তবে ম্যালকমসনকে সবচেয়ে আকর্ষণ করল ঘরের কিনারে, ফায়ারপ্লেসের ডানদিকের একটি মস্ত ঘণ্টা। ওটা অ্যালার্ম বেল। ছাদ থেকে রশিতে ঝুলে আছে ঘণ্টাটি ফায়ারপ্লেসের ওপর। ওক কাঠের অলংকৃত, খাড়া পিঠের একটি বিশাল চেয়ার অগ্নিকুণ্ডের কাছে টেনে নিয়ে গিয়ে ওতে বসল ম্যালকমসন। বসে বসে শেষ কাপ চা পান করল। চা শেষ করে আগুনটা উস্কে দিয়ে ফিরে গেল কাজে। অগ্নিকুণ্ড বাম পাশে রেখে টেবিলের একটা কিনারা দখল করল সে। ইঁদুরগুলোর কিচকিচ তাকে খানিকক্ষণ বিরক্ত করল তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই সে এ শব্দে অভ্যস্ত হয়ে গেল ঘড়ির টিকটিক আওয়াজ কিংবা স্রোতের শোঁ শোঁ শব্দের মতো। নিজের কাজে এমনই মশগুল হয়ে গেল ম্যালকমসন যে অঙ্কের জটিল সমস্যার সমাধান ছাড়া দুনিয়াদারীর অন্য সবকিছু বিস্মৃত হলো।
সে হঠাৎ চোখ তুলে তাকাল, অঙ্কের সমস্যাটির সমাধান এখনও হয়নি, বাতাসে কেমন থম মেরে গেছে। ভোরের পূর্বাভাস সূচিত হওয়ার আগে এরকম স্তব্ধ থাকে বাতাস। ইঁদুরের কিচকিচানি থেমে গেছে। আকস্মিক এক নিরবতা ওকে কেমন অস্বস্তিতে ফেলে দিল। আগুন নিভু নিভু তবে এখনও লাল টকটকে কয়লা জ্বলছে। ওদিকে তাকাতে সে দারুণ। চমকে উঠল।
ফায়ারপ্লেসের ডান দিকে, খাড়া পিঠের ওক কাঠের প্রকাণ্ড চেয়ারটির ওপর বসে আছে মস্ত এক ইঁদুর, কটমট করে তাকিয়ে আছে ম্যালকমসনের দিকে। দৃষ্টিতে প্রবল ঘৃণা। ওটাকে মারার ভঙ্গিতে হাত তুলল ম্যালকমসন। কিন্তু একচুল নড়ল না ইঁদুর। উল্টো সাদা, তীক্ষ্ণ দাঁত খিচাল ক্রুদ্ধ হয়ে, তার নির্দয় চোখে ঝলসাল প্রতিহিংসা।
বিস্ময়বোধ করল ম্যালকমসন। চুল্লি থেকে পোকারটা তুলে নিয়ে ছুটল ওটাকে হত্যা করতে। কিন্তু আঘাত হানার আগেই কিচকিচ করে উঠল ইঁদুর, গলার স্বরে তীব্র ঘৃণা, লাফিয়ে পড়ল মেঝেয়, ঘণ্টার রশি বেয়ে আঁধারে উধাও হয়ে গেল। ওখানে সবুজ শেডের বাতির আলো পৌঁছায়নি। অদ্ভুতই বলতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালের কাঠের আচ্ছাদনের আড়াল থেকে ইঁদুরগুলোর ছোটাছুটির শব্দ শুরু হয়ে গেল।
তবে এবারে ওদিকে মনোযোগ দিল না ম্যালকমসন। কারণ তীক্ষ্ণ গলায় একটা মোরগ ডেকে উঠে জানান দিয়েছে ভোর সমাগত। সে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল এবং ঘুমিয়ে গেল।
এমন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ম্যালকমসন যে টেরই পেল না মিসেস ডেম্পস্টার এসেছে তার ঘর ঝাট দিতে। মহিলা ঘরদোর পরিষ্কার করে, ওর নাশতা বানিয়ে তারপর খাটের স্ক্রীণে টোকা দিয়ে ওকে ঘুম থেকে জাগাল। রাতে অনেকক্ষণ কাজ করেছে বলে ক্লান্তিটা পুরোপুরি দূর হয়নি। তবে কড়া লিকারের এক কাপ চা নিমিষে ওকে সতেজ করে তুলল। একখানা বই হাতে মর্নিং ওয়াকে বেরিয়ে পড়ল ম্যালকমসন। সঙ্গে খানকয়েক স্যান্ডউইচও নিয়েছে যদি দুপুরে বাড়ি ফেরা না হয় তো রাস্তায় বা অন্য কোথাও বসে খেয়ে নেবে।
উঁচু উঁচু দেবদারু বৃক্ষের সারির মাঝ দিয়ে পথ চলে গেছে শহরের বাইরের দিকে। এখানকার নির্জনতাটুকু বেশ উপভোগ করল ম্যালকমসন। দিনের বেশ অনেকটা অংশ এদিকটাতেই ব্যয় হলো ওর পড়াশোনার খাতিরে।
পড়াশোনা শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে সে মিসেস উইদ্যামের সঙ্গে দেখা করতে গেল তার বদান্যতার জন্য ধন্যবাদ দিতে। খাস কামরার হিরক আকৃতির কাঁচের জানালা দিয়ে ওকে আসতে দেখে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। স্বাগত জানালেন ম্যালকমসনকে। ওর আপাদমস্তক নজর বুলিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন :
এত পরিশ্রম করা উচিত নয়, স্যার। আপনার মুখচোখ কেমন শুকনো লাগছে। রাত্রি জাগরণ এবং অতিরিক্ত পরিশ্রম কোনো মানুষের জন্যই ভাল নয়। সে যাকগে, স্যার, বলুন রাতটি কেমন কাটল? আশা করি ভাল? আপনাকে নিয়ে খুব চিন্তা হচ্ছিল। কিন্তু মিসেস ডেম্পস্টার যখন বলল আপনি সুস্থ আছেন এবং আপনাকে সে মরার মতো ঘুমাতে দেখেছে তখন একটু স্বস্তি পেয়েছি।
আমি ঠিকই আছি, হাসতে হাসতে বলল ম্যালকমসন। কিছুটা আমাকে বিরক্ত করে নি। শুধু কতগুলো ইঁদুর ছাড়া। সারা কামরা জুড়ে ওগুলো দাপিয়ে বেড়িয়েছে। একটা ধাড়ি শয়তান ফায়ারপ্লেসের ধারে আমার চেয়ারে বসেছিল। পোকার হাতে ধাওয়া করলে ওটা অ্যালার্ম বেলের রশি বেয়ে দেয়াল কিংবা ছাদের কোথাও ছুটে পালিয়েছে- আমি ঠিক দেখতে পাই নি। বেশ অন্ধকার ছিল।
ঈশ্বর রক্ষা করুন, বললেন মিসেস উইদ্যাম, একটা ধাড়ি শয়তান ইঁদুর ফায়ারপ্লেসের ধারের চেয়ারে বসেছিল! সাবধান, স্যার! সাবধান! যা রটে তার কিছু হলেও ঘটে।
মানে? আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারলাম না।
ধাড়ি শয়তান! ওখানে হয়তো বুড়ো শয়তানটা আছে! না, না, হাসবেন না। ম্যালকমসনকে অট্টহাসিতে ফেটে পড়তে দেখে দ্রুত বললেন মহিলা। বুড়োরা যাতে ভয় পায় সেসব কথা আপনারা তরুণরা হেসেই উড়িয়ে দিতে চান।
আমার কথায় কিছু মনে করবেন না, বলল ম্যালকমসন। আমাকে রূঢ় প্রকৃতির বলেও দয়া করে ভাববেন না। তবে আপনার কথা মেনে নেয়া আমার জন্য সত্যি কষ্টকর- বুড়ো শয়তানটা নিজে গত রাতে চেয়ারে বসেছিল। হা! হা! হা! হাসতে হাসতেই ওখান থেকে চলে এল ম্যালকমসন। বাড়ি চলল লাঞ্চ করতে।
দুই
রাতে ইঁদুরদের ছোটাছুটি একটু আগেই শুরু হয়ে গেল। বলা উচিত ও ঘরে প্রবেশের আগে থেকেই তারা দৌরাত্ম আরম্ভ করেছে। ম্যালকমসন ঘরে ঢুকতে তাদের দৌড়ঝাঁপে সাময়িক ছেদ পড়ল। ডিনার সেরে আগুনের পাশে খানিক বসে ধূমপান করল ম্যালকমসন। তারপর টেবিল পরিষ্কার করে গত রাতের মতো পড়তে বসল।
