ঘণ্টা তিনেকের ট্রেন ভ্রমণ শেষে বেনচার্চে নামল ম্যালকমসন। সন্তুষ্ট বোধ করল এখন পর্যন্ত সে তার পথের নিশানা মুছে ফেলতে সমর্থ হয়েছে। কারণ কেউ জানে না পড়াশোনার জন্য তার গন্তব্য কোথায়। একটি নির্জন জায়গার সরাইখানায় রাত্রিযাপন করার জন্য গেল সে। বেনচার্চ একটি মার্কেট টাউন, তিন হপ্তায় একবার এখানে হাটবাজার বসে, বাকি একুশ দিন শহর যেন মরুভূমি।
শহরে আসার পরদিন ম্যালকমসন ঘুরতে বেরুল দ্য গুড ট্রাভেলার সরাইখানার চেয়ে নিরিবিলি কোনো বাসস্থান মেলে কিনা। একটি মাত্র জায়গা তার নজর কেড়ে নিল। দেখামাত্র পছন্দ হয়ে গেল বাড়িটি- একা থাকার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা হতে পারে না। জ্যাকোবিয়ান স্টাইলে তৈরি, যেন অপরিকল্পিতভাবে গজিয়ে উঠেছে দারুণ মজবুত চেহারার প্রাচীন বাড়িটি। ঢালু পুরু ছাদ এবং অস্বাভাবিক ছোট ছোট জানালা, মাটি থেকে অনেক উঁচুতে যাদের অবস্থান, বাড়িটি ঘিরে রেখেছে ইটের মস্ত প্রাচীর। সাধারণ মানুষের বাসস্থানের চেয়ে দুর্গের সঙ্গেই এটার মিল বেশি। তবে এসব বিষয়ই ম্যালকমসনকে আকৃষ্ট করল বেশি। এরকম একটি জায়গাই আমি খুঁজছিলাম, মনে মনে বলল সে। এখানে থাকার সুযোগ পেলে খুশিই হব। তার আনন্দ বর্ধিত হলো দ্বিগুণ যখন বুঝতে পারল বর্তমানে এখানে কেউ থাকছে না।
ডাকঘর থেকে এজেন্টের নাম ঠিকানা পেল ম্যালকমসন। ইনি মি. কার্নফোর্ড, স্থানীয় আইনজীবী এবং এজেন্ট। খুবই সদাশয় ভদ্রলোক। খোলা মনেই স্বীকার করলেন কেউ ওই বাড়িটি ভাড়া নিতে চায় জেনে তিনি যারপরনাই আনন্দিত। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল অনেকদিন ধরেই বাড়িটি খালি পড়ে আছে। ফলে ও বাড়ি নিয়ে আজগুবি সব কুসংস্কার সৃষ্টি হয়েছে।
তবে আজগুবি কুসংস্কার নিয়ে কোনো আগ্রহ প্রকাশ করল না ম্যালকমসন। কারণ জানে সে চাইলে অন্য লোকজনের কাছ থেকে এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে। সে এজেন্ট ভদ্রলোককে তিন মাসের আগাম ভাড়া দিয়ে রশিদ নিল। মি. কার্নফোর্ড তাকে এক বৃদ্ধার নাম বললেন যে ম্যালকমসনের ঘরকন্নার কাজ করে দেবে। বাড়ির চাবি পকেটে ঢুকিয়ে এজেন্টের ঘর থেকে বেরিয়ে এল সে। সোজা চলল সরাইখানায়, ল্যান্ডলেডির সঙ্গে দেখা করতে। ইনি ভারী হাসিখুশি এক ভদ্রমহিলা এবং অতিশয় সজ্জন। তার কাছে জানতে চাইল প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র কিনতে হলে কোন দোকানে যাবে। সে কোথায় উঠছে জানালে ভদ্রমহিলা বিষম চমকে গেলেন।
বিচারকের বাড়ি নিশ্চয় নয়। কথা বলার সময় ফ্যাকাশে হয়ে গেল তার চেহারা। ম্যালকমসন বাড়ির ঠিকানাটা বলল তবে নামটি জানাতে পারল না। তার কথা শেষ হলে মহিলা বললেন :
অয়ি, অয়ি, বুঝতে পেরেছি সেই বাড়িটাই! ওটা বিচারকের বাড়ি।
ম্যালকমসন সরাইউলির কাছে বাড়িটি সম্পর্কে জানতে চাইল। কেনই বা ওই বাড়ির নাম বিচারকের বাড়ি এবং কেন লোকে বাড়িটির বিপক্ষে কথা বলে। ভদ্রমহিলা জানালেন স্থানীয়ভাবে ওটি বিচারকের বাড়ি নামেই পরিচিত। কারণ অনেক বছর আগে কত বছর আগে তিনি নিজেও জানেন না, কারণ তিনি এসেছেন দেশের আরেক প্রান্ত থেকে, তবে তার ধারণা বাড়িটির বয়স একশো বা তার বেশি তো হবেই –ওখানে এক বিচারপতি বাস করতেন যিনি আসিজের কয়েদীদের জন্য ছিলেন মূর্তিমান আতঙ্ক। কারণ কঠিন সাজা দিতেন তিনি সবাইকে। তবে বাড়িটির বদনাম কেন রটে গেছে তা ল্যান্ডলেডি জানেন না। অনেককেই এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছেন। কেউ সদুত্তর দেয় নি। তবে সকলেরই ধারণা ওখানে অশুভ এবং ভয়ানক কিছু একটা আছে। ল্যান্ডলেডিকে যদি ড্রিংকওয়াটার ব্যাংকের সমস্ত টাকাও দেয়া হয় তবু তিনি ওই বাড়িতে এক ঘণ্টার জন্যও যাবেন না। তবে পরক্ষণে তিনি ম্যালকমসনের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলেন এসব কথা বলার জন্য।
আপনাকে এরকম কথা বলা আমার মোটেই উচিত হচ্ছে না, স্যার আপনি একজন তরুণ ভদ্রলোক- তবু বলি ওখানে একা গিয়ে থাকবেন বিষয়টি ঠিক ভালো ঠেকছে না আমার কাছে। আপনি যদি আমার ছেলে হতেন- এ কথা বলার জন্য মাফ চাইছি- আপনাকে আমি ওখানে একটি রাতও কাটাতে দিতাম না আর আমি নিজে তো যেতামই না। ভদ্রমহিলার আকুতি এবং আন্তরিকতা ছুঁয়ে গেল ম্যালকমসনকে। তার প্রতি মহিলার এহেন সদিচ্ছার প্রতি সাধুবাদ জানিয়ে সে বলল :
ডিয়ার মিসেস উইদ্যাম, আমাকে নিয়ে একদমই দুশ্চিন্তা করবেন না। আমি আমার পড়াশোনা নিয়ে এত ব্যস্ত থাকব যে রহস্যময় কোনোকিছু, আমার কাজে একেবারেই ব্যাঘাত ঘটাতে পারবে না।
ওর কাজগুলো এমন কঠিন এবং বিরস যে তার মনের কোনাতেও কোনো রহস্যময় বিষয় স্থান পাবার অবকাশ নেই। সে বলল, হার মোনিকাল প্রোগ্রেশন, পারমুটেশন অ্যান্ড কম্বিনেশন এবং ইলিপটিক ফাংশন আমাকে যথেষ্ট রহস্যের রসদ জোগায়!
ম্যালকমসন এরপর গেল সেই বৃদ্ধার কাছে যে তার বাসার গৃহস্থালী কাজকম্মগুলো করে দেবে। মহিলাকে নিয়ে বিচারকের বাড়িতে ফিরল সে বেশ কিছুক্ষণ ইন্টারভিউ করার পর। এসে দেখে মিসেস উইদ্যাম কয়েকজন লোক এবং ছেলে ছোঁকড়া নিয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করছেন। তাদের সঙ্গে নানারকম বাক্স পেটরা, একজন গাড়িতে করে বিছানাপত্তরও নিয়ে এসেছে। মিসেস উইদ্যাম ব্যাখ্যা দিলেন বিচারকের বাড়িতে চেয়ার টেবিলের অবস্থা ভালো থাকলেও গত পঞ্চাশ বছর ধরে ওখানে বিছানার কোনো ব্যবস্থা নেই। যাতে একজন তরুণ আরাম করে একটু শুতে পারে। তিনি বাড়ির ভেতরে উঁকি দিতে খুবই আগ্রহী; তবে কিছু একটার ভয়ে তিনি এতটাই ভীত যে সামান্য শব্দেও আঁতকে উঠে ম্যালকমসনের হাত খামচে ধরলেন এবং গোটা বাড়ি ঘুরে দেখার সময় একবারের জন্যও হাতখানা ছাড়লেন না।
