অচ্যুত দৌড়ে গেল কুলদীপের কাছে৷
কুলদীপ রংমশাল একহাতে সামলে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরল৷ অচ্যুত ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল৷ এক অদ্ভুত আনন্দের ঢেউ ওর বুকের ভিতরে উথলে উঠে ওকে একেবারে ভাসিয়ে দিল৷
আর ঠিক তখনই কয়েকশো জ্বলন্ত রংমশাল ছুটন্ত সত্যবানস্যার আর হেডস্যারকে ছুঁয়ে ফেলল৷
রক্ত-হিম-করা এক ভয়ংকর আর্তনাদ ধানকলের মাঠের আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে দিল৷ দপ করে জ্বলে উঠল দুই পিশাচের অভিশপ্ত শরীর৷ ওদের শরীরের ধুনি থেকে কালো ধোঁয়ার গাঢ় কুণ্ডলী পাক খেয়ে উঠতে লাগল আকাশের দিকে৷
সবাই মুখ তুলে সেই ধোঁয়ার দিকে দেখতে লাগল৷
রংমশালের আগুন নিভলে অন্ধকারে কয়েকটা টর্চ এদিক-ওদিক জ্বলে উঠল৷ দেখা গেল দুই পিশাচের তালগোল পাকানো মৃতদেহ জড়াজড়ি করে পড়ে আছে৷ দুটো সাপবাজির ট্যাবলেট পাশাপাশি পোড়ানোর পর যেরকম দশা হয় অনেকটা সেইরকম৷
আকাশে ভেসে যাওয়া কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী থেকে তখনও আর্তকান্না শোনা যাচ্ছে৷
সৌরভ, প্রতীক আর বাসব অচ্যুতকে একেবারে জাপটে ধরল৷
অচ্যুতের চোখের জল বাঁধ মানছিল না৷ কাঁদতে-কাঁদতেই ও বলল, ‘তোরা আমাকে এত ভালোবাসিস!’
কুলদীপ হাতের মাসল ফুলিয়ে বলল, ‘এসবের জন্যে কত কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছে জানিস! রাজীবের মাম্মি পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছেন রংমশাল কেনার জন্যে৷ পাড়ার দোকানে পাওয়া যায়নি—তাই বাজির আড়তে যেতে হয়েছে৷’
আবেগে অচ্যুত কোনও কথা বলতে পারছিল না৷ ও কুলদীপের গালে একটা চুমু খেল৷
এমন সময় কে একজন ওদের কাছে এসে দাঁড়াল৷ বলল, ‘বলেছিলাম না, বীতিহোত্র!’
ওরা পাঁচজন অন্ধকারেই হেসে উঠল৷ তারপর কী ভেবে অমিয়স্যারকে ঢিপ-ঢিপ করে প্রণাম করে ফেলল৷
অমিয়স্যার অচ্যুতকে লক্ষ করে বললেন, ‘তুই শুধু যে ভালো ছেলে তা নয়—অসাধ্বসও বটে!’
বাসব জিগ্যেস করল, ‘অসাধ্বস মানে কী, স্যার?’
অমিয়স্যার হেসে বললেন, ‘এও জানিস না! অসাধ্বস মানে হল সাহসী, শঙ্কাহীন৷’
অচ্যুত চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল৷ ওর শরীরটা সামান্য কেঁপে-কেঁপে উঠছিল৷ অমিয়স্যারের ‘ভালো ছেলে’ কথাটা থেকে ওর ‘গুড বয়’ মনে পড়ল৷ তারপর ‘গুড বয়’ থেকে ‘অ্যাক্সিডেন্ট’৷ আর সবশেষে ‘অ্যাক্সিডেন্ট’ থেকে একজনের কথা মনে পড়ে গেল৷
ওকে এবার সব খুলে বলতে হবে৷
.
৷৷দশ৷৷
আমি একজন পিশাচ৷ এ ছাড়া অন্য কোনও পরিচয় আমার নেই৷
এখন আমাকে আবার নতুন আশ্রয়ের খোঁজে বেরোতে হবে৷
আগেই তো বলেছি, আত্মা যদি অমর অবিনশ্বর হয় তা হলে আমার অমর হতে অসুবিধে কী! গীতার সাংখ্যযোগে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ‘নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ৷’ অর্থাৎ, কোনও শস্ত্র এই আত্মাকে ছেদন করিতে পারে না৷ অগ্নি ইহাকে দহন করিতে পারে না৷
তা হলে আমাকে অগ্নি দহন করবে কেমন করে!
তাই আকাশে, বাতাসে, ধুলোয় মিশে আবার শুরু হোক আমার পথ চলা৷
চলতে-চলতে আবার আমাকে খুঁজতে হবে নতুন আশ্রয়৷ নিতে হবে আবার কোনও নতুন পরিচয়৷ তারপর আবার বিশ্রাম আর আরাম৷
নতুন জায়গায়, নতুন পরিবেশে, শুরু হবে আমার নতুন জীবন৷
আঃ, ভাবতেই কী তৃপ্তি!
সমাপ্ত
তুমি পিশাচ
৷৷এক৷৷
আমার চলার কোনও শেষ নেই৷ আমি সত্যিকারের পথিক—পথই যার জীবন৷ আমার চলার পথের যেমন কোনও শেষ নেই, তেমন আমারও কোনও শেষ নেই৷ এমনই আমার জীবন৷
মানুষের সঙ্গে আমার মিল অনেক—কিন্তু আবার গরমিলও প্রচুর৷ আমি মানুষের মনের কথা বুঝতে পারি৷ তাই বুঝতে পারি মানুষ কেমন হয়৷ অর্থাৎ, মানুষের মন আর চেহারা দুই-ই দেখতে পাই৷ কিন্তু আমাকে কেউ দেখতে পায় না—শুধু অনুভব করতে পারে৷
মানুষ আমার খুব পছন্দের, খুব প্রিয়৷ তাই মানুষ দেখলে আমি কেমন যেন দুর্বল হয়ে পড়ি৷ এক অদ্ভুত টানে দু, তিন, কিংবা চার টুকরো হয়ে নানান মানুষের ভেতরে আশ্রয় নিই৷ তাই আমার বাসা হল মানুষ—মানুষই আমার ঠিকানা৷ কারও মধ্যে আমি পঞ্চাশ, ষাট কি একশো বছর ধরে থাকি৷ আবার কারও শরীরে থাকি পাঁচ, সাত কি দশ দিন৷ কতদিন কোথায় থাকব সেটা নির্ভর করে আমার মরজির ওপরে৷
যে-যে মানুষের মধ্যে আমি আশ্রয় নিই তাদের মধ্যে অনেকগুলো নতুন-নতুন গুণ দেখা যায়৷ কিন্তু সেই গুণগুলো হয়তো মানুষের চোখে দোষ৷ তাই আমি খুব চেষ্টা করি গুণগুলো আড়াল করে রাখতে৷
কী আশ্চর্য আমার জীবন! মানুষের এত কাছাকাছি আমি বাস করি অথচ তা সত্ত্বেও মানুষ আমাকে ভাবে অমানুষ৷ আমাকে কিছুতেই আপন করে নিতে পারে না৷
আমি জানি, এক ঠান্ডা গভীর অন্ধকার থেকে আমার উৎপত্তি৷ তারপর পথ চলা৷ শুধু পথ চলা৷ আমার বিনাশ বলে কিছু নেই৷ মানুষ আমাকে কখনও-কখনও ধ্বংস করে বটে, কিন্তু তা নিতান্তই সাময়িক৷ তখন আমি ফিরে যাই সেই ঠান্ডা অন্ধকার গহ্বরে৷ শীতঘুমে সময় কাটিয়ে দিই৷ তারপর…৷
তারপর? তারপর যখন আবার খিদে টের পাই, তেষ্টা টের পাই, মানুষের টান টের পাই—তখন আমি জেগে উঠি৷ শীতঘুম ছেড়ে বেরিয়ে আসি বাইরের আলোর জগতে, লোকালয়ে৷ যেমন এখন৷
ওই তো চোখে পড়ছে একটা বিশাল পাঁচিল ঘেরা এলাকা৷ তার ভেতরে, অনেকটা দূরে, একটা বাড়ি৷ বাড়ি তো নয়, যেন প্রাসাদ৷ না, শুধু প্রাসাদও নয়—তার সঙ্গে রয়েছে ছোট-ছোট কয়েকটা বাড়ি আর ঘিরে থাকা বাগান৷ বাগানে কত বড়-বড় গাছ৷ গাছে কত পাতা৷ সেই পাতার ছায়ায় গাছের নীচটা দিনের আলোতেও অন্ধকার-অন্ধকার দেখাচ্ছে৷ আর সেই অন্ধকারে মাথাচাড়া দিয়েছে অজস্র আগাছা৷
