ডাক্তার, আপনি এসব কী বলছেন? আপনি আসলে কী বলতে চাইছেন?
আমি বলতে চাইছি যে সম্ভবত আজ রাতে আমরা বিচারকের বাড়ি থেকে অ্যালার্ম বেলের শব্দ শুনতে পাব। বললেন ডাক্তার।
তিন
সাধারণত যে সময়ে বাড়ি ফেরে ম্যালকমসন আজ তার চেয়ে একটু দেরি হয়ে গেল। মিসেস ডেম্পস্টার কাজ টাজ সেরে চলে গেছে- গ্রীনহাউস চ্যারিটির নিয়মকানুন খুব কড়া। ম্যালকমসন খুশি হয়ে গেল দেখে ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে এবং বাতিও জ্বলছে। এখন এপ্রিল মাস। অথচ ঠান্ডাটা আজ একটু বেশিই পড়েছে মনে হয়। জোর হাওয়া বইছে বাইরে ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে শক্তি ঝড়ের আশংকা নিয়ে।
ম্যালকমসন ঘরে ঢোকার পরে কিছুক্ষণ ইঁদুরের দৌরাত্ম থেমে ছিল। ওর উপস্থিতির সঙ্গে নিজেদের সমঝে নিয়ে আবার শুরু হয়ে গেল তাদের হুটোপুটি। ইঁদুরদের সাড়া পেয়ে আজ অবশ্য খারাপ লাগছে না ম্যালকমসনের, বরং ওদের সঙ্গ উপভোগই করছে।
রিডিংল্যাম্পটি শুধু জ্বলছে। ওটার সবুজ শেড সিলিং এবং রুমের ওপরের অংশ আলোকিত করে রেখেছে। চুল্লির আগুনের আলো ছড়ানো মেঝেয় এবং টেবিলে পেতে রাখা সাদা কাপড়টি তাতে ঝকমক করছে।
পেটে বেশ খিদে নিয়ে খেতে বসল ম্যালকমসন। খাওয়া শেষ করে। একটি সিগারেট ধরাল। তারপর বসে পড়ল কাজে। কোনোকিছুই সে আজ তার মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হতে দেবে না কারণ ডাক্তারকে তেমনই কথা দিয়েছে। ঘুমাতে যাওয়ার আগে অনেকটা পড়া শেষ করবে ও।
ঘণ্টাখানেক একটানা পড়াশোনা করল ম্যালকমসন। তারপর বই থেকে তার চিন্তাভাবনাগুলো অন্যত্র সরে যেতে লাগল। আশপাশের পরিবেশ, আড়ষ্ট শরীর, নার্ভাসনেস কোনোকিছুই অগ্রাহ্য করার মতো নয়। বাতাস এতক্ষণে দমকা হাওয়ার রূপ নিয়েছে, সেখানে ঝড়ে রূপান্তর ঘটল। প্রাচীন বাড়িটি যতই নিরেট এবং মজবুত হোক না কেন, ওটার ভিত ধরে যেন নাড়া দিল ঝড়ো হাওয়া। কেঁপে কেঁপে উঠল। বাড়িটির অসংখ্য চিমনির ভেতরে হুংকার ছাড়ছে বাতাস, খালি কামরা এবং করিডরগুলোতে বিচিত্র শব্দ তুলছে। ছাদের প্রকাণ্ড অ্যালার্ম বেলটিও নিশ্চয় বাতাসের শক্তি টের পেয়েছে, রশিটি ঈষৎ ওপরে উঠল এবং নামল, যেন ঘণ্টাটি এদিক-ওদিক দুলল। ওক কাঠের মেঝেতে রশির বাঁকানো অংশ পড়ল থপ শব্দ করে।
রশি পড়ার শব্দে ম্যালকমসনের মনে পড়ে গেল ডাক্তারের কথা ওই রশিতেই জল্লাদ বিচারকের ফাঁসির আসামীদের ফাঁসিতে ঝোলাত। সে ফায়ারপ্লেসের কাছে গিয়ে রশিটি তুলে নিল হাতে। আশ্চর্য আগ্রহ বোধ করছে রশিটির প্রতি। ওটার দিকে তাকিয়ে ভাবল ফাঁসির এ রজ্জ্ব না জানি কত মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। বিচারক নিজ চোখে দেখেছেন তাঁর আসামীদের ফাঁসিতে ঝুলতে। ও ওখানে দাঁড়িয়ে আছে, ছাদের ঘণ্টাটা দুলে উঠে রশিটিকে এদিক-ওদিক দোলাল। রশিটি কেমন কেঁপে উঠল।
অজান্তেই ওপরের দিকে চোখ চলে গেল ম্যালকমসনের। দেখল বিশালদেহী ইঁদুরটা রশি বেয়ে ধীরে ধীরে নেমে আসছে তার দিকে, স্থির চোখে জ্বলন্ত চাউনি। সঙ্গে সঙ্গে রশিটি হাত থেকে ফেলে দিল ম্যালকমসন। পিছিয়ে এল সভয়ে অস্ফুট চিৎকারে। ইঁদুর এবার রশি বেয়ে তরতর করে ওপরে উঠে গেল এবং পরক্ষণে অদৃশ্য এবং ঠিক সেই মুহূর্তে ম্যালকমসন শুনতে পেল ইঁদুরের দল থেমে থাকা কোলাহল শুরু করে দিয়েছে আবার।
ম্যালকমসন ভাবছিল ধেড়ে ইঁদুরটার বাসস্থান খুঁজে দেখার কথা ছিল ওর, সেই সঙ্গে ছবিগুলোও দেখতে ঠিক করেছিল। শেডবিহীন একটি বাতি জ্বালাল ও। বাতিটি হাতে উঁচিয়ে ধরে ফায়ারপ্লেসের ডানদিকের তৃতীয় ছবিটির নিচে এসে দাঁড়াল। এ ছবিটির নিচেই গত রাতে ইঁদুরটাকে উধাও হতে দেখেছে সে।
প্রথমে দর্শনেই এমন চমকে গেল ম্যালকমসন যে আরেকটু হলেই বাতিটি ফেলেই দিচ্ছিল হাত থেকে। ওর মুখ শুকিয়ে গেল। হাঁটু কাঁপছে, কপালে ফুটল ভারী ঘামের ফোঁটা, বেতসলতার মতো থরথরিয়ে কাঁপছে। তবে তরুণ এবং তেজি ম্যালকমসন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সামলে নিল নিজেকে। উঁচু করে ধরল ল্যাম্প এবং ছবিটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। আগে ওতে ধুলো পড়া ছিল। এখন পরিষ্কার করা হয়েছে।
লাল টকটকে রোব পরা বিচারপতির ছবি। কঠোর, মজবুত, নির্দয় একটা মুখ। চেহারায় ফুটে আছে চতুরতা, শয়তানী এবং প্রতিহিংসা। ইন্দ্রিয়াসক্ত মুখ, শিকারী পাখির বাঁকানো ঠোঁটের মতো লালচে নাক। মুখের বাকি অংশ পান্ডুর, বিবর্ণ। চোখ জোড়া ঝকঝকে তাতে অত্যন্ত অশুভ ছাপ। চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ম্যালকমসনের গা-হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল। কারণ ওই চোখজোড়ার সঙ্গে অতিকায় ইঁদুরটার চোখের আশ্চর্য মিল। হাত থেকে বাতিটি প্রায় পড়েই যাচ্ছিল যখন দেখল ছবির পাশের একটি গর্ত দিয়ে তীব্র ঘৃণামিশ্রিত একজোড়া চোখ ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ঠিক ওই মুহূর্তে অন্য ইঁদুরগুলোর কিচকিচানি থেমে গেল। যাহোক, নিজেকে সামলে নিল ম্যালকমসন এবং ছবিটি খুঁটিয়ে দেখতে লাগল।
বিচারক খাড়া পিঠের ওক কাঠের অলংকৃত বিরাট একটি চেয়ারে বসে আছেন। ডান পাশে পাথরের তৈরি বড়সড় একটি ফায়ারপ্লেস। ওটার কিনারায়, ছাদ থেকে একটি রশি ঝুলছে। রশির শেষ মাথা কুন্ডলী পাকিয়ে পড়ে আছে মেঝেয়। আত্মা শুকিয়ে গেল ম্যালকমসনের কামরাটির দৃশ্য চিনতে পেরে। সে ভয়ে ভয়ে চারপাশে তাকাল যেন আশঙ্কা করছে কেউ তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। ফায়ারপ্লেসের কিনারায় তাকাতেই আঁতকে উঠল সে এবং হাত থেকে পড়ে গেল বাতি।
