ম্যালকমসনের মনে হচ্ছিল সে ফাঁদে পড়েছে। কী করবে চিন্তা করার চেষ্টা করল। বিচারকের চোখে কীরকম যেন আর্কষণ আছে, চলৎশক্তি রহিত করে দেয়। সে একবারের জন্যও বিচারকের চোখ থেকে নিজের চোখ সরাতে পারেনি। যেন বাধ্য হয়েই তাকিয়ে থেকেছে।
বিচারককে এগিয়ে আসতে দেখল ম্যালকমসন। হাতে দড়ির ফাঁস। তিনি রঙ্কুটি ছুঁড়ে দিলেন ওকে লক্ষ্য করে যেন গলায় ফাঁস পরাবেন। বহু কষ্টে এক দিকে ঝট করে সরে গেল ম্যালকমসন। রশিটি গিয়ে পড়ল ওর পাশে। আবার রশি তুলে নিয়ে ওকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করলেন বিচারক। তাঁর হিংস্র, কুটিল চোখ স্থির হয়ে আছে ম্যালকমসনের চোখে। প্রতিবারই বিপুল চেষ্টায় দড়ির ফাঁদ এড়িয়ে গেল তরুণ ছাত্রটি।
এরকম চলল বহুক্ষণ। বারবার ব্যর্থ হলেও বিচারককে হতোদ্যম লাগল । তিনি যেন ইঁদুর-বেড়াল খেলায় সামিল হয়েছেন। অবশেষে দারুণ হতাশায়, ঘটনা যখন ক্লাইমেক্সে পৌঁছেছে, ম্যালকমসন চট করে একবার চারপাশে নজর বুলিয়ে নিল।
বাতিটি জ্বলছে। ঘরও বেশ আলোকিত। দেয়ালের কাঠের আচ্ছাদনের অসংখ্য ফাঁকফোকড় দিয়ে উঁকি মারছে ইঁদুরগুলো। ইঁদুরগুলোকে দেখে যেন একটু স্বস্তি পেল ম্যালকমসন। অ্যালার্ম বেলের খণ্ডিত রশিতে চোখ পড়তেই দেখল ওটা ভর্তি হয়ে আছে রাশি রাশি ইঁদুরে। রশির এক ইঞ্চি জায়গা খালি নেই। ঢেকে ফেলেছে ইঁদুরের দল। সিলিং থেকে পিলপিল করে আরও উঁদুর বেরিয়ে আসছে। ওগুলোর ভারে ঘণ্টাটি দুলতে শুরু করল।
ঘণ্টার সঙ্গে যুক্ত দোলকটি দুলতে দুলতে ঘণ্টা স্পর্শ করল। ছোট্ট একটি শব্দ তুলল। তবে ঘণ্টা মাত্র দুলতে শুরু করেছে। ওটার শব্দ আরও বাড়বে।
ঘণ্টার শব্দে বিচারক, যিনি এতক্ষণ ম্যালকমসনের দিকে নজর রাখছিলেন, মুখ তুলে চাইলেন। তাঁর মুখে ক্রোধ ফুটল। ঘেত জাতীয় একটা আওয়াজ করলেন। তাঁর চোখ জোড়া জ্বলন্ত কয়লার মতো ধকধক করে জ্বলছে। তিনি এত জোরে পদাঘাত করলেন মেঝেতে, গোটা বাড়ি যেন কেঁপে উঠল।
বিকট শব্দে বাজ পড়ল। বিচারক রশিটি আবারও হাতে নিলেন। ইঁদুরগুলো রশি বেয়ে ওপর নিচ করছে। এবারে রঞ্জু না ছুঁড়ে শিকারের দিকে এগিয়ে গেলেন বিচারক। হাত বাড়িয়ে রেখেছেন ফাস। তিনি এগিয়ে আসছেন, তাঁর উপস্থিতির মধ্যে যেন মানুষকে অবশ করে ফেলার একটা শক্তি রয়েছে। ম্যালকমসন স্রেফ একটা লাশের মতো দাঁড়িয়ে আছে। বিচারকের বরফ শীতল আঙুলের স্পর্শ পেল সে গলায় যখন তিনি ওর ফাঁস পরিয়ে দিলেন। ফাঁসটি ক্রমে শক্ত হয়ে ম্যালকমসনের গলায় চেপে বসতে লাগল।
বিচারক আড়ষ্ট হয়ে থাকা তরুণ ছাত্রটিকে কাঁধে তুলে নিলেন। এগোলেন ওক কাঠের চেয়ারটির দিকে। সেখানে ওকে কাঁধ থেকে নামিয়ে দাঁড় করিয়ে দিলেন। তারপর নিজে ওর পাশে দাঁড়ালেন। হাত বাড়িয়ে অ্যালার্ম বেলের ঝুলতে থাকা রশির মাথাটি ধরলেন। তাঁকে হাত তুলতে দেখে ইঁদুরের দল কিচমিচ করে পালিয়ে গেল। সিলিংয়ের গর্তে সেঁধুল। বিচারক ম্যালকমসনের গলায় পরানো ফাঁসের রজ্জ্বর শেষ মাথা বেঁধে দিলেন ঘণ্টার সঙ্গে বাঁধা দড়ির সঙ্গে। তারপর চেয়ার থেকে নেমে গেলেন তিনি। বিচারকের বাড়িতে ঘণ্টা বাজার শব্দে শীঘ্রি লোকজন এসে ভিড় করল। তারা মশাল এবং আলো নিয়ে এসেছে। দরজায় জোরে জোরে ধাক্কাতে থাকল। কিন্তু কোনো সাড়া মিলল না। দরজা ভেঙে ঢুকল তারা, সবেগে প্রবেশ করল প্রকাণ্ড ডাইনিংরুমে, সবার আগে আছেন ডাক্তার থর্নহিল।
ওখানে, বিশাল অ্যালার্ম বেলের রশির শেষ মাথায় গলায় ফাঁস নিয়ে ঝুলছে তরুণ ছাত্রটি। এবং দেয়ালে ঝোলানো বিচারকের ছবির মুখে ফুটে আছে অশুভ হাসি।
–ব্রাম স্টোকার
বন্ধ ঘরের রহস্য
বলসোভার স্কোয়ারের ১০৯ নম্বর বাড়ির নিচতলার প্যাসেজের শেষ মাথার ঘরটা সবসময় বন্ধ থাকে কেন? জানার খুব ইচ্ছা এমেলিয়া জেঙ্কিনসের। তবে বন্ধ ঘরের রহস্য জানার সৌভাগ্য হয়তো কোনোদিনই হবে না। কারণ ওর মনিব, মিসেস বিশপ এমন বদমেজাজী মহিলা, এমেলিয়ার কৌতূহলের কথা ঘুণাক্ষরেও টের পেয়ে গেলে ওকে পিটিয়েই মেরে ফেলবেন।
দিন কয়েক আগে এমেলিয়া চুরি করে স্ট্রবেরি জ্যাম খেতে গিয়েছিল, ধরা পড়ে যায় ও। মিসেস বিশপ শুধু ঠান্ডা চোখে ওর দিকে তাকিয়েছিলেন, তাতেই হার্টবিট বন্ধ হবার জোগাড় হয়েছিল এমেলিয়ার। কঠিন গলায়, চিবিয়ে চিবিয়ে তিনি সাবধান করে দিয়েছিলেন– এমেলিয়াকে ভবিষ্যতে কোনোদিন আর কিছু চুরি করে খেতে দেখলে মুখ ভেঙে দেবেন।
মহিলাকে যমের মতো ডরায় এমেলিয়া। ওর যাবার কোনো জায়গা নেই। নইলে ঠিক কোথায় চলে যেত। বাপ-মা মরা এতিম মেয়ে। পেকহ্যাম থেকে ওকে নিয়ে এসেছেন মিসেস বিশপ। বিধবা মহিলার বাড়িতে দিনভর খাটে। কিন্তু মহিলা ওর সাথে মোটেও ভালো ব্যবহার করেন না। মহিলার স্বামী মারা গেছেন কবে কে জানে, এখনও উঁটফাট কমেনি। সোনালি চুলগুলো সবসময় পরিপাটি আঁচড়ে রাখেন, কৃত্রিম আইল্যাশ পরেন চোখে। লম্বা, ম্যানিকিউর করা নখ নিয়ে তাঁর গর্বের সীমা নেই।
মিসেস বিশপকে ভয় পায় এমেলিয়া। তারপরও মহিলা বাইরে গেলে তার বেডরুমে ঢুকে সাজগোজের লোভ সামলাতে পারে না কিছুতেই। সাজ বলতে মিসেস বিশপের লাল রঙের একটা ফ্যান্সি ড্রেস পরা। ওটার হাড়ের তৈরি বোতামগুলো জ্বলজ্বল করে। দেখলেই বোঝা যায় খুব দামি। শার্টটা পরে আয়নার সামনে নিজেকে বারবার দেখে এমেলিয়া। তারপর আবার পোশাকটা খুলে, আগের মতো ভাঁজ করে রেখে দেয় ওয়ারড্রোবে।
