ড. জেফারস দ্রুত সিলিন্ডারের মুখ বন্ধ করলেন। বন্ধ জানালাগুলো খুলে দিলেন। তারপর দৌড়ে গেলেন ডেভিডের কাছে।
ঠান্ডা হয়ে আছে শরীর। অনেক আগেই মারা গেছে ডেভিড।
কাশতে কাশতে ঘর থেকে বেরোলেন ডাক্তার। চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় পানি ঝরছে। ডেভিড কিছুতেই ওই সিলিন্ডারের মুখ খোলেনি। ঘুমের মধ্যে ওর হাঁটার অভ্যাস আছে, বলেছিল অ্যালিস। কিন্তু যে পরিমাণ ঘুমের ওষুধ ডাক্তার ওকে খাইয়েছেন তাতে দুপুর পর্যন্ত ডেভিডের অঘোরে। ঘুমাবার কথা। সুতরাং এটা আত্মহত্যাও হতে পারে না। তাহলে কি…!
হলঘরে মিনিট পাঁচেক পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন ড. জেফারস। তারপর এগোলেন নার্সারী রুমের দিকে। দরজা বন্ধ। ধাক্কা দিয়ে খুললেন তিনি দরজা। দাঁড়ালেন দোলনার পাশে।
দোলনাটা খালি।
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন ডাক্তার দোলনা ধরে। তারপর অদৃশ্য কাকে যেন উদ্দেশ্য করে বলতে শুরু করলেন :
নার্সারীর দরজাটা বন্ধ ছিল। তাই তুমি তোমার সবচেয়ে নিরাপদ স্থান দোলনাতে ফিরে আসতে পারোনি। তুমি বুঝতে পারোনি যে বাতাসের ধাক্কায় দরজাটা অমন শক্তভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু আমি জানি তুমি এই বাড়ির কোথাও লুকিয়ে আছ। ভান করছ এমন কিছুর, আসলে যা তুমি নও। মাথার চুল খামচে ধরলেন ডাক্তার, বিবর্ণ এক টুকরো হাসি ফুটল মুখে। আমি এখন অ্যালিস আর ডেভিডের মতো কথা বলছি, তাই না? কিন্তু আমি কোনো ঝুঁকি নিতে চাই না। আমি অপার্থিব কোনো কিছুতেই বিশ্বাস করি না। তারপরও আমি কোনো ঝুঁকি নেব না।
নিচে নেমে এলেন ডাক্তার। চেয়ারে রাখা ডাক্তারি ব্যাগ খুলে একটা যন্ত্র বের করলেন।
হলঘরে ঘড়ঘড় একটা আওয়াজ শোনা গেল। কে যেন ঘষটে ঘষটে আসছে এদিকে। পাঁই করে ঘুরলেন ড. জেফারস।
আমি তোমাকে এই দুনিয়ায় এনেছি, ভাবলেন তিনি। আর এখন আমিই তোমাকে এখান থেকে সরিয়ে দেব…।
শব্দ লক্ষ্য করে ঠিক ছপা হেঁটে গেলেন ডাক্তার। হাতটা উঁচু করে ধরলেন সূর্যালোকে।
দেখো বেবি! কি চকমকে, কি সুন্দর!
সূর্যের আলোতে ঝিকিয়ে উঠল স্কালপেলটা।
–রে ব্রাডবারি
ছায়া কালো কালো
বিকট শব্দ তুলে ঝাঁকি খেয়ে থেমে গেল ট্রেন। আমি কামরার জানালা দিয়ে প্রায় সাঁঝ বেলার আবছা আঁধারে ঢাকা বাইরে উঁকি দিলাম। এটা কোন্ জায়গা?
ওক গ্রোভ, স্টেশনের ছাদে ঝাপসা সাইনবোর্ডটি পড়া গেল। আমি ক্লান্ত শ্বাস ছাড়লাম। তিনদিন ধরে ট্রেন জার্নি করছি। অবিরাম দুলুনি, পোড়া অঙ্গার আর জানালার পাশ দিয়ে ছুটে যাওয়া দৃশ্যাবলি দেখতে দেখতে বেজায় শ্রান্ত আমি। হঠাৎ একটি বুদ্ধি মাথায় এল। আইল ধরে এগোলাম কন্ডাক্টরের দিকে। সে এক বৃদ্ধাকে ট্রেন থেকে নামতে সাহায্য করছে।
এখানে ট্রেন থামবে কতক্ষণ? জিজ্ঞেস করলাম তাকে।
মিনিট দশেক, ম্যাম, বলল সে।
আমি ট্রেন থেকে নেমে পড়লাম। পা রাখলাম স্টেশনের সামনের নরম বালুতে। আবার শক্ত জমিনে হাঁটতে কী যে ভাল লাগছে! শীতের সুশীতল বাতাস টেনে নিলাম বুক ভরে। পা বাড়ালাম স্টেশনের বাইরে। একটু হাঁটাহাঁটি করব। এক ঝলক হাওয়া এসে আমার স্কার্টে বাড়ি খেল, চুল উড়িয়ে মুখে ফেলল। আমি অলস চোখে ওক গ্রোভের চারপাশে নজর বুলালাম। একেবারেই গতানুগতিক ধরনের ছোট শহর। হাঁটতে হাঁটতে স্টেশন ছেড়ে খানিকটা দূরে চলে এলাম। ইতিমধ্যে বার দুয়েক চোখ বুলিয়ে নিয়েছি ঘড়িতে। দশমিনিট হুট করে পার না হয়ে যায় সে ভয়ে আছি। এমন সময় দেখি দুটো কুকুর একটা বিড়াল ছানার ওপর হামলা করেছে।
আমি ছুটে গেলাম ওদিকে। ছানাটাকে ওদের কবল থেকে ছাড়িয়ে নিতে কসরত করতে হলো। কামড় এবং আঁচড়ও খেতে হলো। তবে বাচ্চাটাকে উদ্ধার করে একটা দোকানের দরজার ভেতরে ঢুকিয়ে দিলাম। আর ঠিক সেই মুহূর্তে কানে ভেসে এল ট্রেনের হুইশলের শব্দ। আমি ছুট দিলাম স্টেশনে। কিন্তু অকুস্থলে পৌঁছে দেখি সাদা ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ঝিকঝিক শব্দে আমার ট্রেন নাগালের বাইরে চলে গেছে। এখন আর ছুটেও ওটাকে ধরতে পারব না।
এখন কী করি? ইস, কেন যে মরতে এই অভিশপ্ত স্টেশনে হাওয়া খেতে বেরিয়েছিলাম। হাত পায়ে খিল ধরে গিয়েছিল বলেই ট্রেন থেকে অচেনা অজানা জায়গায় নামতে হবে? আমার লাগেজসহ সবকিছু রয়ে গেছে রাতের আঁধারে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া রেলগাড়িতে। সঙ্গে পার্স ছাড়া কিছুই নেই। আর আমি একা পড়ে আছি এই খুদে শহরে যাকে অজ পাড়া গাঁ বললেই মানায়। এ শহরের নামই তো জীবনে শুনিনি।
নাকি শুনেছি? ওক গ্রোভ…. কেমন চেনা চেনা লাগছে নামটি। ওক গ্রোভ… ওহ! মনে পড়েছে! কলেজে আমার যে রুমমেট ছিল তার বাড়ি ছিল ওক গ্রোভ নামে একটি শহরে। আমি স্টেশন মাস্টারের ঘরে পা বাড়ালাম।
এখানে কি মিস মেরি অ্যালিসন থাকেন? জিজ্ঞেস করলাম তাকে। মেরি ডিয়ানে অ্যালিসন?
বুড়ো আমার দিকে কেন অনেকক্ষণ অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বোধগম্য হলো না। দীর্ঘ বিরতির পরে সে আমার প্রশ্নের জবাব দিল। জি, ম্যাম, ধীরে ধীরে, ইতস্তত গলায় বলল সে। আপনি তার আত্মীয় নাকি?
না, হাসলাম আমি। আমরা একসঙ্গে কলেজে পড়তাম। ভাবছি… আজ রাতটা ওর বাড়িতে গিয়ে থাকব। আমি… এমন বোকা ট্রেনটা মিস করেছি…
আপনি, আবারও দ্বিধা বুড়োর গলায়, এখানে কোনো হোটেলে থাকতে পারেন। এখানে একটাই হোটেল আছে। মে ফেয়ার।
