একটু পরে ও মউলিকে বলল, ‘দ্যাখো তো, লোকটা চলে গেছে কি না৷’
মউলি আবার বারান্দায় গেল৷
মিনিটপাঁচেক পর ও ফিরে এল, বলল, ‘চলে গেছে৷ তবে কাকিমা এখনও দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন৷’
‘আমি তা হলে এখন যাই৷ মা নিশ্চয়ই খুব চিন্তা করছে৷’
‘তুমি আমাদের বাড়িতে আজ প্রথম এলে৷ চা-টা কিছুই…৷’
‘এটা আবার আসা না কি!’ হেসে বলল অচ্যুত, ‘এটা তো একটা অ্যাক্সিডেন্ট৷’
‘অ্যাক্সিডেন্ট?’ তারপর নীচু গলায় সেই পুরোনো কথাটাই বলল মউলি, ‘মাঝে-মাঝে এরকম অ্যাক্সিডেন্ট হলে বেশ হয়…৷’
‘আজ আসি৷ তুমি আমাদের বাড়িতে একদিন এসো৷’
অচ্যুত চলে যাচ্ছিল৷ মউলি ওকে পিছন থেকে জিগ্যেস করল, ‘তোমাদের ওই অঙ্কস্যার তোমাকে তাড়া করছিল কেন বললে না তো? অঙ্ক পারোনি?’
পিছন ফিরে তাকাল অচ্যুত, হাসল : ‘হ্যাঁ, খুব কমপ্লিকেটেড অঙ্ক৷ পরে সব বলব৷ অনেক সময় লাগবে৷’
অনেকটা জেদি ভঙ্গিতে মউলি অচ্যুতের কাছে এগিয়ে এল৷ খপ করে ওর হাত চেপে ধরল৷ তারপর বেশ চাপা গলায় বলল, ‘তুমি খুব ভয় পেয়ে গেছ৷ সেদিন রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম…দেখলাম, তুমি সাইকেল নিয়ে কোথায় বেরোলে…বেশ রাত করে ফিরলে৷ তারপর…তারপর…আজকে এইরকম…কী হয়েছে, অচ্যুত?’
অচ্যুত অবাক হয়ে মউলির মুখের দিকে তাকাল৷ ওর মুখে নিজের নামটা এই প্রথম শুনল…শুনে খারাপ লাগল না৷ সত্যি, এই মুহূর্তে মউলিকে সব বলতে পারলে খুব ভালো লাগত৷ ওর চোখে কী সাংঘাতিক আত্মবিশ্বাসের ছাপ! কী আশ্বাসে ভরা ওর দৃষ্টি!
অচ্যুত দোটানায় দুলছিল৷ মউলিকে সবকিছু খুলে বলবে? এখনই?
‘আমাকে তুমি সব বলবে না?’ মউলির গলায় একইসঙ্গে শাসন আর অভিমানের ছোঁওয়া৷
‘বলব৷ সত্যি বলছি, বলব৷ আজ নয়৷ এখন অনেক রাত হয়ে গেছে৷ মা চিন্তা করছে৷…আসি৷’ বলে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল অচ্যুত৷
তরতর করে সিঁড়ি নামার সময় চেঁচিয়ে বলল, ‘কাকিমা, আমি যাচ্ছি—৷’
ওর মনে হল, মউলির ডিয়োডোর্যান্টের গন্ধটা ওর সঙ্গে যেন সদর দরজা পর্যন্ত এল৷
দরজা খুলে বাইরে বেরোতেই বলতে গেলে মায়ের মুখোমুখি৷
অচ্যুতকে দেখামাত্রই মায়ের চোখে জল এসে গেল৷ অভিমানভরা চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে মা বলল, ‘কোথায় ছিলি তুই? আমি…৷’ আর বলতে পারল না…গলা ভেঙে গেল৷
‘ভেতরে চলো, সব বলছি—৷’
সাইকেলটা রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে মায়ের সঙ্গে বাড়ির ভেতরে ঢুকল অচ্যুত৷ রাজীবের কথা ভেবে ও শিউরে উঠল৷
রাজীব বোধহয় আর…৷
রাজীবের কথাগুলো ওর মনে পড়ল, ‘তোরা শেষ পর্যন্ত আমাকে ধরে রাখতে পারবি তো?’
ঘরে এসে হাত-মুখ ধুয়ে গুছিয়ে বসতে-না-বসতেই মা আর বাপি এসে হাজির৷
মা বলল, ‘তলে-তলে তুই কী করছিস বল তো? আজ তোকে সব খুলে বলতেই হবে৷’
বাপি কাচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে৷ নিশ্চয়ই ও-ঘরে বসে টিভি দেখছিল, মা জেদ করে ডেকে এনেছে৷ ছেলেকে শাসন করে না বলে দু-চার কথা হয়তো বাপিকে শুনিয়েও দিয়েছে৷
আমতা-আমতা করে বাপি বলল, ‘শেষকালে আবার কী-না-কী বিপদে পড়বি…৷’
অচ্যুত হাত নেড়ে বলল, ‘সব বলছি৷ শুধু তার আগে রাজীবের বাড়িতে একটা ফোন করতে দাও—৷’
অচ্যুতের কথায় কী যেন ছিল, মা-বাপি ওকে বাধা দিল না৷ ও রাজীবের বাড়িতে ফোন করে বলল, ‘অঙ্কস্যারের কোচিং-এ গিয়ে রাজীব বিপদে পড়েছে৷’
রাজীবের মাম্মি খবরটা শুনেই কান্নাকাটি শুরু করে দিলেন৷ অচ্যুতকে হাজারটা প্রশ্ন করতে লাগলেন৷
অচ্যুত দিশেহারাভাবে বলল, ‘অ্যান্টি, আমি এর বেশি কিচ্ছু জানি না৷ আপনি শিগগিরই পুলিশে খবর দিন! দেরি করবেন না…এক্ষুনি…কে জানে, এখনও হয়তো সময় আছে!’
ফোন নামিয়ে রেখে কিছুক্ষণ হাঁফ ছাড়ল অচ্যুত৷ লক্ষ করল, মা-বাপি ওর দিকে এমন করে তাকিয়ে আছে যেন ও ভিনগ্রহের প্রাণী৷
একটু পরে আবার রিসিভার তুলল ও৷ একে-একে প্রতীক, সৌরভ আর কুলদীপকে খবর দিতে চাইল৷ সৌরভ আর কুলদীপকে বাড়িতে পেল না—তবে প্রতীক বাড়িতে ছিল৷ ওকে সংক্ষেপে রাজীবের বিপদের কথা জানাল অচ্যুত৷ বলল, ‘কাল স্কুলে জরুরি মিটিং করতে হবে৷’
ফোনের পালা শেষ হলে ও মা-কে বলল, ‘খুব খিদে পেয়েছে৷ খেতে দাও৷ খেতে-খেতে ব্যাপারটা বলছি…৷’
মা আর বাপি অবাক হয়ে অচ্যুতের কাছে গোটা গল্পটা শুনল৷
শুনে মায়ের মুখ ভয়ে বদলে গেল৷
বাপি বলল, ‘হাতে-পায়ে ফেভিকল লাগিয়ে তোর অঙ্কস্যার দেওয়ালে হেঁটে বেড়ায়নি তো! টিভিতে ফেভিকলের যেরকম বিজ্ঞাপন দেখায়!’
এত সমস্যার মধ্যেও অচ্যুত হেসে ফেলল৷ বলল, ‘না, একেবারে জেনুইন ম্যাজিক৷’
তারপর ফটোগ্রাফটা বের করে মা আর বাপিকে দেখাল৷
বাপিকে তার জায়গা থেকে নড়ানো মুশকিল৷ কারণ, ফটোটা অনেকক্ষণ ধরে খুঁটিয়ে দেখার পর বাপি বলল, ‘তুই ঠিক জানিস, তোদের স্যারের ব্লাড ব্যাঙ্ক টাইপের কোনও সাইড বিজনেস নেই!’
অচ্যুত মাথা নেড়ে ‘না’ বলল৷
‘এখন কী করবি?’ মা ভয়-পাওয়া গলায় জিগ্যেস করল৷
‘এই টাইপের ব্লাডসাকারদের আগুন ছাড়া খতম করা যায় না…৷’ বিড়বিড় করে বলল বাপি৷
মা বলল, ‘কাল থেকে তুই স্কুলে যাস না—৷’
‘কখখনও না!’ রুখে দাঁড়াল অচ্যুত : ‘এইজন্যেই তোমাদের কিছু বলতে নেই! ভুলে যেয়ো না, স্যার একা, আর আমরা অনেক! কাল স্কুলে গিয়ে ব্যাপারটা অন্য স্যারদেরও জানাব৷ রাজীবের যদি কিছু হয়…৷’
