নোক রাখতে পারেনি, ভাবলাম আমি। আমি বেশিরভাগ কথা বললাম। লোনি এবং মেরির সঙ্গে। বাচ্চাটা এবং বেটি আনন্দচিত্তে আমাদের গল্প শুনতে লাগল। মেরির বাবা-মা মাঝে মধ্যে আমাদের আড্ডায় অংশ নিলেন দুএকটা মন্তব্য করে।
মেরি খাবার দাবার রান্না ঘর থেকে নিয়ে এসে আমাদের সঙ্গেই বসে পড়েছিল খেতে। তবে খাবার যা খাওয়ার আমি আর সে-ই খেলাম। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা খাবার প্রায় মুখেই তুলল না। বেশ কয়েকবার কাঁটা চামচে খাবার গেঁথে নিয়ে ঠোঁটে তুললেও পরে আবার তা আলগোছে নামিয়ে রাখল প্লেটে। খাওয়ার নামে আসলে তারা ভান করছিল। এমনকী বাচ্চাটা পর্যন্ত থালায় হাত ডুবিয়ে বসে আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল আর মাঝে মধ্যে মজার দুএকটা কথা শুনে খিলখিল হাসল।
খাওয়া শেষে আমরা লাইব্রেরি ঘরে গেলাম। মেরির সঙ্গে চলল কলেজ জীবনের স্মৃতিচারণ। মি. অ্যালিসন এবং তাঁর স্ত্রী বই পড়লেন, মাঝেমধ্যে আমাদের আলোচনায় অংশ নিলেন। হাসলেন। একে অন্যের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলেন। লোনি বাচ্চাটাকে কোলে নিয়েছে, বেটি বসেছে তার চেয়ারের হাতলের ওপর, আমাদের কলেজের দুএকটা বোকামোর গল্প শুনে হাসিতে কুটিপাটি হলো। তবে জোরে হাসল না, বলাবাহুল্য।
রাত এগারোটার দিকে আমাকে বারবার হাই তুলতে দেখে মেরি তাড়া লাগাল ঘুমাতে যাওয়ার জন্য। আমি বাধ্যগতের মতো শুয়ে পড়লাম বিছানায়। বেডসাইড টেবিলে একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে রেখে গিয়েছিল মেরি। একটা বই পড়তে লাগলাম। ঘুমানোর আগে বই না পড়লে ঘুম আসে না আমার।
.
বই পড়তে পড়তে ঝিমুনি এসে গিয়েছিল। হঠাৎ ঝাঁকি খেয়ে জেগে গেলাম। দেখি মোমবাতি তখনও জ্বলছে। আমি ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিতে যাচ্ছিলাম, এমন সময় একটা হালকা শব্দ আমার ঝিমুনিটাকে পুরোপুরি দূর করে দিল।
কেউ আমার দরজার হাতল ধরে ঘোরাচ্ছে। শব্দটা ওখান থেকে এসেছে।
আমি চট করে বিছানায় মাথা দিয়ে শুয়ে পড়লাম। ঘুমের ভান করলাম। যদিও সামান্য চোখ ফাঁক করে দেখছি কী ঘটছে।
আস্তে খুলে গেল দরজা। মিসেস অ্যালিসন ঢুকলেন ঘরে। কোনোরকম শব্দ না করে চলে এলেন আমার শিয়র পাশে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন আমার দিকে। আমি চোখ বুজে ফেললাম শক্ত করে যাতে চোখ পিটপট না করে। তবে একটু পরে চোখের পর্দা সামান্য ফাঁক করে দেখি তিনি দরজার দিকে এগোচ্ছেন। আমি গভীর ঘুমে বিভোর ভেবে সন্তুষ্ট। ভাবলাম উনি কামরা থেকে বেরিয়ে যাবেন কিন্তু তিনি দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং হলঘরে কাউকে যেন ইশারা করলেন ভেতরে আসতে।
মন্থর গতিতে এবং অবিশ্বাস্য নিঃশব্দে পা টিপে টিপে আমার ঘরে ঢুকলেন মি. অ্যালিসন, লোনি, বেটি এবং বাচ্চা। ওঁরা আমার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে এমন ব্যাকুলভাবে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন যে আমার মায়াই লাগল।
ইচ্ছে করছিল চোখ মেলে তাকাই এবং জিজ্ঞেস করি ওরা এত রাতে কেন আমাকে দেখতে এসেছেন। তবে চুপটি করে থাকাই ভালো মনে করলাম। দেখি ওঁরা কী বলেন। মধ্যরাতের এ অনুপ্রবেশ কিন্তু আমার ভেতরে কোনো ভীতির সঞ্চার করল না। বরং আমি আশ্চর্য শান্তি এবং নিরাপত্তা অনুভব করছিলাম, মনে হচ্ছিল সদাশয় দেবদূতেরা আমাকে পাহারা দিয়ে রাখছেন।
ওঁরা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন কোনো কথা না বলে। তারপর কিশোরীটি আমার দিকে ঝুঁকে এল, লেপের ওপর রাখা আমরা হাতে হাত বুলিয়ে দিল। সেই স্পর্শে আমি ভয়ানক চমকে গেলেও বহু কষ্টে নিয়ন্ত্রণে রাখলাম নিজেকে।
মেয়েটির হাত ভয়ানক ঠান্ডা- তার হাত শুধু শীতলই নয়, মনে হচ্ছিল তার গোটা অবয়ব থেকে বরফ ঠান্ডা একটা বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। যেন কেউ আমার গায়ে কনকনে নিঃশ্বাস ফেলছে। তার হাত এক মুহূর্তের জন্য আমার গায়ে ছিল। কিন্তু মনে হচ্ছিল কোনো ওজনই নেই ওই ভয়ানক। ঠান্ডা হাতে!
তারপর ওঁরা সবাই, মুখে স্নেহ ও ভালোবাসার হাসি, কোনো কথা না বলে এক লাইনে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলেন খোলা দরজা দিয়ে। ওঁরা কেন এলেন, কী উদ্দেশ্যে কিছুই বোধগম্য হচ্ছিল না আমার। ওদের রহস্যময় আগমনের কারণ ভাবতে ভাবতে কখন নিদ্রাদেবীর কোলে চলে গিয়েছি। জানি না।
.
পরদিন সকালে আমার রুমেই নাশতা নিয়ে এল মেরি। আমি খাচ্ছি, ও গল্প করতে লাগল। আমি ধীরে সুস্থে পোশাক পরে নিলাম। দশটার ট্রেন ধরব। ট্রেন ছাড়ার সময় কাছিয়ে এলে মেরিকে জিজ্ঞেস করলাম ওর পরিবারের লোকজন কোথায় কারণ গত রাতের পর তাদের কাউকে কাছে পিঠে দেখতে পাইনি। আমার মুখে ওর বাবা-মা-ভাই-বোনের প্রশংসা শুনে আনন্দে উদ্ভাসিত হলো মেরির চেহারা। তবে আমার পরের কথাটি শুনে উজ্জল আভাটুকু ম্লান হয়ে গেল। আমি কিন্তু কিছুই বলিনি। শুধু বলেছি যাওয়ার আগে ওদের কাছ থেকে বিদায় নিতে চাই।
সেই অদ্ভুত, দুর্বোধ্য ভাবটা আবার ফিরে এল মেরির চেহারায়। ওরা.. চলে গেছে। টেনে টেনে ফিসফিস করে বলল ও। আমি ওর দিকে হতবুদ্ধির মতো তাকিয়ে আছি দেখে যোগ করল, মানে… ওরা নেই। রাতের আগে… আর ফিরছে না। শেষ কথাটা এমন আস্তে উচ্চারণ করল প্রায় শোনাই যায় না।
কী আর করা। মেরিকে বললাম আমার হয়ে সে যেন তার পরিবারের সদস্যদের ধন্যবাদ এবং বিদায় শুভেচ্ছা জানিয়ে দেয়। মেরিকে দেখে মনে হলো না ও আমাকে রেল স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দেবে। কাজেই একাই রওনা হতে হলো। স্টেশনে পৌঁছে দেখি ট্রেন লেট। আমি টিকেট কেটে স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে খেজুরে আলাপ জুড়ে দিলাম সময় কাটাতে।
