অচ্যুত সে-প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলল, ‘পুজোয় তুমি নিশ্চয়ই খুব আনন্দ করবে?’
‘হ্যাঁ৷ তুমি করবে না?’
ডুবে যাওয়া সূর্যের দিকে তাকাল অচ্যুত৷ সেদিকে আঙুল তুলে বলল, ‘ওটা কী আনন্দ?’
‘কী ব্যাপার! তোমার কী হয়েছে?’
অচ্যুতের চোখে জল এসে গেল৷ হাতের পিঠ দিয়ে মোছার চেষ্টা করে জড়ানো গলায় বলল, ‘কিচ্ছু না৷ তোমার কথা বলো৷’
‘হঠাৎ আমার কথা জানতে চাইছ?’ চোখ পাকিয়ে হাসল মউলি৷
‘আজ খুব জানতে ইচ্ছে করছে৷ পরে যদি আর জানতে না পারি…৷’
‘ও—৷ ঠিক আছে, বলছি৷’ স্বামী বিবেকানন্দের ভঙ্গিতে বুকের কাছে হাত জড়ো করে সোজা হয়ে দাঁড়াল মউলি৷ তারপর পড়া মুখস্থ বলার ঢঙে বলল, ‘আমার নাম মউলি মিত্র৷ তোমাদের পাশের বাড়িতে থাকি৷ পড়াশোনায় মন নেই৷ রোজ বিকেলে অ্যাক্সিডেন্টের লোভে ছাদে উঠে ঘোরাঘুরি করি৷ ব্যস! আপাতত এইটুকুই৷’
ঠিক এইসময় সিঁড়ির কাছ থেকে মা অচ্যুতকে ডাকল৷
অচ্যুত ঘাড় ঘুরিয়ে ছাদের দরজার দিকে একবার তাকাল৷ তারপর হাত নেড়ে মউলিকে ‘টা-টা’ করে বলল, ‘কাল যদি ছাদে দেখা হয় বেশ হবে…৷’
বলেই দৌড়ে চলে গেল ছাদ থেকে৷
মউলি অবাক বিষণ্ণ চোখে অচ্যুতের চলে যাওয়া দেখল৷ ও যেন কতকিছু বলতে চাইছিল, কিন্তু বলতে পারল না৷
সত্যবানস্যারের গুড বয় কথাটা মউলিকে মনে পড়িয়ে দিয়েছিল৷ তাই আশপাশের অন্ধকার, জঙ্গলের গন্ধ, সব কিছু কেমন ভুলে গিয়েছিল অচ্যুত৷ ভুলে গিয়ে মউলির কথা ভাবতে শুরু করে দিয়েছিল৷
কিন্তু ঝিঁঝিপোকার কান্না, ব্যাঙের ডাক, জোনাকির আলো, সত্যবানস্যারের ঠান্ডা নিশ্বাস, অচ্যুতকে আচমকা ঝাঁপিয়ে ঘিরে ধরল৷
স্যারের হাত ধরে ও মাঠের ওপর দিয়ে হেঁটে চলল৷ বড়-বড় ঘাস কিংবা জল-কাদা টের পেল কি পেল না৷
বেশ কিছুটা যাওয়ার পর ও হেডস্যারের কালো ছায়াটা ঠাহর করতে পারল৷
ওকে দেখেই হেডস্যার দু-হাত শূন্যে তুলে নাচের ভঙ্গি করলেন৷
সত্যবানস্যার অচ্যুতের ঠিক পিছনে একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়ালেন৷ তারপর হিসহিস করে বললেন, ‘আজ আমাদের জন্ম-জন্মান্তরের সম্পর্ক তৈরি হবে…তেষ্টার সম্পর্ক…রক্তের সম্পর্ক৷ তারপর…তারপর তুই মুক্তি পাবি৷’
অন্ধকারে হেডস্যারের ধূসর ছায়া খিলখিল করে হাসল৷
আকাশের তুলো-তুলো মেঘ জায়গায়-জায়গায় ছিঁড়ে গেছে৷ কয়েকটা দলছুট তারা চোখে পড়ছে৷ চোখে পড়ছে পালাই-পালাই চাঁদের একটা টুকরো৷
প্রবল বাতাসের ঝাপটা হঠাৎই ওদের ঘিরে পাক খেয়ে গেল৷
অচ্যুতের চুল উড়তে লাগল৷ মায়ের কথা মনে পড়ল৷ বাপির কথা মনে পড়ল৷ মউলির কথাও৷
আর ঠিক তখনই দুটো রক্তপিশাচ অচ্যুতকে ঘিরে নাচ শুরু করল৷
অন্ধকারের ওদের সিলুয়েট ছায়ামূর্তিগুলো কীরকম লম্বাটে দেখাচ্ছে৷ লিকলিকে হাতগুলো আকাশের দিকে তুলে আঙুলে নানারকম মুদ্রা ফুটিয়ে ওরা পাগলের মতো নাচছে…নাচছে৷
অচ্যুত ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, ‘মা…মা…মাগো…৷’
ওর বুকের ভেতরটা ফেটে চৌচির হয়ে যেতে চাইল৷ ও উবু হয়ে ভিজে মাঠের ওপর বসে পড়ল৷
সাপ-খেলানো সুরে হেডস্যার তখন ফিসফিস করে বলছিলেন, ‘এ আমাদের বলির নাচ৷ তোর জীবন আমাদের তেষ্টা মেটাবে৷ আমাদের পরমায়ু বাড়িয়ে দেবে…৷’
অচ্যুত জড়ভরতের মতো ফ্যালফ্যাল করে ওঁদের নাচ দেখছিল৷ আর শেষ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছিল৷
একটু পরে ওঁরা অন্ধকার মাঠের ওপরে শুয়ে পড়লেন৷ সাপের মতো বুকে হেঁটে অচ্যুতকে ঘিরে পাক খেতে লাগলেন৷
একসময় হেডস্যার গলা উঁচু করে অচ্যুতের ঘাড়ে ঠোঁট ছোঁয়ালেন৷ অচ্যুত সাপের মুখে-পড়া ব্যাঙের মতো নিশ্চল হয়ে গেল৷
ঠিক তখনই ধানকলের মাঠের সীমানায় ফুলঝুরির মতো একটা সাদা আলো ফিনকি দিয়ে জ্বলে উঠল৷
প্রথমে একটা৷
তারপর আর-একটা৷
তারপর একে-একে অসংখ্য৷
সাদা, সবুজ, নীল, লাল—নানান রঙের রংমশাল জ্বলে উঠল মাঠের কিনারায়৷
কয়েক মিনিটের মধ্যেই মাঠ ঘিরে রংমশালের রঙিন আলোর এক বৃত্ত তৈরি হয়ে গেল৷
শ’য়ে শ’য়ে রংমশাল উদ্দাম ফুর্তিতে জ্বলছে৷ অন্ধকার মাঠে আলোর উৎসব শুরু হয়ে গেল যেন৷
‘দুর্গাপুজো কি এসে গেছে? নাকি কালীপুজো!’ ঝাপসাভাবে ভাবতে চেষ্টা করল অচ্যুত৷
ও চমকে তাকিয়েছিল আলোর দিকে৷ ঝলসানো আলোয় অস্পষ্টভাবে চোখে পড়ছে অনেকগুলো মুখ৷ ঝাঁকে-ঝাঁকে ছেলের দল হাজারো রংমশাল জ্বেলে নতুন এক অকালবোধন শুরু করে দিয়েছে৷
সত্যবানস্যার আর হেডস্যারও থমকে গেলেন৷ ওঁরা চটপট সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালেন৷ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন আলোর রেখার দিকে৷
রংমশালের আলোগুলো এবার তিরবেগে ছুটে আসতে শুরু করল ওঁদের দিকে৷ আলোর বৃত্তটা তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছোট হয়ে আসতে লাগল৷
অচ্যুত ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না৷ চোখ কচলে ও ছোট হয়ে আসা বৃত্তটাকে ভালো করে দেখতে লাগল৷
অসংখ্য ছেলে, তাদের হাতে জ্বলন্ত রংমশাল—চিৎকার করতে-করতে ছুটে আসছে ওদের দিকে৷
একটু পরে চিৎকারটা বুঝে উঠতে পারল অচ্যুত৷ জিহাদ মিছিলের স্লোগানের মতো ওরা গলায় গলা মিলিয়ে বারবার বলছে, ‘রক্তপিশাচ নিপাত যাক! রক্তপিশাচ নিপাত যাক!’
আনন্দে কান্না পেয়ে গেল অচ্যুতের৷ পুজোয় ও তা হলে মউলির মতো আনন্দ করতে পারবে!
ওই তো কুলদীপ! ওই তো সৌরভ! ওই তো বাসব!
সঙ্গে আরও অসংখ্য চেনা-অচেনা মুখ৷
হইহই চিৎকার এতক্ষণে একেবারে কাছে এসে গেছে৷ জায়গাটা আলোয় আলো হয়ে উঠেছে৷ সত্যবানস্যার আর হেডস্যার ফাঁদে পড়া নেংটি ইঁদুরের মতো ভয়ে এলোমেলো দৌড়চ্ছেন৷
