বাড়ি পরিদর্শন শেষ করে ম্যালকমসন সিদ্ধান্ত নিল প্রকাণ্ড ডাইনিংরুমে বসেই সে পড়ালেখা করবে। সুপরিসর এ কক্ষটি তার সকল প্রয়োজন মেটাবে। এবং মিসেস উইদ্যাম ঠিকা কাজের বুয়া মিসেস ডেম্পস্টারকে নিয়ে ঘর গোছাতে লেগে গেলেন। প্যাকিং বাক্স পেঁটরা, ঝুড়ি ইত্যাদি এনে খোলা হলো। ম্যালকমসন দেখে আগামী কয়েকদিন ভালভাবে চলে যাওয়ার মতো খাবার দাবার পাঠিয়েছেন মিসেস উইদ্যাম। বিদায়বেলায় তিনি সকলরকম শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করে দরজায় এসে ঘুরে দাঁড়ালেন এবং বললেন:
ঘরটি যেহেতু বিশাল এবং ঠান্ডা, কাজেই স্যার, আপনার জন্য ভাল হবে যদি রাতে ঘুমাবার সময় আপনার বিছানার ধারের বড় পর্দাগুলো টেনে দেন- যদিও সত্যি বলতে কী এরকম একটা জায়গায় ওইসব কিছু যেগুলো মাথার ওপর দিয়ে, পাশ দিয়ে উঁকি দেয়, তার মধ্যে আমাকে বন্দি থাকতে হলে দম বন্ধ হয়ে মারাই যেতাম! এসব ছবির কথা কল্পনা করেই তাঁর কাঁপুনি উঠে গেল। তিনি একরকম পালিয়েই বাঁচলেন।
ল্যান্ডলেডি চলে গেলে কর্তৃত্বের ভঙ্গিতে নাক টানল মিসেস ডেম্পস্টার এবং বলল সে এসব জুজুর ভয়ে ভীত নয়।
বিষয়টি কী আপনাকে আমি বলছি, স্যার, বলল সে। জুজু নানারকমেরই আছে। ইঁদুর, গুবড়ে পোকা, কাঁচকোচ শব্দ করা দরজা, আলগা স্লেট পাথর, ভাঙা কাঁচের জানালা, আটকে যাওয়া দেরাজের হাতল যা দিনের বেলা টেনেও খোলা যায় না অথচ গভীর রাতে আপনা-আপনি খুলে গিয়ে দড়াম শব্দে পড়ে যায়–এসবই জুজুর ভয়। এ ঘরের কাঠের আচ্ছাদন দেখুন! অনেক পুরানো–শত বছরের পুরানো তো হবেই! আপনার কি ধারণা ওখানে কোনো ইঁদুর এবং গুবড়ে পোকা নেই? এবং আপনি কি কল্পনা করতে পারেন, স্যার, যে ওদের দেখতে পাবেন না? ইঁদুর হলো জুজু, স্যার, আর জুজুই হলো ইঁদুর। এছাড়া এদের আর কী বলা যায়!
মিসেস ডেম্পস্টার, গম্ভীর গলায় বলল ম্যালকমসন। আপনি অনেক খোঁজখবর রাখেন বুঝতে পারছি। আমি যখন চলে যাব আপনি এ বাড়িতে স্বচ্ছন্দে থাকতে পারবেন। আমার এখানকার কাজ সপ্তাহ চারেকের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। তারপর বাকি দুই মাস আপনি মাগনা থাকতে পারবেন।
ধন্যবাদ, স্যার, প্রত্যুত্তরে বলল মহিলা। তবে বাড়ির বাইরে একটি রাত্তিরও থাকার জো নেই আমার। আমি থাকি গ্রীন হাউসের চ্যারিটিতে। এক রাত বাইরে কাটিয়েছি কী আমার সবকিছু হারাতে হবে। ওখানকার আইনকানুন বড় কড়া। আর আমার জায়গাটি দখল করার জন্য অনেকেই মুখিয়ে আছে। শুধু এ কারণেই, স্যার, দিনের বেলাটা আমি দিব্যি সময় দিতে পারব।
কিন্তু আমি এখানে এসেছি পুরোপুরি নিরিবিলি থাকার জন্য, দ্রুত বলে উঠল ম্যালকমসন।
কর্কশ গলায় হেসে উঠল মহিলা। আপনাকে সেজন্য ভাবতে হবে না। আপনি এখানে পুরোপুরি নিরিবিলিই থাকতে পারবেন।
মহিলা ঘরদোর পরিষ্কারের কাজে নেমে পড়ল। সন্ধ্যার পরে বৈকালিক ভ্রমণ শেষে (ম্যালকমসন হাঁটতে হাঁটতে বই পড়ে) বিচারকের বাড়িতে ফিরে এসে ম্যালকমসন দেখে ঘর চমৎকার ঝাঁট দেয়া হয়েছে, সবকিছু সুন্দর গোছগাছ করা, পুরানো ফায়ারপ্লেসে জ্বলছে আগুন, বাড়ি জ্বালানো এবং মিসেস উইদ্যামের দেয়া খাবার দিয়ে টেবিলে সাপার সাজানো। সে খুব খুশি হয়ে গেল।
নৈশভোজ সেরে, মস্ত ডাইনিং টেবিলের আরেক মাথায় ট্রেটি ঠেলে সরিয়ে রেখে আবার বই নিয়ে বসল ম্যালকমসন। ফায়ারপ্লেসে শুকনো লাকড়ি ঢোকাল, বাতির শিখা বাড়িয়ে দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল পড়াশোনার জগতে। রাত এগারোটা পর্যন্ত টানা পড়ালেখা করল সে। তারপর উঠল অগ্নিকুণ্ডের আগুনটা উস্কে দিতে। এক কাপ চা বানাল নিজের জন্য। সে চা খেতে খুব ভালবাসে। কলেজ জীবনেও অনেক রাত অবধি পড়ত ম্যালকমসন এবং চা বানিয়ে খেত। গভীর রাতে চা পানের বিষয়টি তার কাছে চমৎকার এক বিলাসিতা। ব্যাপারটি সে খুব উপভোগ করে। তাজা। লাকড়ি পেয়ে আগুন দাউ দাউ জ্বলছে, প্রকাণ্ড প্রাচীন কক্ষটির দেয়ালে ফেলছে অদ্ভুত দর্শন সব ছায়া। গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে এই নির্জনতাটুকু বেশ উপভোগ্য মনে হচ্ছিল ম্যালকমসনের। হঠাৎ প্রথমবারের মতো সে সচেতন হয়ে উঠল ইঁদুরের শব্দে।
আমার বই পড়ার সময় ইঁদুরগুলো এখানে ছিল না, ভাবছে সে। তাহলে নিশ্চয় ওদের সাড়া পেতাম। তবে এখন শব্দের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে নিজেকে এই বলে বোঝাল ম্যালকমসন যে এসব শব্দ নতুন। অচেনা একজন লোকের আগমনে মূষিককূল নিশ্চয় ভয় পেয়েছে, আগুন এবং বাতির আলোও তাদের সন্ত্রস্ত করে তুলেছে; কিন্তু সময় যত বয়ে যেতে লাগল শব্দ ততই বাড়তে থাকল, এরা যেন তাদের অভ্যস্ত খেলায় আনন্দ পেতে শুরু করেছে।
কী যে ব্যস্ত ওরা! আর বিচিত্র সব শব্দ করছে! পুরানো কাঠের আচ্ছাদনের পেছনে, ছাতের ওপর এবং মেঝের নিচে ওরা ছোটাছুটি করছে, দাঁত বসাচ্ছে, খামচি কাটছে! মিসেস ডেম্পস্টারের কথা মনে পড়তে আপন মনে হাসল ম্যালকমসন, জুজু ইঁদুর, ইঁদুরই জুজু!
চায়ের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেহ মনে। প্রায় শেষ রাত পর্যন্ত কাজ করার মতো উৎসাহ পাচ্ছে সে। তার আগে কামরাটিতে একবার ভালভাবে চোখ বুলালে কেমন হয়, ভাবল ও। হাতে ল্যাম্প তুলে নিয়ে ও গোটা ঘরে চক্কর দিতে লাগল। ভাবছে এমন চিত্তাকর্ষক এবং সুন্দর বাড়িটি কী করে এতদিন ধরে অবহেলিত হয়ে পড়েছিল। ওক কাঠের দেয়ালের গায়ের ভাস্কর্যগুলো চমৎকার। দরজা এবং জানালার কারুকাজগুলোও দেখার মতো। দেয়ালে পুরানো কিছু ছবি ঝুলছে তবে এমন ধুলো ময়লা জমে গেছে যে মাথার ওপর বাতিটি তুলে ধরেও বোঝা গেল না ওগুলো কীসের চিত্র। ফাটল বা গর্তে আলোতে মাঝে মধ্যেই ধরা পড়ল ইঁদুরের জ্বলজ্বলে চক্ষু। তবে ওগুলো আলো দেখে ভয় পেয়ে কিচকিচ শব্দ তুলে মুহূর্তে উধাও।
