রাত বারোটার পর কুলদীপ অচ্যুতকে ফোন করে খবর দিল, রাজীব মারা গেছে৷
অচ্যুত ভেবেছিল, এইবার বুঝি সত্যবানস্যারকে নিয়ে পুলিশ টানাটানি করবে, হাজাররকম জিজ্ঞাসাবাদ করবে৷ কিন্তু তার কিছুই হল না৷
কারণ, রাজীবের মৃতদেহ পাওয়া গেল স্যারের কোচিং থেকে অন্তত বিশ হাত দূরে আগাছার ঝোপের ভেতরে৷ ফলে পুলিশের কাছে সমস্যাটা ধানকলের মাঠের জোড়া খুনের মতোই দাঁড়াল৷
এলাকায় খবরটা খুব তাড়াতাড়ি চাউর হয়ে গিয়েছিল৷ স্কুলে গিয়ে অচ্যুত শুনল ক্লাস হবে না৷ রাজীবের জন্য শোকপালন করে স্কুল ছুটি দিয়ে দেওয়া হবে৷
শোকসভায় দাঁড়িয়ে রাজীবের জন্য নীরবতা পালন করার সময় অচ্যুতের চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল৷ একইসঙ্গে ভীষণ রাগ হল ওর৷ ওরা এতজন বন্ধু মিলে শেষ পর্যন্ত রাজীবকে ধরে রাখতে পারল না!
শোকপালন শেষ হলে অচ্যুত, কুলদীপ, বাসবরা জোট পাকাল৷
অচ্যুত গতকালের ঘটনাটা ওদের খুলে বলল৷
কুলদীপ জিগ্যেস করল, ‘রাজীবের বডিটা কোচিং-এর বাইরে গেল কী করে?’
‘হয়তো স্যারই ওটা বাইরে আগাছার ঝোপের মধ্যে ফেলে এসেছেন৷’
কুলদীপ শিস দিয়ে উঠল৷
বাসব অচ্যুতকে বলল, ‘এইবার পুলিশ তোকে হ্যারাস করবে৷’
‘সে করে করুক—যা সত্যি তাই বলব৷’
‘আমার মনে হয়, ব্যাপারটা এবার স্যারদের জানানো উচিত৷’
প্রতীক আর সৌরভও বাসবের কথায় সায় দিল৷
অনেক তর্কবিতর্কের পর ঠিক হল ওরা অমিয়স্যারকে পুরো ব্যাপারটা জানাবে৷
স্কুলের ভিড় ফিকে হয়ে এসেছিল৷ স্যাররাও অনেকে বাড়ি চলে যাচ্ছেন৷ হঠাৎই বাসবের নজরে পড়ল, একতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে অমিয়স্যার দুজন ছাত্রের সঙ্গে কথা বলছেন৷
বাসব বলল, ‘চল, এখনই যাই—স্যারকে গিয়ে বলি৷’
অচ্যুত আর প্রতীক ইতস্তত করছিল৷ কিন্তু কুলদীপও যেন খেপে গেল : ‘আর দেরি করলে হবে না, অচ্যুত৷ রাজীব গেছে, এরপর কার পালা কে জানে! যা করার এখনই করতে হবে৷ চল—৷’
ওরা পাঁচজন অমিয়স্যারের কাছে গিয়ে দাঁড়াল৷
স্যার ওদের দিকে একবার জিজ্ঞাসার চোখে তাকিয়ে অন্য দুজন ছাত্রকে ছেড়ে দিলেন৷
‘কী ব্যাপার রে! রাজীবের জন্যে দুঃখ হয়৷ কী অরুন্তুদ ঘটনা বল তো!’ হাতের একটা ভঙ্গি করে মাথায় চুল ঠিক করলেন অমিয়স্যার৷
‘স্যার, রাজীবের ব্যাপারেই কয়েকটা কথা আমরা আপনাকে বলতে চাই৷’ মনিটর বাসব বলল৷
‘তার মানে!’ অমিয়স্যারের ভুরু কুঁচকে গেল৷
‘হ্যাঁ, স্যার৷’ অচ্যুতের দিকে আঙুল তুলে দেখাল বাসব : ‘ও আপনাকে সব বলবে৷ আপনাকে যে-করে-হোক একটা ব্যবস্থা করতেই হবে৷ নইলে আমাদের স্কুল ছারখার হয়ে যাবে৷’
‘বলিস কী রে! আমাদের স্কুল অবনমিত হয়ে যাবে!’
‘হ্যাঁ, স্যার—ভীষণ বিপদে পড়ে আপনাকে এসব কথা বলছি৷ প্লিজ, ওই জামগাছটার তলায় চলুন৷’ অচ্যুত অনুনয় করে বলল৷
অমিয়স্যার বেশ হকচকিয়ে গেলেন৷ কিন্তু পাঁচটা নিষ্পাপ মুখের আকাঙ্ক্ষায় তিনি জল ঢেলে দিতে পারলেন না৷ আলতো করে বললেন, ‘চল…৷’
আকাশ ঘোলাটে৷ বৃষ্টি হবে কি হবে না বোঝা যাচ্ছে না৷ কোথা থেকে যেন বুলবুলির ডাক ভেসে আসছিল৷ একটু দূরে ইলেকট্রিকের তারে একটা বাঁশপাতি পাখি পোকার আশায় বসে আছে৷ দুটো ছোট মাপের হলদে প্রজাপতি স্কুলের মাঠের ওপর দিয়ে এলোমেলোভাবে উড়ে যাচ্ছে৷
অচ্যুত ভাবছিল, প্রকৃতি আমাদের সুখ-দুঃখের কোনও খবর রাখে না৷ তাই এরকম বিপদের সময়েও উদাসীন হয়ে সেজেগুজে বসে আছে৷
ভিজে স্যাঁতসেঁতে ঘাসের ওপরে পা ফেলে ওরা সবাই জামগাছ-তলার বেদির কাছে গেল৷ স্যারকে বসিয়ে শুরু করল ওদের রোমাঞ্চকর কাহিনি৷
মনোযোগী ছাত্রের মতো অমিয়স্যার গোটা গল্পটা শুনলেন৷ তারপর ‘হুম’ শব্দ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন৷
‘সবাই বলবে, এ তোদের খপুষ্প কল্পনা৷ কোনও প্রমাণ কি তোদের কাছে আছে?’
এ-কথা বলামাত্রই তিনটে হাত ছিটকে এল অমিয়স্যারের চোখের সামনে৷ তিনটে হাতে ধরা রয়েছে তিনটে রঙিন ফটোগ্রাফ৷ সত্যবানস্যার দেওয়ালে হেঁটে বেড়াচ্ছেন৷
অমিয়স্যার অনেকক্ষণ কোনও কথা বলতে পারলেন না৷ তারপর ধীরে-ধীরে উচচারণ করলেন, ‘তোরা আজকালকার ছেলে—ভূত-প্রেত-পিশাচে তোদের তেমন বিশ্বাস নেই৷ এখন বুঝতে পারছিস তো, বিজ্ঞানটাই সব নয়, যুক্তি-প্রযুক্তিই সব নয়! তার বাইরেও একটা রহস্যময় অন্ধকার জগৎ আছে৷ তোদের কাছে যা শুনলাম তাতে…৷’ কিছুক্ষণ যেন চিন্তা করলেন অমিয়স্যার৷ তারপর : ‘মনে হয়…একমাত্র বীতিহোত্র ছাড়া এ-পিশাচকে ধ্বংস করা সম্ভব নয়৷’
‘বীতিহোত্র! সেটা কি কোনও ফলের বীজ বা গাছের শিকড়?’ ভাবল অচ্যুত৷
কুলদীপ জিগ্যেস করল, ‘বীতিহোত্র কী, স্যার…কোনও মন্ত্র?’
অমিয়স্যার মোলায়েম হেসে কুলদীপের দিকে তাকালেন : ‘ওঃ, বীতিহোত্র জানিস না! বীতিহোত্র মানে আগুন!’
ওরা পাঁচজন লম্বা করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল৷ বাব্বাঃ, স্যার পারেনও বটে!
অচ্যুত বলল, ‘স্যার, আমার বাপিও তাই বলছিল…৷’
অমিয়স্যার সামান্য ঘাড় দোলালেন৷ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে তারপর বললেন, ‘ব্যাপারটা স্কুলকে জড়িয়ে৷ আমার মনে হয়, ব্যাপারটা আগে পুরকায়স্থবাবুকে জানানো দরকার৷ তোরা আমার সঙ্গে চল, ওঁকে এখনই গিয়ে এইসব সান্নিপাতিক ঘটনাবলির কথা খুলে বলি৷’
ওরা স্যারের সঙ্গে স্কুল-বাড়ির দিকে হাঁটা দিচ্ছিল, দেখল সত্যবানস্যার হাসিমুখে ওদেরই দিকে এগিয়ে আসছেন৷
