সেই রাতে গভীর ঘুম হলেও বেশ কয়েকবারই কয়েক সেকেন্ডের জন্য অস্বস্তি নিয়ে ঘুম ভেঙে গেল ম্যালকমসনের নানান দুঃস্বপ্ন দেখে। মিসেস ডেম্পস্টার ওকে ডেকে তুলল সকালে। শরীরটা কেমন অসুস্থ লাগল ওর, প্রথম কয়েকটা মুহূর্ত বুঝতেই পারল না কোথায় আছে। মিসেস ডেম্পস্টারকে সে যে অনুরোধটা করল তা শুনে বিস্ময়বোধ করল মহিলা।
মিসেস ডেম্পস্টার, আজ যখন বাইরে যাব আপনি তখন ওই ছবিগুলোর ময়লা ধুলা পরিষ্কার করে ফেলবেন। বিশেষ করে ফায়ারপ্লেসের ওপরের তিন নম্বর ছবিটা থেকে। ওগুলো কীসের ছবি আমি দেখতে চাই।
সেদিন বিকেলে বই নিয়ে হাঁটতে বেরিয়ে বেশ ফুর্তিই লাগছিল ম্যালকমসনের। দিন যত গড়াচ্ছিল আগের দিনের উফুল্লভাব ফিরে আসছিল তার মাঝে। বইয়ের যে সব সমস্যা নিয়ে সে বিচলিত ছিল তার অনেকগুলোরই সমাধান করা গেছে। সে খুশি মনে মিসেস উইদ্যামের দ্য গুড ট্রাভেলার সরাইখানায় গেল। আরামদায়ক বসার ঘরে ডা. থর্নহিল নামে এক আগন্তুকের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিলেন ল্যান্ডলেডি। তবে ডাক্তার যখন ম্যালকমসনকে একগাদা প্রশ্নে জেরবার করতে লাগলেন, ভদ্রমহিলা একটু বিব্রতই হলেন। তবে প্রশ্নের ধরন শুনে ম্যালকমসন বুঝতে পারল ভদ্রলোকের উপস্থিতি নিতান্তই কাকতালীয় নয়। তাই সে বলল :
ড. থর্নহিল, আমি আপনার সমস্ত প্রশ্নেরই জবাব দেব যদি আপনি আমার একটি প্রশ্নের অন্তত জবাব দেন।
ম্যালকমসনের প্রশ্নে বিস্মিত দেখাল ডাক্তারকে তবে তিনি হেসে তাৎক্ষণিক বললেন, নিশ্চয়! কী প্রশ্ন?
মিসেস উইদ্যাম কি আপনাকে এখানে আসতে বলেছেন এবং আমার। সঙ্গে কথা বলতে বলেছেন?
একটু চমকেই গেলেন ডা. থর্নহিল । মিসেস উইদ্যামের মুখ লাল হয়ে গেল, তিনি অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। তবে ডাক্তার সাহেব বেশ আমুদে মানুষ এবং সকল রকম পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রস্তুত। তিনি খোলাখুলিই ওর প্রশ্নের জবাব দিলেন।
হ্যাঁ বলেছিলেন, তবে আপনি জেনে যাবেন তা চান নি। আমার তাড়াহুড়োর কারণেই আপনি আসলে আমাকে সন্দেহ করে বসেছেন। বলেছেন আপনি যে ওই বাড়িতে একা একা থাকেন সেটি তাঁর একদমই পছন্দ নয়। আর তাঁর ধারণা আপনি বড্ড বেশি কড়া লিকারের চা পান করছেন। আসলে তিনি চাইছেন আমি যেন আপনাকে বেশি বেশি চা খেতে বারণ করি এবং বেশি রাত জাগতেও মানা করি। কলেজ জীবনে আমিও বইপোকা ছিলাম। কাজেই একজন সাবেক কলেজ ছাত্র হিসেবে এটুকু স্বাধীনতা নিতেই পারি এবং আশা করি আমাকে স্রেফ একজন আগন্তুক ভাববেন না।
উজ্জ্বল হাসিতে উদ্ভাসিত হলো ম্যালকমসনের মুখ। হাত বাড়িয়ে দিল সে। আসুন, হাত মেলাই! আমেরিকায় এভাবেই বলে ওরা। আপনার এবং মিসেস উইদ্যামের বদান্যতার জন্য ধন্যবাদ। কথা দিচ্ছি আমি আর কড়া লিকারের চা পান করব না। আপনি অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত আর চা-ই খাব না– এবং খুব যদি দেরিও করি তাও রাত একটার মধ্যে ঘুমাতে যাব। চলবে?
খাসা, বললেন ডাক্তার । এখন আমাদের বলুন তো পুরানো বাড়িটিতে কী কী দেখলেন।
ম্যালকমসন সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দিল গত দুরাতে কী ঘটেছে। তার কথা বলায় মাঝে মধ্যেই ব্যাঘাত ঘটল মিসেস উইদ্যামের ভয়ার্ত চিৎকারে । নিজেকে সামলে নিতে তিনি এক গ্লাস ব্রান্ডি এবং পানি পান করলেন। তারপর তাঁর ফ্যাকাশে মুখে রক্ত ফিরে এল। ম্যালকমসনের কথা শুনতে শুনতে ডা. থর্নহিলের মুখ গম্ভীরতর হলো এবং বর্ণনা শেষ হলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ইঁদুরটা কি সবসময়ই অ্যালার্ম বেলের রশি বেয়ে উপরে উঠে যায়?
সবসময়।
আশা করি আপনি জানেন, একটু বিরতি দিয়ে বললেন ডাক্তার। রশিটা কীসের?
না!
এটা সেই রশি যা দিয়ে জল্লাদ বিচারপতির রায়ে সাব্যস্ত অপরাধীদের ফাঁসি দিত, ধীরে ধীরে বললেন থর্নহিল। এখানে তিনি আবার বাধা পেলেন মিসেস উইদ্যামের চিৎকারে। সামলে উঠতে তাঁকে আবার ব্রান্ডি এবং পানি পান করতে হলো। ঘড়ি দেখল ম্যালকমসন। ডিনারের সময় প্রায় হয়ে এসেছে। সে আর দেরি করল না। ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির পথ ধরল।
ম্যালকমসন চলে যাওয়ার পরে ডাক্তারের ওপর প্রায় হামলে পড়লেন মিসেস উইদ্যাম। ক্ষিপ্ত গলায় জানতে চাইলেন বেচারা তরুণটিকে অমন ভয়ঙ্কর একটা কথা শোনাবার মানে কী! এমনিতেই ওখানের নানান ঘটনায় বেচারা বিপর্যস্ত, যোগ করলেন তিনি।
ডা. থর্নহিল জবাব দিলেন, ম্যাডাম ওই কথাটি বলার পেছনে আমার বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল। আমি ঘণ্টার রশির দিকে ওর মনোযোগ আকর্ষণ করতে চেয়েছি যাতে ওই ঝামেলাটা সে নিজেই মিটিয়ে নিতে পারে। হয়তো ও একটু বেশি মাত্রায় উত্তেজিত এবং ক্লান্ত, খুব বেশি পড়াশোনা করছে, যদিও ওকে আমার সুস্থ এবং স্বাস্থ্যবান বলেই মনে হলো, মানসিক এবং শারীরিক উভয় দিক থেকেই কিন্তু ওই ইঁদুরগুলো –আর ধেড়েটাকে শয়তান বলে মনে করা! ডানে বামে মাথা নাড়লেন তিনি। বলে চললেন, আমি ওর সঙ্গে যাওয়ার প্রস্তাব দিতে পারতাম রাতটা একসঙ্গে কাটানোর জন্য কিন্তু তাতে সে অপমান বোধ করত। রাতের বেলা হয়তো ওর মধ্যে অদ্ভুত কোনো ভীতি কাজ করে কিংবা দৃষ্টিবিভ্রমের শিকার হয়। যদি তাই হয় সেক্ষেত্রে আমি চাই ও রশিটা ধরে টানুক। ঘণ্টার শব্দ পেলেই আমরা ওখানে চলে যাব। আমি আজ অনেক রাত অবধি জেগে থাকব এবং কান সজাগ থাকবে।
