ইঁদুরের দল গত রাতের চেয়ে আজ বেশি বিরক্ত করছে। ওপরে-নিচে, ডানে-বামে তাদের অবিরাম ছোটাছুটি চলছেই। সেই সঙ্গে কিচকিচানির তো বিরামই নেই। তারা নখের আঁচড় কাটছে কাঠে, দাঁত বসাচ্ছে। ক্রমে তাদের সাহস বেড়ে গেল। কাঠের আচ্ছাদনের ফাঁক ফোকর, ফাটল এবং গর্ত দিয়ে উঁকি ঝুঁকি মারতে লাগল। আগুনের আলোয় তাদের ছোট ছোট চোখগুলো যেন বাতির মতো জ্বলজ্বল করছে। তবে চাউনিতে বদমায়েশি নেই। এরা শুধু খেলছে। সবচেয়ে সাহসী দুএকটা ইঁদুর মেঝেতেও চলে আসছে অথবা কাঠের আচ্ছাদনের আনাচে-কানাচে উঠে পড়ছে। তবে ম্যালকমসন খুব বেশি বিরক্ত বোধ করলে হুশ হাশ শব্দ করে অথবা টেবিল চাপড়ে ওগুলোকে ভয় খাইয়ে দিল। ওরা পড়িমড়ি করে সেঁধুলো গর্তে।
রাত যত গম্ভীর হলো, ইঁদুরদের শোরগোল সত্ত্বেও ম্যালকমসন তার কাজের মধ্যে গভীর মনোযোগে ডুবে যেতে থাকল।
গত রাতের মতো হঠাৎ করে সে কাজে বিরতি দিল আকস্মিক নিরবতা টের পেয়ে। কিচকিচ, নখ আঁচড়ানো কিংবা দাঁতে কামড়ানোর কোনোরকম শব্দ নেই। গোরস্তানসম নিস্তব্ধতা। আগের রাতের কথা মনে পড়তে সহজাত প্রকৃতিতে তার চোখ চলে গেল ফায়ারপ্লেসের পাশে দন্ডায়মান চেয়ারখানার দিকে। একটা অদ্ভুত শিহরণ প্রবাহিত হলো তার গোটা শরীর বেয়ে।
ফায়ারপ্লেসের পাশে, পিঠখাড়া ওক কাঠের বিরাট চেয়ারটিতে বসে আছে সেই বিশালদেহী ইঁদুর। হিংস্র, কুটিল চোখে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে ম্যালকমসনের দিকে।
সহজাত প্রবৃত্তি ওকে হাতের কাছে যা পেল তা-ই তুলে নিতে দিল লগারিদমের একখানা বই। সে ওটা ছুঁড়ে মারল। লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো টার্গেট। ইঁদুর নড়ল না এক চুল। আবার পোকার হাতে গত রাতের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো। এবং ইঁদুরটা ম্যালকমসনকে অস্ত্র হাতে ছুটে আসতে দেখে অ্যালার্ম বেলের রশি বেয়ে পগাড়পার হলো। আর ওটা চলে যাওয়া মাত্র উঁদুরকুলের হৈ হট্টগোল শুরু হয়ে গেল। বিশালদেহী ইঁদুরটা কামরার কোন্ অংশে কেটে পড়েছে দেখতে পায়নি ম্যালকমসন। কারণ তার সবুজ শেডের বাতির আলো শুধু ঘরের ওপরের অংশ আলোকিত করে রেখেছে এবং ফায়ারপ্লেসের আগুনও তেজ হারিয়ে ধুকছে।
ঘড়ি দেখল ম্যালকমসন। প্রায় মাঝরাত্তির। সে অগ্নিকুণ্ডে আগুন উষ্কে দিয়ে রাতের বেলার জন্য চা বানাল। অনেক কাজ পড়ে আছে। একটু ধূমপান করলে মন্দ হয় না। সে ওক কাঠের চেয়ারে বসে সিগারেটের ধোঁয়া ওড়াতে ওড়াতে ভাবল ইঁদুরটা কোথায় সেঁধিয়েছে সেই জায়গাটা খুঁজে বের করতে হবে। কাল ইঁদুর ধরার ফাঁদ কিনে আনার চিন্তাটাও বাতিল করে দিল না।
ম্যালকমসন আরেকটি ল্যাম্প জ্বালাল। রাখল এমন জায়গায় যাতে ফায়ারপ্লেসের ডানদিকের দেয়ালে আলো পড়ে। তারপর হাতের কাছে সমস্ত বইপত্র জড় করে রাখল যাতে অনিষ্টকর প্রাণীটাকে দেখা মাত্র ওগুলো ওটার গায়ে ছুঁড়ে মারতে পারে। সবশেষে অ্যালার্ম বেলের রশি টেনে এনে গোড়াটা রাখল টেবিলের ওপর, ল্যাম্পের নিচে। রশিটা বেশ প্যাচানো এবং মজবুত। এ দিয়ে তো মানুষের ফাঁসি দেয়া যায়, মনে মনে বলল ও। কাজ শেষ করে চারপাশে তাকিয়ে তৃপ্তি সহকারে বলল :
এবারে বন্ধু তোমাকে একটা শিক্ষা দেয়া যাবে! ও আবার পড়তে বসল যদিও শুরুতে ইঁদুরগুলোর ছোটাছুটিতে খানিকটা বিরক্ত বোধ করলেও কাজে এমন ডুবে গেল যে ওগুলোর কথা মনেই রইল না।
আবারও সে পারিপার্শ্বিকতা নিয়ে সচেতন হয়ে উঠল। এবারে আকস্মিক নৈশব্দ নয়, তার মনোযোগ আকর্ষণ করল রশিতে সামান্য আন্দোলন। টান খেয়েছে ওটা, সরে গেছে ল্যাম্প। নড়ল না ম্যালকমসন শুধু তাকিয়ে দেখল তার বইয়ের গাদা ঠিকঠাক আছে কিনা, তারপর তার দৃষ্টি অনুসরণ করল রশি।
চোখ তুলে তাকাতেই দেখে অতিকায় ইঁদুরটা রশি দিয়ে লাফ মেরে ওক কাঠের আরামকেদারায় বসেছে এবং তার দিকে রোষকষায়িত নয়নে তাকিয়ে আছে। ডান হাতে একখানা বই তুলে নিল ম্যালকমসন, লক্ষ্য নির্দিষ্ট করে ছুঁড়ে মারল ইঁদুরটাকে। ঝট করে লাফিয়ে সরে গিয়ে মিশাইলের নিশানা ব্যর্থ করে দিল ইঁদুর।
আরেকটা বই নিল ম্যালকমসন, তারপর আরেকখানা এবং একের পর এক বই ছুঁড়তেই লাগল কিন্তু একবারও টার্গেটের গায়ে লাগাতে পারল না। অবশেষে সে বই নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল নিশানা ভেদ করতে। কিচকিচ আওয়াজ করল ইঁদুর। মনে হয় ভয় পেয়েছে। এতে আরও উৎসাহ পেয়ে গেল ম্যালকমসন। ছুড়ল বই। ওটা ইঁদুরটার গায়ে লাগল থ্যাচ শব্দ করে। বিকট আর্তনাদ করল ইঁদুর, একবার তীব্র বিবমিষায় তার হামলাকারীকে দেখে নিয়ে চেয়ারের পিঠ বেয়ে উঠে মস্ত লাফ দিল অ্যালার্ম বেলের রশি লক্ষ্য করে এবং বিদ্যুতগতিতে দৌড়ে গেল। আকস্মিক টান খেয়ে দুলল বাতি তবে ওজনে বেশ ভারী বলে উল্টে পড়ল না। ইঁদুরটার ওপর চোখ রেখেছে। ম্যালকমসন। দ্বিতীয় বাতির আলোয় দেখল ওটা কাঠের আচ্ছাদনের কিনারে লাফিয়ে উঠে দেয়ালে ঝোলানো বিরাট আকারের ছবিগুলোর একটির নিচের গর্ত দিয়ে সুড়ৎ করে উধাও হলো। ধুলো আর কালি ঝুলি মাখা ছবির কারণে ওটাকে আর দেখা সম্ভব হলো না।
সকাল বেলায় আমি ইঁদুরটার নিবাসে খোঁজ লাগাব, মেঝে থেকে বই তুলতে তুলতে আপন মনে বলছে ম্যালকমসন। ফায়ারপ্লেসের ওপরে তিন নম্বর ছবিটি। মনে থাকবে।
