বাড়িতে কেউ নেই, তারপরও অভ্যাসমতো চারপাশে চোখ বুলাল এমেলিয়া। এখনও মনে হচ্ছে কেউ ওকে গোপনে দেখছে। অথচ মিসেস বিশপকে দেখেছে সে চলে যেতে। মিসেস বিশপ চুপিচুপি আবার ফিরে আসেননি তো? সন্দেহমুক্ত হবার জন্য এমেলিয়া বার দুই নক করল ড্রইংরুমের দরজায়। কোনো সাড়া নেই। সাহস করে এবার সে দরজা খুলল, পা রাখল ভেতরে। খোলা জানালা দিয়ে সূর্যের আলো ঢুকছে, ঘরটা ঝকঝক করছে, এমেলিয়ার ভয় অনেকটাই কেটে গেল। দ্রুত পা চালাল সে ফায়ারপ্লেসের দিকে।
সিন্দুকে তালা মারা নেই। ডালা খুলতেই একটা চাবি চেখে পড়ল। স্বপ্নে দেখা সব ঘটনা বাস্তবে ঘটে যাচ্ছে। ইশ, ওই বন্ধ ঘরে যদি সত্যি টাকা থাকে, মনে মনে বলল এমেলিয়া, তাহলে টাকা নিয়ে এক্ষুণি কেটে পড়ব। স্বাধীন হয়ে যাব আমি। স্বাধীন এবং ধনী।
উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে দৌড় দিল এমেলিয়া প্যাসেজের শেষ মাথায়, বন্ধ ঘরের দিকে। দরজায় তালা মারা। চাবি ঢুকিয়ে মোচড় দিতেই খুলে গেল তালা, এমেলিয়ার চোখের সামনে উদ্ভাসিত হলো ঘরটা। ঘরের মাঝখানে, ওর স্বপ্নে দেখা পালঙ্কটা সত্যি আছে, এককোনায় একটা আয়রন সেফ। এ ছাড়া আসবাব বলতে খানকয়েক চেয়ার এবং আয়না। আয়নার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকাল এমেলিয়া। আয়না ওকে সবসময় অভিভূত করে তোলে। আয়নার সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে কোনো ক্লান্তি নেই ওর। কল্পনায় তো প্রায়ই ও নিজেকে মঞ্চের অভিনেত্রী ভাবে। ভাবে অনেক টাকা থাকলে দামি দামি ড্রেস কিনে, সাজগোজ করলে অভিনেত্রীদের চেয়ে কোনো অংশে খারাপ দেখাবে না ওকে। ঘরের এই আয়নাটার দিকে তাকিয়ে রইল এমেলিয়া। পালঙ্কের পরিষ্কার প্রতিচ্ছবি পড়েছে আয়নায়। এমেলিয়া দেখল সাদা চুল, সাদা গোঁফের এক বুড়ো শুয়ে আছে বিছানায়, ঘুমাচ্ছে।
হঠাৎ ফায়ারপ্লেসের পাশে, দেয়ালের সাথে লাগানো আলমারির দরজা ফাঁক হয়ে গেল, ওখান থেকে বেরিয়ে এলেন এক মহিলা। মিসেস বিশপ। তবে বিছানায় শোয়া বুড়োর মতো মিসেস বিশপেরও চারপাশে ধোয়াটে একটা পর্দা দেখা যাচ্ছে।
মহিলার পরনে নীল সিল্কের ড্রেসিং গাউন, তাতে বড় বড় মুক্তোর বোতাম, পায়ে উলের জুতো। এক হাতে সোনার বালা, অন্য হাতের আঙুলে অনেকগুলো ঝলমলে আংটি। এমেলিয়া লক্ষ করেছে মহিলা বিছানার দিকে, তারপর একটা বালিশ তুলে নিলেন হাতে। তিনি বালিশটা ঘুমন্ত বুড়োর মুখে চেপে ধরলেন সর্বশক্তি দিয়ে। ভয়ে চিৎকার করে উঠল এমেলিয়া, ঝট করে ঘুরে দাঁড়াল। বিছানা খালি, ঘরও তাই। সে সম্পূর্ণ একা।
এত ভয় পেয়েছে এমেলিয়া যে সামলে উঠতে সময় লাগল। বুঝতে পারল আয়নায় ভৌতিক যে দৃশ্যটা দেখেছে বাস্তবে তাই ঘটেছে। ওই বুড়ো আর কেউ নন, মি. বিশপ স্বয়ং। মিসেস বিশপ তার স্বামীকে খুন করেছেন। হয়তো স্বামীর সাথে তিনি মানিয়ে নিতে পারছিলেন না বা টাকার লোভে, কোনো কারণেই হোক স্বামীকে মেরে ফেলেছেন মিসেস বিশপ। আসল ঘটনা কেউ জানে না। তিনি রটিয়ে দিয়েছেন মি. বিশপ বিদেশে মারা গেছেন। ভয়ঙ্কর সত্যটা উপলব্ধি করতে পেরে কিছুক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল এমেলিয়া। মিসেস বিশপ তাহলে খুনি! ওই বড় বড় নীল চোখের ঠান্ডা দৃষ্টি তার বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়।
এখন এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি কেটে পড়া যায় ততই মঙ্গল। কিন্তু টাকা না নিয়ে যাওয়া যাবে না। এমেলিয়া নিশ্চিত আয়রন সেফের মধ্যে টাকা আছে। সে সেফের হাতল ধরে টানাটানি শুরু করে দিল। কিন্তু খুলছে না সেফ। কোথাও গোপন বোতাম আছে কিনা ভেবে সেফের গায়ে হাত বোলাতে লাগল এমেলিয়া।
সত্যি আছে! বোতামটায় চাপ দিতেই খুলে গেল দরজা, ভেতরে তাকিয়ে হাঁ হয়ে গেল এমেলিয়া। সোনা! ড্রয়ারগুলো সোনার মুদ্রা, সোনার চুড়ি, আংটি, ব্রেসলেট আর নেকলেসে বোঝাই। মিসেস বিশপ কেন এ ঘরটা সবসময় বন্ধ রাখেন সে রহস্য এবার জানা গেল। তিনি শুধু খুনি নন, চোরও। স্বামীকে খুন করে তার সমস্ত সোনাদানা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি।
এ ঘর সবসময় বন্ধ রাখেন যাতে কেউ জানতে না পারে এখানে কী আছে।
আমি এখান থেকে কিছু গহনা সরিয়ে ফেলব, বিড়বিড় করল এমেলিয়া। এগুলো পরলে নিশ্চয়ই আমাকে খুব সুন্দর দেখাবে।
উত্তেজনার চোটে ভয় চলে গেছে এমেলিয়া। সে দ্রুত কয়েকটা চুরি আর ব্রেসলেট পরে নিল হাতে, গলায় পরল নেকলেস। সোনার গহনায় নিজেকে রীতিমতো মুড়ে নিয়ে হাসিমুখে দাঁড়াল আয়নার সামনে। সাথে সাথে মুখ থেকে হাসি মুছে গেল, দৃষ্টিতে ফুটল নির্জলা আতঙ্ক। সে দেখতে পেয়েছে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকছেন রক্তমাংসের মিসেস বিশপ। তাঁর হাতে লম্বা এক টুকরো তার, মুখটা কঠিন, চাউনিটা শীতল এবং কুর। কিছুক্ষণ আগে অবিকল এই চেহারার ভৌতিক মিসেস বিশপকে দেখেছে সে আয়নায়।
বেশ, স্বভাবসুলভ ঠান্ডা, শান্ত গলায় চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন তিনি। অবশেষে ধরা পড়ে গেছিস তুই। আমার গোপন ব্যাপারগুলো দেখে ফেলেছিস। আমার গহনাও পরে আছিস দেখছি। এদিকে আয় হারামজাদী।
নীল চোখে কী সম্মোহনী জাদু আছে কে জানে, পায়ে পায়ে তাঁর দিকে এগিয়ে গেল এমেলিয়া। যেন সাপ সম্মোহন করে টেনে আনছে তার শিকারকে।
এমেলিয়ার শরীরের সমস্ত শক্তি কে যেন শুষে নিয়েছে, প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ করার ভাষা এবং শক্তিও হারিয়ে ফেলেছে, নিরবে সে তার মনিবনীর আদেশ পালন করল। সামনে এসে দাঁড়াল মিসেস বিশপের।
