ওখানে, বিচারকের আসনে, পেছনে ঝুলছে রশি, বিচারপতির বিষ দৃষ্টি নিয়ে বসে আছে ইঁদুরটা, তার চেহারায় এখন উদগ্রতা এবং নিষ্ঠুর এক কদর্যতা। বাইরে বাতাসের মাতামাতি ছাড়া আর সব নিরব, নিস্তব্ধ।
বাতিটি ধাতব নির্মিত বলে ভাঙেনি, তেলও ছলকে পড়েনি মেঝেয়। ওটার গড়াগড়ির শব্দে যেন সম্বিত ফিরে পেল ম্যালকমসন। বাতিটি নিভিয়ে দিল ও। কপালের ঘাম মুছল। তারপর একটু চিন্তা করে আপন মনে বলল, এভাবে চলতে পারে না। এভাবে চললে আমি নির্ঘাত পাগল হয়ে যাব। আমি ডাক্তারকে কথা দিয়েছে চা খাব না। আমার স্নায়ুর ওপর নিশ্চয় অনেক চাপ পড়েছে যা খেয়াল করি নি। তবে আমি এখন ঠিক আছি। নির্বোধের মতো আর এমন ভয় পাব না।
সে ব্রান্ডির সঙ্গে পানি মিশিয়ে পান করল এবং মাথা ঠান্ডা করে পড়তে বসল।
প্রায় ঘণ্টাখানেক বাদে, আকস্মিক নিরবতায় অস্বস্তি বোধ করে বই থেকে মুখ তুলে চাইল ম্যালকমসন। বাইরে হাউ মাউ শব্দে গজরাচ্ছে বাতাস, আগের চেয়েও জোরে ছাড়ছে হুংকার, সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে বৃষ্টি, শিলাখণ্ডের মতো আছড়ে পড়ছে জানালার কাছে। তবে চিমনি থেকে ভেসে আসা হাওয়ার প্রতিধ্বনি এবং মাঝে মধ্যে দুএক ফোঁটা বৃষ্টি গরম চিমনির গায়ে আছড়ে পড়ে হিশ শব্দ তোলা ছাড়া ঘরের ভেতরে আর কিছুর শব্দ নেই। আগুনের তেজ কমে এসেছে যদিও লাল দপদপে আভা ছড়াচ্ছে কয়লা। উৎকর্ণ ম্যালকমসন একটা পাতলা, খুবই আবছা খচখচ শব্দ শুনতে পেল। রশিটা যেখানে ঝুলছে, ঘরের সেই কিনারে আওয়াজটা হয়েছে। ও ভাবল রশি মেঝেয় ঘষা খেয়ে অমন শব্দ তুলেছে।
মাথা তুলে তাকাল ম্যালকমসন। স্বল্প আলোয় দেখতে পেল বিরাট ইঁদুরটা রশিতে ঝুলে ওটাকে চিবুচ্ছে। দড়িটা অবশ্য অনেকখানি কেটে গিয়ে ভেতরের সুতোও বেরিয়ে পড়েছে। ও যখন ওদিকে তাকিয়েছে ততক্ষণে রশির দফা সারা। দড়ির কাটা অংশটি ঝপাৎ করে পড়ল ওক কাঠের মেঝেতে। এক মুহূর্তের জন্য বিশালদেহী ইঁদুর রশির সুতোযুক্ত ছেঁড়া মাথায় ঝুলে রইল। ছেঁড়া রশিটা এদিক ওদিক দুলছে। ম্যালকমসন আতঙ্কবোধ করল ভেবে যে বাইরের জগতের সঙ্গে তার যোগাযোগ মাধ্যমটি শেষ হয়ে গেল। রশি ধরে টান মেরে ঘণ্টা বাজানোর সুযোগটি আর রইল না, আর এ আতঙ্ক ওর মধ্যে সৃষ্টি করল ক্রোধ এবং সে যে বইটা পড়ছিল ওটা তুলে নিয়ে ইঁদুরের গায়ে ছুঁড়ে মারল।
লক্ষ্য নির্ভুলই ছিল। কিন্তু মিসাইল তার টার্গেটে পৌঁছানোর আগেই ইঁদুর রশি ছেড়ে দিয়ে ঝুপ করে নেমে পড়ল মেঝেতে। ম্যালকমসন ছুটে গেল ওটার দিকে। কিন্তু ইঁদুর তিড়িং করে এক লাফে কামরার অন্ধকার ছায়ায় উধাও হয়ে গেল।
পড়ার মুড নষ্ট হয়ে গেছে ম্যালকমসনের। ইঁদুরটাকে সে আজ ছাড়বে । ল্যাম্পের সবুজ শেডটা খুলে নিল যাতে আলোটা ভালভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ল্যাম্পের আলোয় রুমের ওপরের অংশ উদ্ভাসিত হলো, নতুন আলোর বন্যায় আগেকার অন্ধকারের তুলনায় দেয়ালের ছবিখানা আরও পরিষ্কার পরিস্ফুটিত হলো। যেখানে দাঁড়িয়ে আছে ম্যালকমসন, তার বিপরীতে ডানদিকে, ফায়ারপ্লেসের ডানে দেয়ালে ঝুলছে তৃতীয় ছবিখানা। অবাক বিস্ময়ে চোখ ঘষল ম্যালকমসন। একটা বিকট ভয় চেপে বসল ওকে।
ছবির মাঝখানে বাদামী ক্যানভাস তাতে ব্যাকগ্রাউন্ড আগের মতোই আঁকা আছে, ছবিতে খাড়া পিঠের চেয়ার, চিমনি এবং রশি সবই দেখা যাচ্ছে, কেবল বিচারকের ছবিটি নেই!
ভয়ের শীতল একটা স্রোত ম্যালকমসনকে প্রায় জমিয়ে দিল। সে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। ওর শরীর পক্ষাঘাতগ্রস্তের মতো কাঁপতে লাগল। দেহের সমস্ত শক্তি কে যেন শুষে নিয়েছে, নড়াচড়াও করতে পারছে না। চিন্তা-ভাবনা করার ক্ষমতাও হারিয়েছে ম্যালকমসন। সে শুধু দেখছে এবং শুনছে।
কারুকাজ করা ওক কাঠের খাড়া পিঠের প্রকাণ্ড চেয়ারটাতে লাল আলখাল্লা পরা বিচারক বসে আছেন। কুটিল চোখজোড়া প্রতিহিংসায় জ্বলছে, নির্দয় মুখে বিজয়ের দৃঢ় সংকল্পের হাসি ফুটিয়ে তিনি হাতে একটি কালো টুপি তুলে নিলেন।
ম্যালকমসনের মনে হলো ওর বুকের মধ্যে প্রবল বেগে বইছে রক্তস্রোত, প্রলম্বিত সাসপেন্সের সময় মানুষের ভেতরে যেরকম অনুভূতির সঞ্চার ঘটে। তার কানে ঝিন ঝিন শব্দ। প্রচণ্ড ঝড়ের হু হুংকার শুনতে পাচ্ছে ও, বাতাসের গর্জন ছাপিয়ে বাজার এলাকা থেকে ঘড়ির ঘণ্টা ধ্বনি ভেসে এল। টং টং শব্দে ঘোষণা করছে মাঝ রাত।
মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকল ম্যালকমসন। যেন অনন্তকাল ওভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। হাঁ করা মুখ। বিস্ফোরিত চোখ বন্ধ করে আছে নিঃশ্বাস। ঘড়ির ঢং ঢং আওয়াজে বিচারকের মুখের বিজয়ীর হাসিটি তীক্ষ্ণ হলো, শেষ ঘণ্টাটি বাজার পরে তিনি কালো টুপিটি মাথায় পরলেন।
ধীরে সুস্থে এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভঙ্গিতে চেয়ার ছাড়লেন তিনি। মেঝেয় পড়ে থাকা অ্যালার্ম বেলের খন্ডিত রশিটি তুলে নিলেন। হাত বোলালেন যেন ওটার স্পর্শ উপভোগ করছেন। তারপর রশিটির এক প্রান্তে গিটঠু মেরে তৈরি করতে লাগলেন ফাস। টেনেটুনে দেখলেন ফাঁসটি যথেষ্ট মজবুত হয়েছে কিনা। তারপর ওটা নিয়ে এগোলেন ম্যালকমসনের বিপরীত দিকের টেবিল ঘেঁষে। হাঁটার সময় তরুণ হাতটির ওপর অপলক দৃষ্টি থাকল তার। তিনি গিয়ে দাঁড়ালেন দরজার সামনে।
