‘কীরে, তোরা সব কোথায় চললি? এখনও বাড়ি যাসনি? যা-যা, বাড়িতে গিয়ে পড়াশোনা কর৷’
এত স্বাভাবিক কথা বলার ঢং, এত সহজ পা ফেলার ভঙ্গি যে, অচ্যুতরা স্তম্ভিত হয়ে গেল৷
অমিয়স্যার অপছন্দের চোখে সত্যবানস্যারের দিকে তাকালেন৷ একটু বোধহয় ভয়ও পেলেন৷ কারণ, অমিয়স্যারের মোটাসোটা শরীরটা পলকের জন্য কেঁপে উঠল৷
অচ্যুত বেপরোয়া ঢঙে এক পা এগিয়ে গেল সত্যবানস্যারের দিকে৷ বেশ জোরালো গলায় বলল, ‘স্যার, শুনেছেন তো, রাজীব মারা গেছে!’
সত্যবানস্যার হাসলেন, ‘হ্যাঁ রে, শুনেছি৷ ভেরি স্যাড৷ তবে চিন্তার তো কিছু নেই! তোরা তো আছিস!’
কথাটা বলেই সত্যবানস্যার আচমকা ঘুরে চলে গেলেন৷
অমিয়স্যার রাগে ফেটে পড়লেন : ‘চোরের মায়ের বড় গলা! কী স্পর্ধা! কী আটোপটংকার! চল, এখনই হেডস্যারের কাছে চল!’
স্যারের কথায় ওরা পা বাড়াল৷
স্কুল এর মধ্যেই ফাঁকা হয়ে এসেছে৷ ওরা দেখল, বানজারা নীচের ক্লাসরুমগুলোর দরজা বন্ধ করে তালা লাগাচ্ছে৷
সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতে-উঠতে অমিয়স্যার বললেন, ‘পুরকায়স্থবাবুকে ব্যাপারটা ঠিক কীভাবে বলব ভাবছি৷ উনি বোধহয় বিশ্বাস করতে চাইবেন না৷ হয়তো বলবেন…৷’
‘কেন, স্যার, ফটো তো আছে!’ বাসব বলল৷
‘হুঁ, তা আছে৷ আসলে কী জানিস, আমারই বিশ্বাস হতে চাইছে না৷ যদিও জানি, তোরা সব সত্যি কথাই বলছিস৷’
কথা বলতে-বলতে হেডস্যারের ঘরের দরজায় চলে এল ওরা৷
ঘরের বাইরে কালো কাঠের নেমপ্লেট—তার ওপরে সাদা হরফে নাম লেখা : মোহনলাল পুরকায়স্থ, এম. এসসি., এম. এড.৷
দরজায় খয়েরি রঙের ভারী পরদা ঝুলছে৷ পরদার পাশ দিয়ে ভেতরটা দেখা যাচ্ছে না৷
অমিয়স্যার একটু উসখুস করতে লাগলেন৷ বললেন, ‘এতজন একসঙ্গে ঢোকার দরকার নেই৷ উনি হয়তো কিছু মনে করবেন৷ বাসব আর অচ্যুত আমার সঙ্গে আয়৷’ হাতের ইশারায় ওদের কাছে ডাকলেন স্যার৷ প্রতীক, কুলদীপ, আর সৌরভকে লক্ষ করে বললেন, ‘তোরা বাইরে প্রতীক্ষমাণ হয়ে থাক৷ দরজা ছেড়ে কোথাও যাবি না, বুঝলি…৷’
ওরা তিনজন পরদা সরিয়ে হেডস্যারের ঘরে ঢুকে পড়ল৷
ছোট্ট ঘর৷ রং-খসা ড্যাম্প-ধরা দেওয়াল৷ সিলিং-এ কাঠের কড়িবরগা৷ শুধু জানলা-দরজার পরদাগুলোই যা বেমানানরকম আধুনিক৷
পুরোনো কাঠের চৌকো টেবিলের ওপারে বসে মোহনলালবাবু কী একটা ফাইল খুলে পড়ছিলেন৷ আঙুলের ফাঁকে সিগারেট৷
‘আসতে পারি, স্যার?’ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে অমিয়স্যার কুণ্ঠিতভাবে জিগ্যেস করলেন৷
হেডস্যার মুখ তুলে তাকালেন৷ হেসে বললেন, ‘আসুন, আসুন—বসুন…৷’
তারপরই বাসব আর অচ্যুতকে দেখে বললেন, ‘আরে তোরা! কী ব্যাপার?’
‘ওরা আমার সঙ্গে এসেছে৷ ক্লাস নাইনের ‘‘এ’’ বিভাগের ছেলে—অচ্যুত আর বাসব৷’ ওদের পিঠে একে-একে হাত দিয়ে অমিয়স্যার বললেন, ‘ইস্কুলের ভয়ংকর বিপদ, স্যার…আপনাকে কিছু একটা করতে হবে৷ ওরা আপনাকে সব…৷’
‘কী, রাজীবের ব্যাপারে কিছু?’ হেডস্যার সিগারেটে টান দিলেন৷
‘হ্যাঁ, স্যার৷’ অচ্যুতের গলা কেঁপে গেল৷
‘ফাঁড়ি থেকে বড়বাবু আমাকে ফোন করেছিলেন৷ আমি বলেছি, আজ কনডোলেন্স-এর ব্যাপার আছে—স্কুল তাড়াতাড়ি ডিজলভ করে যাবে৷ কাল দুপুরে ওঁর সঙ্গে কথা বলব৷’
অমিয়স্যার বললেন, ‘মাত্র পাঁচ-দশমিনিট সময় নেব, স্যার৷ অচ্যুত, তুই বল—সংক্ষেপে বলবি৷’
অচ্যুত ঢোঁক গিলে বলতে শুরু করল৷ রাজীবের মায়া মাখানো করুণ মুখটা কল্পনা করে ও নিজেকে জেদ আর সাহস জোগাল৷
একটানা গল্পটা ও বলে গেল৷ আগ্রহ আর চাপা কৌতুক নিয়ে মোহনলালবাবু ওর সব কথা মন দিয়ে শুনে গেলেন৷
গল্প বলা শেষ হলে পকেট থেকে সত্যবানস্যারের ফটোগ্রাফটা বের করল অচ্যুত৷ ঘন-ঘন শ্বাস নিয়ে বলল, ‘যদি স্যার, আপনার বিশ্বাস না হয়, স্যার…তা হলে এটা দেখুন…সত্যবানস্যার দেওয়ালে হাঁটছেন…৷’ ফটোটা হেডস্যারের দিকে এগিয়ে দিল ও৷
অমিয়স্যার বললেন, ‘একেবারে অবিশ্বসনীয় ঘটনা, স্যার…৷’
‘অবিশ্বাসের কী আছে!’ টেবিলের অ্যাশট্রেতে সিগারেটের ছাই ঝাড়লেন হেডস্যার৷ বললেন, ‘আপনারা কি আর আমার কাছে এসে মিথ্যে কথা বলবেন!’
‘আপনার অবাক লাগছে না?’
‘না, অবাক লাগবে কেন! পৃথিবীতে অবিশ্বাস্য কত কী আছে৷ সেগুলো কি মিথ্যে, বলুন?’
অমিয়স্যার থতমত খেয়ে চুপ করে রইলেন৷ মোহনলালবাবু নিশ্চয়ই ওঁদের সবাইকে পাগল ভাবছেন৷ মনস্তত্ত্ববিদরা যে-ঢঙে কথা বলেন উনি অনেকটা যেন সেই ঢঙে কথা বলছেন৷
‘দেওয়ালে সত্যবানবাবু ঠিক কেমন করে হাঁটছিল বল তো? এইরকম?’
ওরা অবাক হয়ে দেখল, হেডস্যার সিগারেটটা ঠোঁটে নিলেন৷ তারপর দু-হাত টান-টান করে পিছনের দেওয়ালের দিকে বাড়িয়ে দিলেন৷ হাতের পাতা দুটো চুম্বকের মতো দেওয়ালে সেঁটে গেল৷ তারপর ওঁর গোটা শরীরটা যেন বাতাসে ভেসে দেওয়ালে পৌঁছে গেল৷
ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগারেট ধরা অবস্থায় তিনি টিকটিকির মতো দেওয়ালে হাঁটতে লাগলেন৷ তারপর সিগারেটটা ডানহাতে নিয়ে ঘাড় কাত করে তাকালেন অচ্যুতদের দিকে৷ খিলখিল করে হেসে বারবার জিগ্যেস করতে লাগলেন, ‘দ্যাখ তো, এইরকম?’
অমিয়স্যার চেয়ারে কাত হয়ে পড়লেন৷ ওঁর মুখ দিয়ে গোঁ-গোঁ শব্দ বেরোতে লাগল৷
বাসব অচ্যুতকে ভয়ে জাপটে ধরল৷ ফটো দেখা আর সামনাসামনি দেখায় অনেক তফাত আছে৷
অচ্যুত অবাক হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু ভয় ততটা পায়নি৷ এই কসরত দেখে-দেখে ওর গা-সওয়া হয়ে গেছে৷ সত্যবানস্যারের কথাটা ওর মনে পড়ল : ‘…আমাদের হাত থেকে পালানো যায় না…৷’ ‘আমাদের’ মানে তা হলে হেডস্যার আর সত্যবানস্যার! ধানকলের মাঠে কুলদীপের বন্ধুরা নিশ্চয়ই স্যাটাস্যাটের সঙ্গে হেডস্যারকেই দেখেছিল! আর তারপরই জোড়া খুন!
