অচ্যুত আর ভাবতে পারছিল না৷
হেডস্যার তখন দেওয়াল থেকে সিলিং-এ চলে গেছেন৷ হাতের সিগারেটে টান দিতে-দিতে তিনি শরীরটাকে ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো ঝুলিয়ে দিলেন৷ পায়ের চেটো সিলিং-এ এঁটে আছে, মাথাটা নীচের দিকে৷
সেই অবস্থাতেই সিগারেটে টান দিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছাড়লেন মোহনলালবাবু৷ ধোঁয়াটা ওঁর পায়ের দিকে যেতে শুরু করল৷
‘দ্যাখ তো, এইরকম সবুজ চোখ?’
অচ্যুত দেখল, কখন যেন হেডস্যারের চোখ স্যাটাস্যাটের মতো সবুজ হয়ে গেছে৷ ও সেই সবুজ চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে রইল৷ একটা নেশার ঘোর ওকে ধীরে-ধীরে জড়িয়ে ধরছিল৷
‘আমি আর তোদের অঙ্কস্যার—আমরা অনেক কিছু পারি৷ আসলে আমরা কিন্তু আলাদা নই, বুঝলি…একই…৷’ মিহি খিলখিল হাসি৷ তারপর : ‘এ নিয়ে পাঁচকান করে কোনও লাভ নেই, শোরগোল কিংবা থানা-পুলিশ করেও কোনও লাভ নেই৷ এ পর্যন্ত যা-কিছু দেখেছিস, বা এখন দেখছিস—সবকিছু ভুলে যাওয়াই ভালো৷’
স্রেফ পায়ে হেঁটে সিলিং থেকে দেওয়ালে, এবং দেওয়াল থেকে মেঝেতে নেমে এলেন মোহনলালবাবু৷ টেবিলে রাখা অ্যাশট্রেতে ছোট- হয়ে-যাওয়া সিগারেটটা গুঁজে দিলেন৷ তারপর ধীরেসুস্থে চেয়ারে গিয়ে বসলেন৷
অমিয়স্যার তখন থরথর করে কাঁপছেন৷ বাসব চোখ বুজে অচ্যুতকে জাপটে ধরে রয়েছে৷ অচ্যুত সোজা হয়ে কাঠের মতো দাঁড়িয়ে—একটুও নড়াচড়া করতে পারছে না৷
ওর রাজীবের কথা মনে পড়ছিল, আর উলটোদিকের চেয়ারে বসা টাকমাথা, চশমা পরা লোকটাকে দেখে বমি পাচ্ছিল৷ ভাবছিল, কীভাবে এই একজোড়া রক্তপিশাচকে খতম করা যায়৷
মোহনলালবাবুর চোখ এখন কটা রং থেকে ক্রমে স্বাভাবিক হয়ে আসছে৷ তিনি হাতছানি দিয়ে অচ্যুতকে কাছে ডাকলেন৷
ডাকটা অনেকটা নিশির ডাকের মতন৷ অচ্যুতের সেরকমই মনে হল৷
অতিকষ্টে বাসবের বাঁধন ছাড়িয়ে ও টেবিলের পাশ ঘুরে হেডস্যারের কাছে গেল৷ বাসব ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে দিল৷
হেডস্যার ছোবল মারার মতো পলকে হাত বাড়িয়ে অচ্যুতের চুলের মুঠি ধরে এক হ্যাঁচকায় ওকে কাছে টেনে নিলেন৷ ওর মুখের কাছে মুখ নিয়ে এসে দাঁত খিঁচিয়ে হিসহিস করে বললেন, ‘তুই-ই যত নষ্টের গোড়া! তোকে ছেড়ে রেখে আমরা ভুল করেছি৷ তোকে কতকগুলো জরুরি কথা বলার আছে…৷’ ওকে হঠাৎ ছেড়ে দিয়ে গালে হাত বুলিয়ে আদর করলেন হেডস্যার৷ আচমকা পালটে গিয়ে স্নেহ আর ভালোবাসার হাসি ফুটিয়ে তুললেন মুখে৷ থুতনি নেড়ে দিয়ে বললেন, ‘তুই বড় দুরন্ত আর দুষ্টু৷ তবে লেখাপড়ায় ফার্স্টক্লাস৷ দেখবি, সামনের পরীক্ষায় তুই ফার্স্ট হবি—আমরা তোকে ফার্স্ট করাব৷ কোনও চিন্তা নেই৷ আজ রাত আটটার সময়ে ধানকলের মাঠে চলে আয় দেখি৷ আমি আর সত্যবানস্যার থাকব৷ তোর সঙ্গে আমাদের খুব জরুরি আলোচনা আছে৷ মনে করে আসবি কিন্তু৷’ অচ্যুতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন বারবার : ‘অবশ্য না এসে তুই পারবি না…আসতে তোকে হবেই…৷ আমি জানি তুই আসবি৷’
সম্মোহন করার ভঙ্গিতে একদৃষ্টে অচ্যুতের চোখে তাকিয়ে রইলেন হেডস্যার৷ আর সাপ-খেলানো সুরে বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন, ‘লক্ষ্মী ছেলে…আসবি কিন্তু…লক্ষ্মী ছেলে…আসবি কিন্তু…আসতে তোকে হবেই…না এসে তুই পারবি না…৷’
অচ্যুতের কেমন ঘোরের মতো লাগছিল৷ ও ঘাড় হেলিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, স্যার, যাব৷ যাব, যাব, যাব৷’
‘লক্ষ্মী ছেলে৷’ হেডস্যার আদরের গলায় বললেন, ‘তুই এখন যা৷ আর শোন, আমি এমন ব্যবস্থা করে দিচ্ছি যে, অমিয়বাবু আর বাসবের এসব কিছুই মনে থাকবে না৷ তবে তুই কিন্তু কাউকে কোনও কথা বলবি না৷’
অচ্যুত টেবিলের কাছ থেকে পায়ে-পায়ে সরে এল৷
হেডস্যার এবার অমিয়স্যার আর বাসবের দিকে পালা করে তাকালেন৷ ওঁর চোখ আবার সবুজ হয়ে গেল৷ অমিয়স্যার আর বাসব অপলকে হেডস্যারের দিকে তাকিয়ে রইল৷
অচ্যুতের মনে হল, কোনও অদৃশ্য রশ্মি যেন হেডস্যারের চোখ থেকে বেরিয়ে অমিয়স্যার আর বাসবের চোখ দিয়ে ঢুকে যাচ্ছে৷
প্রায় একমিনিট পর হেডস্যারের চোখ আবার স্বাভাবিক হল৷ তিনি বেশ সহজ গলায় অমিয়স্যারকে বললেন, ‘ঠিক আছে, অমিয়বাবু… আপনারা তা হলে আসুন৷ ওই কথাই রইল…৷’
অমিয়স্যার ঘাড় নেড়ে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালেন৷ বাসবের হাত ধরে সাবধানে পা ফেলে ঘরের দরজার দিকে এগোলেন৷ অচ্যুত ওঁদের পাশে-পাশে হেঁটে চলল৷
বাসব আর অচ্যুতের দিকে পালা করে তাকিয়ে অমিয়স্যার যান্ত্রিক স্বরে মিনমিন করে বললেন, ‘তা হলে ওই কথাই রইল, বুঝলি?’
বাসব ফ্যালফ্যাল করে অমিয়স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল৷ অচ্যুতের মাথায় কিছুই ঢুকল না৷
ওর মনে শুধু পাগলাঘণ্টি বাজছিল : ধানকলের মাঠ, রাত আটটা…ধানকলের মাঠ, রাত আটটা…ধানকলের মাঠ, রাত…৷
ওরা তিনজন হেডস্যারের ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল৷
প্রতীক, কুলদীপ আর সৌরভ দেখল যে-তিনজন মানুষ হেডস্যারের ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে তাদের মুখ-চোখ দেখে মনে হয় এইমাত্র ওরা সর্বস্বান্ত হয়েছে৷
প্রত্যেকেরই চোখে হতভম্ব শূন্য দৃষ্টি৷ যেন অন্য কোনও গ্রহ থেকে এসে সদ্য পা ফেলেছে পৃথিবীর মাটিতে৷
ওদের পাশাপাশি হেঁটে যেতে-যেতে একের পর এক প্রশ্ন করে চলল কুলদীপ৷
উত্তরে অচ্যুত অস্পষ্টভাবে বিড়বিড় করে কীসব বলে একরকম দৌড়ে চলে গেল ওর সাইকেলের দিকে৷
