ভুরুতে ভাঁজ পড়ল আমার। বুড়োর কথা শুনে মনে হচ্ছে সে যেন চায় আমার বান্ধবীর বাড়িতে গিয়ে উঠি। অবশ্য মফস্বল শহরে অনাহুত অতিথিদের আকস্মিক আগমন অনেকেই খুব একটা আন্তরিকভাবে মেনে নেয় না শুনেছি। কিন্তু আমি তো যেতে চাইছি আমার বান্ধবীর বাসায়। তাতে এ বুড়োর সমস্যা কী? আমি স্টেশন মাস্টারের দিকে শীতল চোখে তাকালাম।
আপনি পারলে ওর ঠিকানাটা বলে দিন, কঠিন গলায় বললাম আমি।
বুড়ো ঠিকানাটা বলল। তবে অনিচ্ছাসত্ত্বে।
শহরের শেষ প্রান্তে, বড় সাদা বাড়িটাতে মেরি অ্যালিসনের নিবাস, বলা হয়েছে আমাকে। ওর সঙ্গে শেষ যেবার দেখা হয়েছিল সেই স্মৃতি মনে পড়ছে। মেরি ছিল হাসিখুশি, আন্তরিক স্বভাবের মেয়ে। পরিবার অন্তপ্রাণ। ও একবার ওর বাড়ি, বাবামা এবং ভাইয়ের একটা ছবি দেখিয়েছিল। তাদের চেহারা এখন অবশ্য মনে নেই। আমার প্রাক্তন রুমমেট ও বন্ধুর সঙ্গে দীর্ঘদিন পরে দেখা হচ্ছে, সেই আগ্রহে আমার হাঁটার গতি বেড়ে গেল।
.
অবশেষে খুঁজে পেলাম বাড়িটি। লম্বা লম্বা থামের ওপর দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন কলোনিয়াল ম্যানসনটি। বিশাল। তবে ঝোঁপঝাড়, আগাছা এবং প্রকান্ড প্রকান্ড সাদা ওক গাছ রাস্তা থেকে প্রায় ঢেকে রেখেছে প্রাসাদোপম বাড়িটি, যেন লুকিয়ে আছে বাকি জগৎ থেকে। বাড়িটির প্রচুর সংস্কার দরকার, সেইসঙ্গে বাগানেরও। দেখে মনে হচ্ছে এক সময় বাগানের চেহারা সুন্দরই ছিল। এখন লম্বা লম্বা ঘাস আর আগাছায় বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা।
আমি শতাব্দী প্রাচীন বাড়িটির সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলাম ওপরে। দরজার হাতলে পিতলের ভারী কড়া লাগানো। তিন বার কড়া নাড়ার পরে অতিকায় দরজাটি সামান্য খুলে গেল। আমার কলেজের বান্ধবীটি দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে রইল। আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে কোনো কথা নাবলে। আমি হেসে ওর দিকে বাড়িয়ে দিলাম হাত। সে আস্তে আস্তে আমার হাতখানা ধরল। তার চেহারা আগের মতোই আছে, শুধু সর্বদা চঞ্চল ঝকঝকে নীল চোখজোড়ায় সেই স্বতঃস্ফূর্ততা উধাও, কেমন স্বরাচ্ছন্ন। চাউনি। ওর আচরণেও কেমন একটা পরিবর্তন চলে এসেছে লক্ষ করলাম। ছটফটে মেয়েটা কেমন ঝিম মেরে গেছে। অস্বাভাবিক চুপচাপ। আমার দিকে অনেকক্ষণ কুয়াশাচ্ছন্ন চোখে চেয়ে থাকল নিরবে। তারপর খুব আস্তে আস্তে, অবাক গলায় বলল, লিজ! লিজ! আমার আঙুলগুলো শক্ত মুঠোয় চেপে ধরল যেন ভয় পাচ্ছে আমি অকস্মাৎ উধাও হয়ে যাব। তোমাকে… তোমাকে দেখে খুব ভাল লাগছে। ঈশ্বর! কীভাবে… পথ চিনে এখানে এলে?
আমি আসলে ট্রেন মিস করেছি। মানে হাওয়া খেতে নেমেছিলাম। স্টেশনে ফিরে দেখি চলে গেছে ট্রেন। বললাম আমি। তবে ট্রেন মিস করে ভালোই করেছি… আমার হঠাৎ মনে পড়ল তুমি এখানেই থাকো। তাই চলে এলাম।
আমার দিকে কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল মেরি হাতটা ধরে রেখে। আর কাল সকাল দশটার আগে আটলান্টা যাওয়ার কোনো ট্রেন নেই, একটু ইতস্তত গলায় যোগ করলাম আমি, তারপর হেসে উঠলাম। আমাকে ভেতরে আসতে বলবে না!
ও হ্যাঁ.. অবশ্যই। অস্বাভাবিক গলায় বলল মেরি। যেন আমাকে ঘরে আসতে বলার বিষয়টিই তার মাথায় ছিল না। এসো!
প্রকাণ্ড হলঘরে প্রবেশ করলাম আমি। মেরির উদ্ভট আচরণ আমাকে অবাকই করেছে। কলেজে সে ছিল আমার প্রিয় বান্ধবী, তাহলে কেন এমন আড়ষ্টতা? ওর আচরণ দেখে মনে হয়েছে বাড়িতে ঢুকতে চাওয়ায় সে মহা বিব্রত, যেন আমি একজন অচেনা মানুষ, অন্য গ্রহ থেকে এসেছি! হয়তো আমার অপ্রত্যাশিত আগমন ওকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে, নিজেকে বোঝাতে চাইলাম। কিন্তু ব্যাখ্যাটি মেনে নিল না আমার জন্য।
তোমাদের বাড়িটি পুরানো হলেও ভারী সুন্দর! ওকে সহজ করে তুলতে স্বতঃস্ফূর্ততা ফোঁটালাম কণ্ঠে। তবে অস্বাভাবিক নিরব বাড়িটি আমাকে একটু অস্বস্তিতেই ফেলে দিল। মুখ থেকে ফস করে বেরিয়ে এল, এত বড় বাড়িতে তুমি নিশ্চয় একা থাক না?
আমার দিকে এমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাল মেরি যার অর্থ ঠাহর হলো না। খুবই নিচু গলায়, আমার শুনতে বেশ বেগ পেতেই হলো, বলল, আরে না!
হেসে উঠলাম আমি। তা তো বটেই! বোকার মতো হয়ে গেল প্রশ্নটা। তা অন্যরা সবাই কই?
আমি মাথা থেকে খুলে নিলাম হ্যাট। চারপাশে চোখ বুলালাম। আসবাবগুলো শতাব্দী প্রাচীন, দেয়ালে একটা ঝাড়বাতিদান আছে, তাতে কয়েকটি মোম জ্বলছে। ওই মোমের আলোটুকুই ভরসা। বৈদ্যুতিক কোনো বাতির ব্যবস্থাই নেই। মোমের আলো গাঢ় ছায়া ফেলেছে দেয়ালে- দপদপ করছে, নড়ছে। যেন জ্যান্ত। এসব দৃশ্য দেখে গা ছমছম করার কথা কিন্তু পুরানো বাড়িটির সর্বত্র একটা শান্তি ছড়িয়ে আছে যেন। তবে একই সঙ্গে বড় রহস্যময়ও লাগল। মনে হলো অন্ধকার কোণগুলো থেকে অদৃশ্য চোখ দেখছে আমাদেরকে।
সবাই কোথায়? শুয়ে পড়েছে? আবার করলাম প্রশ্নটি প্রথমবারে ও শুনতে পায়নি ভেবে।
ওরা আছে এখানেই, সেই অদ্ভুত ফিসফিসে গলায় জবাব দিল মেরি যেন জোরে কথা বললে ঘুমন্ত কেউ জেগে যাবে।
ও যেদিকে ইঙ্গিত করেছে সেদিকে তাকালাম। এবং চমকে উঠলাম সামান্য। ঘরে যখন ঢুকি ছোট এ দলটিকে লক্ষই করিনি! ওরা মোমবাতির আলো থেকে খানিকটা দূরে, প্রায়ান্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে গাদাগাদি করে । স্থির। নির্নিমেষ চাউনি।
