মিসেস বিশপ সম্পর্কে বলতে গেলে কিছুই জানে না এমেলিয়া। তাই দুধঅলা বা হকারের কাছে তাঁর সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়ার চেষ্টা করে। একদিন দুধঅলাকে সে প্রশ্ন করল, মিসেস বিশপের স্বামী কী করতেন জানো কিছু?
তরুণ এই দুধঅলাটি মনে মনে পছন্দ করে এমেলিয়াকে। প্রায়ই সে ফুল নিয়ে আসে মেয়েটির জন্য।
না, তেমন কিছু জানি না, জবাব দিল দুধঅলা। তবে শুনেছি ব্যবসা করতেন। দেশের বাইরে, ব্যবসার কাজে গিয়ে নাকি মারা গেছেন তিনি। ফ্রান্সের কোথায় যেন। ভদ্রলোকের মাথাভর্তি সাদা চুল ছিল। মিসেস বিশপের বাবা বলে অনেকেই ভুল করত তাঁকে।
উনি স্বামীকে ভালোবাসতেন কিনা সন্দেহ আছে আমার, বলল এমেলিয়া। ভালোবাসার ব্যাপারটাই বোধহয় ভদ্রমহিলার মধ্যে নেই।
হেসে উঠল দুধঅলা। আজকালকার আধুনিক মেয়েরা তাদের স্বামীদের তেমন পাত্তা টাত্তা দিতে চায় না। মিসেস বিশপও হয়তো তাদের একজন। কেন, এখানে ভালো লাগছে না তোমার?
করুণ মুখ করে জবাব দিল এমেলিয়া, না। তবে বাইরের জগত এর চেয়েও খারাপ। তাই কোথাও যাবার সাহস পাই না।
তাহলে এখানেই থেকে যাও, পরামর্শের সুরে বলল দুধঅলা। অন্তত ভালো কোথাও চলে যাবার সুযোগ না পাওয়া পর্যন্ত।
এমেলিয়ার আসলেই কোথাও যাবার জায়গা নেই। টাকা থাকলেও সে হয় কেটে পড়ার ধান্ধা করত। কিন্তু মিসেস বিশপ ওকে এত কম বেতন দেন যে নিজের টুকিটাকি জিনিস কেনার পর হাতে প্রায় কিছুই থাকে না। তারপরও এমেলিয়া সুযোগের অপেক্ষায় আছে। হাতে কিছু টাকা এলেই এখান থেকে চলে যাবে। এমেলিয়ার বিশ্বাস, মিসেস বিশপ ওই বন্ধ ঘরে টাকাপয়সা রাখেন।
একদিন সে এক অদ্ভুত স্বপ্নও দেখে ফেলল ঘরটিকে নিয়ে। দেখল মিসেস বিশপ ড্রইংরুমের ফায়ারপ্লেসের ডানপাশে রাখা একটি সিন্দুক থেকে একজোড়া চাবি নিয়ে সটান ঢুকে পড়লেন সেই বন্ধ ঘরে। তার পিছু নিয়েছিল এমেলিয়া। কিন্তু সে ভেতরে যাবার আগেই দরজা বন্ধ করে দিলেন মিসেস বিশপ। দরজা বন্ধ হবার আগে সে শুধু দেখতে পেল ঘরের মাঝখানে বড় একটা পালঙ্ক। বাইরে দাঁড়িয়ে এমেলিয়া শুনতে পেল ভেতরে যা ভেবেছি তাই, বিড়বিড় করল এমেলিয়া। ও ঘরে টাকা লুকিয়ে রেখেছেন মিসেস বিশপ।
সে ভেতরের দৃশ্য দেখার জন্য চোখ রাখল কী হোলে। সাথে সাথে কী যেন গরম একটা ঢুকে গেল চোখে, ভয়ানক জ্বলতে লাগল। ব্যথাটা এত বাস্তব, ঘুম ভেঙে গেল এমেলিয়ার। এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছে বিশ্বাস হতে চাইছে না ওর। বন্ধ ঘরের রহস্য ভেদ করার আগ্রহ বেড়ে গেল কয়েক গুণ। ওখান থেকে কিছু টাকা যদি সরাতে পারি, নিজের মনে বলল এমেলিয়া, তাহলে সাথে সাথে এখান থেকে চলে যাব। লন্ডন বিরাট শহর। লুকোবার অনেক জায়গা আছে। পুলিশ খুঁজেও পাবে না। আর ধরা পড়লেই বা কী, এই নরকের চেয়ে জেলখানা নিশ্চয়ই খারাপ হবে না। সারাক্ষণ ওই মহিলার ধমকের ভয়ে সিঁটিয়ে থাকার চেয়ে জেলে যাওয়া অনেক ভালো।
স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটানোর চেষ্টা চালাল এমেলিয়া বারকয়েক। কিন্তু যতবার সাহস করে ড্রইংরুমের দিকে পা বাড়াল, ততবারই কোনো না কোনো বাধা পেল। একবার হলঘর থেকে সে ড্রইংরুমে ঢুকবে ভাবছে, হঠাৎ মনে হলো মিসেস বিশপ পিছু পিছু আসছেন ওর, ঘুরলেই তাঁর ঠান্ডা, নীল চোখ জোড়া দেখতে পাবে, কটমট করে তাকিয়ে আছেন ওর দিকে। আরেকবার মাঝরাতে সে চুপি চুপি নেমে এসেছে নিচে, পায়ের শব্দ পেল পেছনে। ঝট করে ঘুরল এমেলিয়া। নাহ্, কেউ নেই পেছনে। কিন্তু এত ভয় লেগে গেল, দৌড়ে সে ঢুকে গেল নিজের ঘরে, নিচতলায় নামার আর সাহসই পেল না। তবে দিনকয়েক পরে এমেলিয়ার বহুল প্রত্যাশার সুযোগটি এল।
আমি বেরুচ্ছি, এমেলিয়া, মিসেস বিশপ বললেন ওকে, ডিনারের আগে ফিরব না। কেউ ফোন করলে মেসেজ নিয়ে রাখবি।
নতুন কেনা কোট আর স্কার্ট পরে গটগট করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলেন তিনি। তাঁকে রাস্তার মোড় ঘুরতে দেখেই একদৌড়ে তাঁর বেডরুমে ঢুকল এমেলিয়া। নতুন হ্যাট কিনেছেন মিসেস বিশপ। দামি, পার্শিয়ান হ্যাট। কালো হ্যাটটা পরার খুব লোভ এমেলিয়ার। অবশেষে সুযোগ পাওয়া গেছে। সে হ্যাটটা মাথায় চাপিয়ে দাঁড়াল আয়নার সামনে। দেখতে মন্দ নয় এমেলিয়া, কালো হ্যাঁটে মানিয়েও গেছে, মিসেস বিশপের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দরী লাগল নিজেকে। হাসিমুখে এবার মিসেস বিশপের লাল কলারের নীল রঙের স্কার্টটা পরল ও। মনিবনীর চেয়ে হালকা পাতলা বলে পোশাকটা ঢিলে হলো গায়ে, তবে আয়নায় নিজের চেহারা দেখে রীতিমতো মুগ্ধ এমেলিয়া। ড্রেসিং টেবিলে থরে থরে সাজানো দামি সব লিপস্টিক আর নেইল পলিশ। ওগুলো ব্যবহার করার লোভ সামলাতে পারল না এমেলিয়া। মিসেস বিশপের ফরাসি হাই হিলও পায়ে গলাল। তারপর মুচকি হেসে আবার দাঁড়াল আয়নার সামনে। নিজেকে বারবার দেখেও আশ মেটে না এমেলিয়ার।
এখন এমেলিয়াকে দেখলে কে বলবে ও বাড়ির চাকরানি! মনিবনীর চেয়ে শতগুণ সুন্দর লাগছে ওকে। আয়নায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিজেকে দেখছে এমেলিয়া, এমন সময় বেজে উঠল ফোন। আতঙ্কিত হয়ে উঠল এমেলিয়া। একটানে হ্যাটটা ছুঁড়ে ফেলে, পাগলের মতো জামাকাপড় খুলতে লাগল। ওদিকে ফোন বেজেই চলেছে।
এমেলিয়া আধা নগ্ন অবস্থায় গিয়ে ফোন ধরল। ম্যাসেজ রাখার পর শান্ত হলো ও। তারপর আস্তে ধীরে পোশাকগুলো ভাঁজ করে আগের জায়গায় পরিপাটি অবস্থায় রেখে দিল। ওর বুক এখনও ঢিপঢিপ করছে। এমেলিয়া ঠিক করল এখনই সে ড্রইংরুমে অভিযান চালাবে।
