বোস্টনে যাওয়াটাই ছিল ভুল– এমন ভুল জীবনে করিনি। নাটক হলো ফ্লপ– এমনই ঢিলা গল্প যে প্রথমবার পর্দা পড়ার আগেই অর্ধেক দর্শক চলে গেল। আর আবহাওয়াটাও ছিল বিশ্রী হোটেল রুমটা ভয়ানক গরম এবং মড়ার ওপর খাড়ার ঘার মতো ফুড পয়জনিংয়ে আক্রান্ত হলাম আমি।
বেটসভিলে যখন ফিরে এলাম, শহরের আকাশ কালো মেঘে থমথম করছে, ঝড়ের পূর্বাভাস। সোজা গেলাম সংবাদপত্রের অফিসে। আমাকে ঢুকতে দেখে উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠল টড, ধাক্কা লেগে একটা চেয়ার পড়ে গেল । ড্যান, চেঁচাল সে। একটা খবর পেয়েছি। সে মদ খাচ্ছিল।
গুড, বললাম আমি।
শোনো- ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। তুমি এই মেয়েটাকে কোথায় দেখেছ?
সেটা বলা ঠিক হবে না, টড।
আমার দিকে আড়চোখে তাকাল টড। বললে বলবে না বললে নাই। ডেস্ক ড্রয়ারে হাত বাড়িয়ে একটি ছবি বের করল। বাড়িয়ে দিল আমার দিকে, উত্তেজনায় কাঁপছে হাত, এই মেয়েটা? প্রায় আবছা গলায় জিজ্ঞেস করল ও।
হ্যাঁ, সেই মেয়েটাই… তবে ছবিতে তার পরনে নাটকের সাজসজ্জা! আমি ভালো করে তাকালাম; আরি, একে দেখতে লাগছে যেন স্কারলেট ওহারার ভূমিকায় অভিনয় করছে।
আমার দিকে এক নজর তাকিয়েই তার জবাব পেয়ে গেল টড। সে একটু নেচে নিল, প্রথমে এক পায়ে, তারপর অন্য পায়ে লাফাতে লাফাতে বলল, জানতাম… আমি জানতাম! ওই বাড়িতে ও এসেছিল, তাই না! মাথায় লাল চুল এবং ফিগারটা এরকম… শূন্যে হাতের ভঙ্গিমায় সে খাজভাঁজগুলোর আকার দেখাল।
আমি ধপাশ করে বসে পড়লাম চেয়ারে, সামনে কী আসছে ভাবতে গিয়ে হিম হয়ে গেল বুক। ঠিক আছে, টড। তুমি কী জানো, বলো?
এ সেই-স্যালি! তার বাবার পদবি ছিল লোল্যান্ড। স্যালি লোল্যান্ড। ঈশ্বর আমাদের মঙ্গল করুন। তুমি ওকে দেখেছ! সে হাসতে হাসতে চড় মারল নিজের পায়ে। তুমি এখন নিশ্চয় বিশ্বাস করবে যে ভূত আছে, আমার গম্ভীর মুখ দেখে থেমে গেল তার হাসি। বলল, আমি দুঃখিত, ড্যান। তোমাকে নিয়ে আমি আমি মজা করতে চাইনি। আমি কোনও কথা না বলে চলে আসছি, তখনও সে বিড়বিড় করে ক্ষমাপ্রার্থনা করে চলছে।
নীলচে কালো মেঘ স্তূপ হয়ে আছে গোটা দিগন্ত জুড়ে, আকাশে কীসের যেন অশুভ সংকেত। যখন আমি বাড়ি পৌঁছেছি ততক্ষণে নদীর দিক থেকে গুড়গুড় মেঘের ডাক ভেসে আসতে শুরু করেছে। পিয়েরেকে কাছে পিঠে কোথাও দেখতে পেলাম না। দোতলায় উঠে এলাম আমি। জিনিসপত্র বাঁধাছাদা শেষ করেছি মাত্র, হাউহাউ করে হামলে পড়ল ঝড়।
শাটারের ভেতর থেকে গোঙাতে লাগল বাতাস, অঝোর ধারায় শুরু হয়ে গেছে বর্ষণ, বুনো জন্তুর মতো ছাদের ওপর যেন আঁচড়াতে, খামচাতে লাগল। দপদপ করে উঠল বাতিগুলো, নিভু নিভু হয়ে এল, তারপর আবার জ্বলে উঠল পূর্ণশক্তিতে। বাইরে কান ফাটানো শব্দে বাজ পড়ছে… আমি যেন হঠাৎ করেই একটা গোলাগুলির মধ্যে পড়ে গিয়েছি।
কী করব মাথায় আসছিল না তবে এটুকু বুঝতে পারছিলাম এ বাড়ি থেকে এখুনি পালাতে হবে। তারপরের করণীয় সম্পর্কে পরে চিন্তা করা যাবে। চাকরগুলো কাজ শেষে চলে যাওয়ার আগে স্টাডিরুমে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমি ফায়ারপ্লেসের সামনে গিয়ে বসলাম। ভাবছি কী করা যায়। আমার মাথাটা কেন জানি কাজ করছিল না, ভোঁতা লাগছিল সবকিছু। এমনসময় পিয়েরের গোঙানি শুনতে পেলাম।
দৌড় দিলাম সিঁড়িতে। ফার্স্ট ল্যান্ডিংয়ে আধখাড়া অবস্থায় দাঁড়িয়ে। আছে পিয়েরে, রক্তশূন্য মুখ, একেবারেই বিধ্বস্ত চেহারা। পাগলা বাছুরের মত বনবন করে ঘুরছে চোখের মণি। ড্যান, গলা নয় যেন ব্যাঙের ডাক। ভেঙ্গে গেছে স্বর। এক কদম এগোল আমার দিকে, মিস করল সিঁড়ি এবং গড়াতে গড়াতে নেমে এল নিচে।
পিয়েরে, মাই গড, কী হলো তোমার?
মেয়েটা.. ওই মেয়েটা, শিউরে উঠল ও, শরীর এমনভাবে কাঁপছে যেন হাই ভোল্টেজের বিদ্যুতের তার স্পর্শ করেছে।
সিধে হওয়ার চেষ্টা করল ছোটখাট ফরাসি মানুষটা। আমার ট্রাউজার্স খামচে ধরল। ওকে দূর করো। ও যেন আর আমার কাছে আসতে না পারে। ফোঁপাতে লাগল সে।
ওকে ধরে একটা ঝাঁকি দিলাম যাতে হুঁশ ফিরে আসে।
আসল কথায় এসো। কী হয়েছে?
ও… ও গত রাতে আমার বিছানায় এসেছিল… তারপর সারারাত ধরে… ও, হিস্টিরিয়া রোগীর মতো চোখ ঘোরাল পিয়েরে। আমি অত বলবান পুরুষ নই, ড্যান। ও আমাকে মেরে ফেলবে! আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলো, প্লিজ!
আমি ওকে টেনে তুললাম। ঠিক আছে, চলো যাই। তোমার ব্যাগট্যাগ গুছিয়ে নাও।
ওর আতংকটা ফিরে এল। না, না। ব্যাগ গোছাতে হবে না। এখুনি চলল। ও ওখানে।
ওর ভয় সংক্রামক। আমিও যেন স্যালির উপস্থিতি অনুভব করছিলাম; আর কোনও উষ্ণ অনুভূতি নয়, ভীতিকর কিছু একটা, যেন খুলে দেয়া হয়েছে নরকের দুয়ার এবং ওখানকার বাসিন্দারা রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে পড়েছে শিকারের সন্ধানে।
আবার তেজ হারাতে লাগল বাতিগুলো–ত্রিশ সেকেন্ড স্তিমিত হয়ে রইল– তারপর ধীরে ধীরে নিভে গেল। আলো বলতে শুধু ফায়ারপ্লেসের আগুনের আভা।
ড্যান, ভয়ে চিৎকার দিল পিয়েরে। ও আসছে!
ঠিক আছে ঠিক আছে! ওকে কম্পিত গলায় সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করলাম। আমি ব্যাগ ব্যাগেজ নিয়ে গাড়িতে যাচ্ছি।
কিন্তু পিয়েরে আমার সঙ্গে সেঁটে রইল। বজ্রের আলোয় দেখলাম লন ভেসে যাচ্ছে জলাতে। মুহূর্তেই দুজনে কাকভেজা। হঠাৎ বাড়ির পাশের ম্যাগনোলিয়া গাছের ওপর তীব্র আলোর একটা ঝলকানি ছুটে এসে ঝলসে দিল আমার চোখ। আঁধারে তখনও সয়ে ওঠেনি চাউনি, পলকে গাছটা বিকট শব্দে হুড়মুড় করে পড়ে গেল আমার গাড়ির ওপর, কয়েক ইঞ্চির জন্য রক্ষা পেলাম দুজনেই।
