অবিশ্বাস্য ভয়ের একটা অনুভূতি আমাকে গ্রাস করল। আমি বড় শহরে বাস করে অভ্যস্ত –সেখানে ভূত-প্রেতের কোনও জায়গা নেই। কিন্তু স্যালি নামের প্রেতিনীর সত্যি অস্তিত্ব রয়েছে। এখন আর আমার কোনই সন্দেহ নেই যে ও-ই একটু আগে বজ্রপাতের ঘটনাটি ঘটিয়েছে। আমার মন আমাকে সাবধান করে দিল যদি আমরা লন পার হওয়ার চেষ্টা করি অশুভ শক্তিটা আবার বাধা দেবে হয়তো আগেরবারের চেয়েও ভয়ঙ্করভাবে।
পর্চে দাঁড়িয়ে আমার বাড়িটিকে চোখের সামনে ধ্বংস হতে দেখে অসুস্থবোধ করতে লাগলাম আমি। লন, ফুলগাছ, ঝোঁপঝাড় কিছুই আস্ত রইল না। ভয়ানক বৃষ্টি আর শিলা পড়ে সবকিছু একেবারে তছনছ হয়ে গেল। কাঁচ ভাঙার তীব্র ঝনঝন জানিয়ে দিল আমার নতুন গ্রীন হাউসটিকেও শেষ করেছে স্যালি।
আমি এক ছুটে বাড়িতে ঢুকলাম; গোঙাতে গোঙাতে পিয়েরে আমার পিছু নিল। একা থাকতে ভয় করছে ওর। আমাদের পেছনে এত জোরে বন্ধ হয়ে গেল দরজা যে সেই শব্দে লাফিয়ে উঠল কলজে।
বাতাসে স্যালির শরীরে গন্ধ, ঝড়ের তাণ্ডব ছাড়িয়ে তার যৌনাবেগ যেন দপদপ করছিল। ভয় এবং অনিশ্চয়তা নিয়ে আমি সিঁড়ি গোড়ায় দাঁড়িয়ে রইলাম। অবশেষে গলা বাড়িয়ে ডাক দিলাম, স্যালি! স্যালি লোল্যান্ড, কোথায় তুমি?
জবাবে শুধু জানালার গায়ে আছড়ে পড়া বাতাসের হুংকার আর শাটারের কাঁচকোচ আওয়াজ শোনা গেল।
আবারও ডাকলাম আমি। কাজটা এমন নির্বোধের মতো এবং মেলোড্রামাটিক মনে হচ্ছিল যে নিজেকে স্রেফ একটা গবেট লাগছিল। তবে আমার ভয়ে প্রায় অসার হয়ে যাওয়া মস্তিষ্কের একটি অংশ জানত স্যালি আমার কথা শুনছে… কোথাও বসে। আমি ওক কাঠের প্রকাণ্ড দরজাটির দিকে ঘুরলাম। মনে হলো চাপা গলায় যেন হেসে উঠল ও। বাতাসে ভেসে আসা জলের ছাঁট লেগে পুরানো কাঠ খানিকটা ফুলে উঠেছে তবে কপাট খুলবে না- সে আমরা যতই ঠেলাঠেলি কিংবা টানাটানি করি না কেন। অবশ্য চেষ্টা করার আগেই বুঝে গেছি স্যালি আমাদের পালাবার সমস্ত পথ বন্ধ করে রেখেছে।
আমি সিঁড়ি গোড়ায় গিয়ে দাঁড়ালাম। স্যালি, আমাদের যেতে দাও… প্লিজ, আমাদের ছেড়ে দাও।
আবার ভেসে এল ভৌতিক চাপা হাসি– তবে এবারে আগের চেয়ে জোরে। সেই হাসি যেন আতঙ্কের বিরাট একটা হাত হয়ে আমার নাড়িভুঁড়ি চেপে ধরল।
পিয়েরে অসহায়ের মতো সিঁড়ি গোড়ায় পড়ে গেল। সে ভয়ানক কাঁপছে। ভয়ে বারবার মুঠো খুলছে এবং বন্ধ করছে।
স্যালি, হাঁক ছাড়লাম আমি। আমার কথা শোনো… প্লিজ। প্রথমে কিছু শোনা গেল না, তারপর ঝড়ের শব্দ ছাপিয়ে আমি শুনতে পেলাম ওটা।
গুণগুণ করছে কেউ অমানুষিক এবং প্রচণ্ড ভীতিকর একটা গুণগুণানি যেন একটা ব্ল্যাক উইডো মাকড়সা তার দুর্ভাগা সঙ্গীকে নিজের জালে আটকে ফেলে তাকে গলাধঃকরণ করতে যাচ্ছে।
এখন একটাই মাত্র কাজ আছে করার।
আমি পিয়েরেকে মেঝেতে ফেলে রেখে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলাম।
গুণগুণানির সুরটা বদলে গেল… যে গাইছে সে যেন একটু অবাকই হয়েছে। ভয়ে আমার কলজে উড়ে গেছে। কিন্তু স্যালির সঙ্গে মুখোমুখি হতে হবে ওরই নিজস্ব যুদ্ধক্ষেত্রে।
মাস্টার বেডরুমে ঢুকে আমি শুয়ে পড়লাম। বাইরে ম্যানিয়াকের মতো দাপাদাপি করছে ঝড়, বাড়ির অপরপাশের ম্যাগনেলিয়া গাছটি এবারে ধরাশায়ী হলো ওয়েস্ট উইং এবং গোটা কিচেনসহ।
আমার ঘরের দরজা খুলে গেল। সে ওখানে দাঁড়িয়ে আছে, একপাশে হেলানো মাথা, বিস্মিত।
হ্যালো, স্যালি লোল্যান্ড, আমি উচ্চস্বরে ডাকলাম ওকে।
এক সেকেন্ডের জন্য ঝিকিয়ে উঠল সবুজ চোখ, তারপর সরু হয়ে এলো। সে বিস্ময় এবং অনিশ্চয়তা নিয়ে প্রশ্ন করল, তুমি ভয় পাওনি?
আমি ডানে বামে মাথা নাড়লাম, তার পাতলা নেগলিজির ওপর আঠা হয়ে লেগে আছে দৃষ্টি। আতঙ্ক সত্ত্বেও আমার ভেতরে জেগে উঠতে লাগল কামনা। আমি বিছানা থেকে নেমে ওর দিকে এক কদম বাড়ালাম। বাইরে চিৎকার দিল বাতাস, ছাদের ওপর কী যেন পড়ল দুম করে, এতই জোরে যে গোটা বাড়ি কেঁপে উঠল।
স্যালি এক হাত তুলে ইশারা করল আমাকে থামতে। ড্যান, ওর গলার স্বরে এমন অনিশ্চয়তার সুর আগে কখনও শুনিনি। তুমি এখানে কেন এসেছ?
তোমার কী মনে হয়?
বলো আমাকে, গর্জন করল স্যালি।
কারণ আমি তোমাকে ভালবাসি।
আঘাত পাওয়া, হতভম্ব ছোট্ট মেয়েটির মতো স্যালি বলল, আমাকে কেউ কোনদিন ভালবাসেনি… শুধু আমার শরীরটাকে ভালবেসেছে! তুমিও তাদের থেকে আলাদা নও… অন্তত আমি তা মনে করি না।
তুমি আমাকে ভুল বুঝেছ, স্যালি। আমি তোমার সব কথাই জানি… গত একশ বছরে কারা তোমার প্রেমিক ছিল তাদের কথা। যদিও তুমি মৃত। কিন্তু আমার কাছে তুমি যে কোনও নারীর চেয়েও বেশি জীবিত। আমি সবকথাই জানি আমি তোমাকে এখনও ভালবাসি। হঠাৎ বুঝতে পারলাম আমি যা বলছি তা সত্যি এবং আমার এ উপলব্ধি হয়তো প্রকাশও পেল আমার গলার স্বরে।
স্যালি আমার চোখে গভীরভাবে তাকাল, তার চাউনি যেন ভেদ করে গেল আমার হৃদপিণ্ড, তারপর সে ঠোঁট কামড়ে ধরে পিটপিট করল চোখ অশ্রু ঠেকাতে।
আমাকে কেউ কোনদিন কখনও ভালবাসেনি, ড্যান।
আমি ওকে আমার বুকে নিতে এগিয়ে গেলাম। কিন্তু সে চট করে একপাশে সরে গিয়ে আমাকে ধাক্কা মারল। দাঁড়াও, প্লিজ… আমাকে একটু ভাবতে দাও।
