কুলদীপরা এবার বাসবকে ছেঁকে ধরল৷ কিন্তু বাসবও কোনও কথা বলতে পারল না৷ ভয়ে ওর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল৷ ও কাঁদতে শুরু করে দিল৷
সৌরভ একটু রুক্ষভাবেই অমিয়স্যারকে বলল, ‘স্যার, হেডস্যার কী বললেন? সত্যবানস্যারের ব্যাপারে উনি কি কোনও স্টেপ নিচ্ছেন?’
অমিয়স্যার সিঁড়ি নামতে-নামতে খোলা উঠোনের দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন চোখ খোলা থাকা সত্ত্বেও তিনি কিছু দেখতে পাচ্ছেন না৷ সেই অবস্থাতেই আলতো করে বললেন, ‘ওই কথাই রইল…ওই কথাই রইল৷…বীতিহোত্র, বীতিহোত্র…বীতিহোত্র ছাড়া নিস্তার নেই রে…নিস্তার নেই৷’
ওদের তিনজনকে বোকার মতো মাঠের ওপরে দাঁড় করিয়ে রেখে অমিয়স্যার চলে গেলেন৷ বাসবও ওঁর পিছন-পিছন ছুট লাগাল৷
কুলদীপরা বুঝল কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে৷ ওরা তিনজনে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল৷ তারপর একতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে জটলা শুরু করল৷
হঠাৎ ওরা দেখল, সত্যবানস্যার সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠছেন৷
প্রতীক আর সৌরভকে ইশারায় অপেক্ষা করতে বলে কুলদীপ সত্যবানস্যারের পিছু নিল৷
দোতলায় এসে সত্যবানস্যার সটান এগিয়ে গেলেন হেডস্যারের ঘরের দিকে৷ এবং পরদা সরিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলেন৷
কুলদীপও পা টিপে-টিপে পৌঁছে গেল হেডস্যারের ঘরের কাছে৷ তারপর ন্যায়-অন্যায় ভুলে গিয়ে দরজার পাশে আড়ি পাতল৷
কিছুক্ষণ সব চুপচাপ৷ তারপর ঘরের ভেতরে থেকে রক্ত-হিম-করা খিলখিল হাসি শোনা গেল৷
হেডস্যার বলছেন, ‘ছেলেটাকে আজ রাত আটটায় ধানকলের মাঠে আসতে বলেছি…৷’
সত্যবানস্যার বলছেন, ‘হ্যাঁ, অচ্যুতটা বড্ড ডিসটার্ব করছে৷ ভেবেছিলাম ওকে কিছু করব না…কিন্তু ও এমন শুরু করেছে যে, এখান থেকে হয়তো পাততাড়ি গোটাতে হবে৷’
হেডস্যার হেসে বললেন, ‘তোমার ছবি তুলেছে দেখলাম৷ তুমি দেওয়ালে হেঁটে বেড়াচ্ছ৷’
‘তাই! কখন তুলল কে জানে! অবশ্য ও-ছবি দেখিয়ে কোনওরকম সুবিধে করতে পারবে না৷ যদি পুলিশে গিয়ে জানায় তা হলে পুলিশও কোনও আমল দেবে না…৷’
‘কিন্তু বারবার যদি ও পুলিশকে বিরক্ত করতে থাকে তা হলে একসময় পুলিশও আমল দেবে৷ তখন…৷ প্র্যাকটিক্যালি সেইজন্যই একটা কড়া স্টেপ নিতে হল৷ তুমি সময়মতো গৌরী বস্ত্রালয়ের মোড়ে চলে এসো৷ দুজনে একসঙ্গে ধানকলের মাঠে যাব৷’
‘ওঃ…দারুণ হবে৷ একইসঙ্গে তেষ্টার তৃপ্তি, আর ছেলেটার হাত থেকে নিষ্কৃতি…৷’
‘তোমার দেখছি জিভে জল এসে গেছে৷’ খিলখিল করে হাসলেন হেডস্যার৷
‘আর তোমার আসেনি বুঝি!’ সত্যবানস্যারও খিলখিল করে হাসলেন৷
দুজনের হাসি যেন আর থামতেই চায় না৷ দুই পিশাচের রক্ত-হিম-করা হাসি৷
কুলদীপ বেড়ালের পায়ে ছুট লাগাল৷ ঘাম ফুটে বেরোল ওর কপালে৷ উত্তেজনায় ও চাপা সুরে শিস দিয়ে উঠল৷
দুদ্দাড় করে একতলায় নেমে এসেই ও সৌরভ আর প্রতীকের হাত ধরে টান মারল৷ দৌড়ে সাইকেল স্ট্যান্ডের দিকে যেতে-যেতে বলল, ‘শিগগিরই আয়…সামনে এখন অনেক কাজ…৷’
সাইকেল চালিয়ে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে ওরা মরিয়া হয়ে একটা সমাধান খুঁজতে লাগল৷
ভেতরে-ভেতরে ওরা ভয় পাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু আরও ভেতর থেকে কে যেন বলছিল, ‘কিছুতেই হার মানা চলবে না! কিছুতেই না!’
অমিয়স্যারের কথাগুলো কুলদীপের মনে পড়ছিল বারবার৷
.
৷৷নয়৷৷
চাঁদ মেঘে ঢাকা ছিল৷ হয়তো সেইজন্যই জোনাকির ঝাঁক বাড়াবাড়িরকম উড়ছিল৷
অচ্যুত যখন সাইকেল নিয়ে ধানকলের মাঠে পৌঁছল তখন উড়ন্ত আলোর বিন্দুগুলো ওর প্রথম চোখ টানল৷ একটা ঘোরের মধ্যে থাকলেও ও মুগ্ধ হয়ে জোনাকির খেলা দেখতে লাগল৷
আশপাশের অন্ধকারে আরও অন্ধকার গাছপালা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল৷ বাদলা বাতাস ওদের পাতায় ঝাপটা মারতেই ফিসফাস শুরু হল৷
অচ্যুতের মনে হল, ওরা বলেছে, ‘অচ্যুত এসে গেছে…অচ্যুত এসে গেছে…৷’
ঠিক সেইসময়ে ওর ঠিক পাশ থেকে ফিসফিস করে কে যেন বলে উঠল, ‘এসে গেছিস! গুড বয়৷ সাইকেল রেখে দিয়ে মাঠের মাঝে চল৷ হেডস্যার ওখানে অপেক্ষা করছেন…৷’
অচ্যুত মোটেই চমকে উঠল না৷ ধীরে-ধীরে পাশ ফিরে তাকাল৷
সত্যবানস্যার ওর খুব কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছেন৷ ওঁর নিশ্বাস অচ্যুতের গায়ে এসে পড়ছে৷ ঠান্ডা নিশ্বাস৷ কিন্তু তাতেও অচ্যুত অবাক হল না৷ ওর মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি৷
বিকেলে দু-পশলা বৃষ্টি হয়েছিল৷ তারপর একটু রোদও দেখা গিয়েছিল—শরতের রোদ৷ তখন অচ্যুত একটা পুজো-পুজো গন্ধ টের পেয়েছিল৷
ওর ভীষণ মন খারাপ লাগছিল৷ মনের ভেতর থেকে ফিসফিস করে কেউ যেন বলছিল, ‘এ-পুজো আর দেখা হবে না৷’ তাই রোদ উঠতেই ও ছাদে গিয়েছিল বিকেলের শেষ রোদটা গায়ে মাখতে৷
‘এই যে, মিস্টার অ্যাক্সিডেন্ট!’
মউলি৷ হলুদরঙের একটা চুড়িদার পরেছে৷ ঝকঝক করছে৷ মনে হচ্ছে, বিকেলের রোদ দিয়ে তৈরি৷
অচ্যুত ওর দিকে তাকাল৷ কোনও কথা বলল না৷
‘কাল রাতে কী হয়েছিল? অঙ্কস্যারকে দেখে পালিয়েছিলে কেন বলো৷ তোমার মতো গুড বয়রা কখনও এমন পালায়! তুমি কিন্তু কথা দিয়েছ আমাকে সব বলবে৷ কখন বলবে বলো৷’
অচ্যুতের অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু ও কিছুই বলতে পারল না৷ কয়েকবার ঠোঁট নড়ল শুধু৷
মউলি অপেক্ষা করতে লাগল৷
অনেকক্ষণ চেষ্টার পর শেষ পর্যন্ত অচ্যুত বিড়বিড় করে বলতে পারল, ‘বলব৷’
কিন্তু ওর হাবভাব দেখে মউলির ভুরু কুঁচকে গেল৷ পাঁচিলের কাছে এসে অচ্যুতদের ছাদের দিকে ঝুঁকে পড়ল৷ তারপর অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, ‘অ্যাই, তোমার কী হয়েছে বলো তো?’
