্যন্ত ও প্রায় চল্লিশটা ট্যাটুর ডিজাইন এঁকেছে—লাল আর নীল কালি দিয়ে৷ সেগুলো একটা বাঁধানো ড্রইং খাতায় আঁকা আছে৷ সেটার ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে ওর নিত্য-নতুন নকশার আইডিয়া মাথায় আসে৷
মাঝে-মাঝে ও বন্ধুদের হাতে বা পায়ে বলপয়েন্ট পেন দিয়ে ছোট-ছোট ট্যাটু এঁকে দেয়৷ অবশ্য বন্ধুদের পারমিশান নিয়ে তবেই৷ একবার গীতাঞ্জলির কনুইয়ের ওপরদিকটায় একটা বাজপাখির ডিজাইন এঁকে দিয়েছিল৷ সেটা রনিতা ম্যাডামের চোখে পড়ে গিয়েছিল৷ গীতাঞ্জলিকে তিনি বেশ বকুনি দিয়েছিলেন৷ কিন্তু গীতাঞ্জলি ইলিনার নাম বলেনি৷ বরং ট্যাটু আঁকার দায়টা ওর এক কাল্পনিক ভাইয়ের ওপর দিয়ে চালিয়ে দিয়েছিল৷
ইলিনার নামের অক্ষরের ডিজাইনগুলো অনেকটা ট্যাটুর ডিজাইনের মতো দেখাচ্ছিল৷ সেদিকে তাকিয়ে ইলিনা সেগুলো বেশ খুঁটিয়ে বিচার করছিল৷ হঠাৎই ক্লাসরুমের খোলা জানলায় একটা শালিখ এসে বসায় ওর সেদিকে চোখ গেল৷
ক্লাসরুমের বাইরের দিকের দেওয়ালে দুটো বড়-বড় জানলা৷ তাতে ঝিলমিল লাগানো বিশাল পাল্লা৷ পাল্লার ওপরে ফুটদুয়েক চওড়া ঝিলমিল বসানো কাঠের পাটি৷ বহু পুরোনো আমলের রাজা-রাজড়াদের বাড়িতে যেমন থাকত৷ রাজা চন্দ্রভানুও বোধহয় সেরকম কেউকেটা কোনও রাজা কিংবা মহারাজা ছিলেন৷ তাঁর সেই রাজপ্রাসাদ প্রায় একশো বছর আগে স্কুল হয়ে গেছে৷
