আমি হেসে মেরির দিকে তাকালাম। সে মৃদু বাতাস বয়ে যাওয়ার মতো নরম গলায় বলল, আমার মা… ।
আমি হাত বাড়িয়ে এগিয়ে গেলাম সামনে লম্বা চেহারার ভদ্রমহিলাটির দিকে। তিনি ছায়া থেকে বেরিয়ে এক কদম বাড়লেন। আমার বাড়ানো হাতখানা দেখেও যেন দেখলেন না, তার মুখে ফুটল অপূর্ব হাসি এবং মেরির মতো নিচু গলায় বললেন, আমার মেয়ের বান্ধবী হিসেবে তোমাকে সুস্বাগতম!
আমি চোখের কোন দিয়ে এতক্ষণ লক্ষ করছিলাম মেরিকে। মনে হলো তার মায়ের কথা শুনে সে যেন স্বস্তি পেল, চেহারা থেকে দূর হয়ে গেল আড়ষ্টতা।
আমার বাবা, মেরির কণ্ঠে এবারে আশ্চর্য সুখি সুখি ভাব। বছর চল্লিশের লম্বা-চওড়া, ভারিক্কি চেহারার এক ভদ্রলোক আমার দিকে এগিয়ে এলেন ঠোঁটে ভদ্রতার হাসি নিয়ে। তিনিও আমার বাড়ানো হাতখানা অগ্রাহ্য করলেন তবে অত্যন্ত আন্তরিক গলায় বললেন, তোমার সঙ্গে পরিচিত হয়ে খুশি হলাম, সোনা। মেরি মাঝেমধ্যেই তোমার কথা বলে।
মেরি এবার বলল, এ হলো ললানি… ওকে ছবিতে দেখেছিলে, মনে আছে?
ছবিতে যে সুদর্শন তরুণটিকে দেখেছিলাম সে হাসিমুখে সামনে বাড়ল।
এই তাহলে লিজ! বলল সে। তোমার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ইচ্ছে ছিল অনেকদিন যে মেয়ে কিনা ইঁদুর ধরতে ভয় পায় না.. মনে পড়ে? মেরি বলেছে তুমি একবার জ্যান্ত ইঁদুর রেখে দিয়েছিলে তোমাদের প্রফেসরের ডেস্কে। হাসি হাসি মুখ করে সে কথা বললেও ফিসফিস করছিল বলে আমার কাছে একটু বেখাপ্লাই লাগছিল। এবং লক্ষ করলাম আমিও ওদের সঙ্গে গলা নামিয়ে কথা বলতে শুরু করেছি। এদের কারও মধ্যেই আন্ত রিকতার অভাব নেই তবু কেন সকলে এমন অস্বাভাবিক চুপচাপ। তবে সবচেয়ে অবাক হলাম মেরির ফিসফাস শুনে অথচ ও কলেজে থাকতে সবসময় উচ্চস্বরে কথা বলত, ঘর ফাটিয়ে হাসত।
ও বেটি, বলল মেরি। অদ্ভুত একটা আনন্দের আভা জ্বলজ্বল করছে। চেহারায়।
বছর বারোর এক বালিকা ছায়া থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এসে ভদ্রতাসূচক সৌজন্য দেখাল।
আর ও বিল, বলল মেরি। গোলগাল চেহারার একটি বাচ্চা তার বোনের পেছন থেকে উঁকি দিয়ে খিলখিল করে হাসতে লাগল। তবে জোরে নয়, আস্তে।
কী সুন্দর বাচ্চা! বললাম আমি।
বাচ্চাটি বেটির পেছন থেকে বেরিয়ে এসে মাথাটা একদিকে কাত করে বড় বড় নীল চোখ মেলে আমাকে দেখতে লাগল। আমি ওর কোঁকড়া চুলে ভরা মাথাটায় আদর করে হাত বুলাতে যেতেই সে ঝট করে পিছিয়ে গেল। যেন অপরিচিত মানুষের স্পর্শ পেতে অভ্যস্ত নয়। আমি অবশ্য অবাক হলাম না। অচেনা লোকদের দেখলে বাচ্চারা এরকম করেই থাকে। তবে ওকে আর আদর করার চেষ্টা করলাম না।
.
ওদের সঙ্গে খানিক কথা বলেই পরিবারটিকে বেশ ভালো লেগে গেল আমার। মেরি জিজ্ঞেস করল আমি আমার রুমে গিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে নেব কিনা। তারপর ও রাতের খাবারের জন্য ডাকবে। আমি মেরির পিছু পিছু সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলাম দোতলায়। একটা জিনিস লক্ষ করেছি মেরি ছাড়া তার পরিবারের অন্য সকল সদস্যের শরীর স্বাস্থ্য বড্ড খারাপ। ওর বাবা থেকে শুরু করে ছোট ভাই পর্যন্ত সবার গায়ের রঙ ফ্যাকাশে, যেন প্রবল রক্তশূন্যতায় ভুগছে। হয়তো আমার চোখের দেখার ভুলও হতে পারে। মোমের স্বল্প আলোয় ওদের গায়ের ত্বক খড়িমাটির মতো লেগেছে।
আটটায় ডিনার, মেরি হেসে বলল আমাকে। তারপর চলে গেল আমাকে হাত মুখ ধুয়ে তাজা হওয়ার সুযোগ দিয়ে।
তবে আটটার একটু আগেই আমি নেমে এলাম নিচতলায়। দেখি হলঘরে কেউ নেই। নারীসুলভ কৌতূহলে একটি প্রকাণ্ড আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দেয়াল জোড়া আয়না। আমার পেছনের হলঘরের পুরো ছবি প্রতিফলিত হচ্ছে। মোমবাতির আলো পড়েছে কাঁচে। আয়নায় নিজেকে একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে নিলাম। তারপর পেছন ফিরে তাকাতেই দেখি বিল দাঁড়িয়ে আছে ওখানে। বড় বড় নিষ্পাপ চোখ জোড়া ঝিকমিক করছে।
হাই, ওর দিকে তাকিয়ে হাসলাম আমি। কেমন লাগছে আমাকে বলো তো? আমি আয়নার দিকে ফিরলাম এবং দারুণ চমকে উঠলাম।
বিরাট কাঁচের আয়নায় নিজেকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি আমি, হলঘরের অনেকখানি অংশেরও প্রতিফলন ঘটেছে ওখানে। কিন্তু বাচ্চাটাকে দেখা যাচ্ছে না আয়নায়! আমার গা শিরশির করে উঠল। পেছন ফিরে তাকালাম। ওই তো দাঁড়িয়ে আছে ও আগের জায়গায়। এবারে আয়নায় তাকালাম। না, বিল নেই। আয়না জুড়ে শুধু আমি! এটা আয়নার কোনো কারসাজি নয় তো? ভাবলাম আমি। তাই হবে। কারণ পেছন ফিরলেই বাচ্চাটাকে দেখতে পাচ্ছি আর আয়নায় তাকালে সে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। এটা আয়নার কারসাজি ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না। হয়তো এরকম মজা দেখতেই বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে এ আয়না।
তবে আয়নার কারসাজি নিয়ে বেশিক্ষণ মাথা ঘামানো বা চমকানোর সুযোগ হলো না মেরি ডিনার খেতে ডাক দেয়ার কারণে। আমি বিলের দিকে হাত বাড়ালাম ওকে নিয়ে ডাইনিংরুমে যাব বলে। কিন্তু বিল দুষ্ট হেসে আমার হাত ধরল না। ছুট দিল ডাইনিংরুমে।
.
রান্না চমৎকার হয়েছে। পরিবারটির সঙ্গে গল্পগুজবও হলো বেশ। তবে ওরা সবাই আগের মতোই নিচু গলায় কথা বলে গেল।
খাবার পরিবেশন করল মেরি। রান্না ঘর থেকে ছুটে ছুটে জিনিসপত্র নিয়ে আসতে লাগল। ওদের হয়তো আর্থিক সংকট চলছে তাই কাজের
