হাঁটু গেড়ে বোস, আদেশ করলেন মিসেস বিশপ।
এমেলিয়া হাঁটু গেড়ে বসল, তার চোখ স্থির হয়ে আছে মিসেস বিশপের ধবধবে সাদা হাত আর টকটকে লাল ড্রেসের ওপর। সাবধানে দরজা বন্ধ করলেন মিসেস বিশপ, তারপর ঘুরে দাঁড়ালেন, হাতের তারটা দেখালেন এমেলিয়াকে।
চিনিস এটা কী? জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
মাথা নাড়ল এমেলিয়া, কথা বলতে চাইল, কিন্তু গলা শুকিয়ে কাঠ, একটা শব্দও বেরুল না। এটা তোর গলায় বাঁধব আমি, বলে চললেন। মিসেস বিশপ, যত্নের সাথে এমেলিয়ার ঘাড় এবং গলায় জড়ালেন তারটা। তোর বাবা-মা নেই, বন্ধুবান্ধব নেই, নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেও কেউ তোর খোঁজ নিতে আসবে না। কাজেই… লম্বা, সরু, সাদা আঙুল দিয়ে তিনি ফাঁসটাকে শক্ত করে টানতে লাগলেন…
–এলিয়ট ও ডোনেল
মুণ্ডহীন প্রেত
এক
ভৌতিক এ কাহিনির পটভূমি আজ থেকে প্রায় দেড়শো বছর আগে, আমেরিকার হাডসন নদীর তীরে এক প্রত্যন্ত গ্রামে। গ্রামটির নাম স্লিপি হলো। যে সময়ের কথা বলছি তখন উনিশ শতকের মধ্যভাগ, কয়েক বছর আগে আমেরিকায় গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটেছে। যুদ্ধে অংশ নেয়া কয়েকজন সৈনিক প্রাণের দায়ে পালিয়ে এসে স্লিপি হলোতে আশ্রয় নিয়েছিল।
এ গাঁয়ের প্রায় সকলেই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। ওই সময়ে অবস্থাপন্ন কৃষকরা তাদের বাগানে আপেল চাষও করতেন। গ্রামে একটি স্কুল আছে। আছে চমৎকার একটি গির্জা। এ গির্জাটির একটি ইতিহাস রয়েছে। শোনা যায়, তিনশ বছর আগে গির্জাটি তৈরি করে এক কুখ্যাত ডাচ জলদস্যু গনজালেস। এ গির্জায় প্রতি রোববার গাঁয়ের খ্রিষ্টান সম্প্রদায় প্রার্থনা করতে যায়, সেখানে নবীন গায়কদের ছোট একটি দল নিয়ে প্রার্থনা সংগীত পরিবেশনা করে গাঁয়ের লজিং মাস্টার রাফায়েল হেরন। তবে তার কথা এখন নয়, পরে।
স্লিপিহলোতে শীতকালে যখন বেশ বৃষ্টি-বাদল হতো, ঝড় গোঁ গোঁ করে গোঙাত, এসব রহস্যময় রাতগুলোতে এ গাঁয়ের লোকেরা চুলোর আগুনের সামনে জড়ো হয়ে গল্প করত এক রহস্যময় ব্যক্তিকে নিয়ে। তাকে আশেপাশের অনেকেই নাকি ঘোড়ার পিঠে চড়ে বেড়াতে দেখেছে।
লোকটা এক অশ্বারোহী হোসিয়ান সৈনিক, বলল একজন।
যুদ্ধে মাথা হারিয়েছে সে। কামানের গোলায় উড়ে গেছে মুন্ডু,
লোকটা আসলে ভূত, শিউরে ওঠে আরেকজন। এ গাঁয়ের ভূতেদের রাজা।
লোকটা আসলে কে বা কী জানে না কেউ। যদিও মধ্যরাতে চাষাভুষোদের অনেকেই দেখেছে কালো রঙের মস্ত একটা ঘোড়ার পিঠে চেপে বিশালদেহী ভয়ংকর একটি মূর্তি নিস্তবদ্ধতা ভেঙে খটখটিয়ে চলেছে গাঁয়ের একমাত্র : পাকা রাস্তা দিয়ে।
লোকটার মুন্ডুহীন ধড় কবর দেয়া হয়েছে গির্জায়, জানায় একজন সে এসব খবর ভালোই রাখে। রাতের বেলা বেরিয়ে পড়ে যুদ্ধক্ষেত্রের উদ্দেশ্যে। সে ভাবে এখানেই যুদ্ধ হয়েছিল। মাথামোটা আর কাকে বলে। যুদ্ধক্ষেত্রে যায় নিজের কাটা মুণ্ডুর খোঁজে। ভোর রাতে রাস্তায় বেরুলে দেখবে ঘোড়সওয়ার তীরবেগে ছুটে চলেছে। সকাল হওয়ার আগেই তাকে ফিরে যেতে হয় কবরে।
ভুতুড়ে ঘোড়সওয়ার নিয়ে এসব গল্প মনোযোগ দিয়ে শুনছিল রাফায়েল হেরন। সে এ গাঁয়ের স্কুলে মাষ্টারি করে। ভূত-প্রেতে তার প্রবল আগ্রহ। এ বিষয়ে পড়াশোনাও আছে প্রচুর।
বক পাখির সাথে রাফায়েল হেরনের চেহারার বেশ একটা মিল আছে। এ জন্যেই বোধ করি তার পদবি হেরন। সে খুব লম্বা, রোগা, টিংটিঙে হাতে-পা, হাত জোড়া হাঁটু ছাড়িয়েছে, চওড়া পায়ের পাতা কোদালের মতো। হাড্ডিসার লম্বা ঘাড়টার ওপরে বসানো ছোট একটি মাথা। হেরনের কান দুটো বিরাট, নাকটা এমনই লম্বা এবং খাড়া, খাম্বার কথা মনে করিয়ে দেয়। কেউ কেউ ঠাট্টা করে বলে রাফায়েলকে দেখলে নাকি শস্য ক্ষেতের কাকতাড়ুয়ার কথা মনে পড়ে যায়।
স্লিপিহলোকে বলা হয় এ অঞ্চলের সবচেয়ে শান্তিময় জায়গা। নদীর তীরে এটি একটি ছবির মতো গ্রাম। নদীর ধারে জঙ্গল আছে, এদিক সেদিক ছড়ানো ছিটানো পাহাড়সদৃশ টিলাও রয়েছে। এমন নির্জন, সুনসান আর স্বপ্নময় এলাকা খুব কমই চোখে পড়ে। কারো কারো ধারণা, এক ডাচ ডাক্তার, সে ডাকিনি চর্চা করত, অনেক দিন আগে এখানে নাকি জাদু করে গেছে। আবার কারও মতে, এক রেড ইন্ডিয়ান ওঝা জাদু করেছে এখানে।
এটা একটা ভূতুড়ে জায়গা, এক রাতে রাফায়েল হেরনকে ফিসফিস করে বলল বুড়ো এক চাষা। এ অঞ্চলে অগণিত উল্কাপাতের ঘটনা ঘটে, তারা খসে পড়ে। এদিকে দুঃস্বপ্নকে হার মানানো এমন সব ঘটনা আছে যা রাতের ঘুম হারাম করার জন্য যথেষ্ট।
দিনের বেলা অবশ্য ভূত-প্রেত নিয়ে ভাবার অবকাশ নেই হেরনের। সে তখন তার স্কুল নিয়ে ব্যস্ত। তার স্কুলে একটি মাত্র ঘর। স্কুল ঘরের পাশ দিয়ে যাবার সময় শোনা যায় ছাত্ররা উঁচু গলায় ABCD পড়ছে। আবার কখনো শপাং শপাং ঘা মারার শব্দ ভেসে আসে। শিক্ষক তার অবাধ্য, ছাত্রকে ধরে পিটাচ্ছে।
তবে হেরন একান্ত বাধ্য না হলে ছাত্র পেটায় না। ছাত্র যদি বেজায় দুর্বল হয় আর শিক্ষকের হাতের বেত দেখে ভয়ে কেঁদে ওঠে ভ্যা করে, মন নরম হয়ে যায় তার। ছাত্রকে চোখ রাঙিয়ে, দুএকটা কড়া কথা শুনিয়ে ছেড়ে দেয়। তবে পাজির পা ঝাড়া দুএকটা ছাত্রকে ধরে পেটাতেই হয়। বেত মারার পরে হেরন যুক্তি দেখায় প্রহার করা হয়েছে ছাত্রের মঙ্গলের জন্যেই।
