ফর গডস শেক! দাঁড়িয়ে পড়লেন ডাক্তার, উত্তেজিত। এসব কি উদ্ভট কথা বলছ তুমি!
উদ্ভট শোনালেও ব্যাপারটা সত্যি, ড. জেফারস। মানুষটা ছোট বলেই আমরা ওকে সন্দেহ করতে পারছি না। কিন্তু এই খুদে সৃষ্টিগুলো ভীষণ রকম আত্মকেন্দ্রিক। কেউ ওদের ভাল না বাসলে ঠিকই টের পেয়ে যায়। তখন তাদের প্রতি ওদের ঘৃণা উথলে ওঠে। আপনি কি জানেন, পৃথিবীতে সবচেয়ে স্বার্থপর হচ্ছে শিশুরা?
ড. জেফারস ভ্রূকুটি করে অসহায়ভাবে মাথা নাড়লেন।
ডেভিড বলল, আমি বলছি না বাচ্চাটার ওপর কোনো অস্বাভাবিক শক্তি ভর করেছে। কিন্তু সময়ের আগেই যেন ও দ্রুত বেড়ে উঠেছে। আর এই ব্যাপারটাই আমার কাছে অস্বাভাবিক ঠেকছে।
ঠাট্টা করতে চাইলেন ডাক্তার। ধরো, বাচ্চাটা অ্যালিসকে খুনই করেছে। কিন্তু খুনের তো একটা উদ্দেশ্য থাকে। বাচ্চাটার উদ্দেশ্য কী ছিল?
জবাবটা তৈরিই ছিল। ত্বরিতগতিতে বলল ডেভিড, যে বাচ্চা জন্মগ্রহণ করেনি তার সবচেয়ে শান্তির জগৎ কোথায়? মায়ের জরায়ু। ওখানে সময় বলে কিছু নেই, আছে শুধু শান্তির অপার সমুদ্র, একমনে গা ভাসিয়ে থাকো। কোনো কোলাহল নেই, নেই দুশ্চিন্তা। কিন্তু তাকে যখন জোর করে টেনে আনা হলো এই মাটির পৃথিবীতে, নিরবচ্ছিন্ন শান্তির জগৎ থেকে মুহূর্তে সে পতিত হলো এক নরকে। স্বার্থপর এই পৃথিবীতে তাকে বেঁচে থাকতে হলে মানুষের ভালবাসা আদায় করতে হবে। অথচ যার সঙ্গে তার কোনো পরিচয় নেই। পরিচিত জগৎ থেকে হঠাৎ এই অপরিচিত দুনিয়ায় এসে নিজেকে সে প্রচন্ড অসহায় ভাবতে থাকে, তখন ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তার ছোট্ট মগজে তখন শুধু স্বার্থপরতা আর ঘৃণা ছাড়া অন্য কিছু থাকে না। মোহময় জগৎ থেকে কে তাকে এই নিষ্ঠুর পরিবেশে নিয়ে এল, ভাবতে থাকে সে। এ জন্য দায়ী কে? অবশ্যই মা। তার অপরিণত মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষে তখন মায়ের প্রতি ছড়িয়ে পড়ে প্রবল ঘৃণা। বাপও মায়ের চেয়ে ভাল কিছু নয়। সুতরাং তাকেও ঘৃণা করো। খুন করো দুজনকেই।
বাধা দিলেন ডাক্তার। তুমি যা বললে এই ব্যাখ্যা যদি সত্যি হতো তাহলে পৃথিবীর সব মহিলাই তাদের বাচ্চাদের ভয়াবহ কিছু একটা ভাবত।
কেন ভাববে না? আমাদের বাচ্চাটা কি তার জলজ্যান্ত উদাহরণ নয়? হাজার বছরের ডাক্তারী শাস্ত্রের বিশ্বাস তাকে প্রটেক্ট করছে। প্রকৃতিগতভাবে সবার ধারণা সে খুব অসহায়, কোনো কিছুর জন্য দায়ী নয়। কিন্তু এই বাচ্চাটা জন্মেইছে বিপুল ঘৃণা নিয়ে। যত দিন যাচ্ছে ততই প্রবল হয়ে উঠছে তার ঘৃণা। সে রাতে শুয়ে থাকে দোলনায়, ফর্সা টুকটুকে মুখখানা ভেজা, শ্বাস ফেলতে পারছে না। অনেকক্ষণ কেঁদেছে বলে এই অবস্থা? অবশ্যই নয়। সে দোলনা থেকে নেমেছে, হামাগুড়ি দিয়ে বেড়িয়েছে সারা ঘরে। তারপর ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ও আমার অ্যালিসকে খুন করেছে। আমিও ওকে খুন করব।
ডাক্তার ডেভিডের দিকে এক গ্লাস পানি আর কয়েকটা সাদা বড়ি এগিয়ে দিলেন। তুমি কাউকে খুন করবে না। তুমি এখন আগামী চব্বিশ ঘণ্টার জন্য ঘুমাবে। নাও, এগুলো গিলে ফেলল। একটা ভাল ঘুম হলেই এসব উদ্ভট চিন্তা মাথা থেকে দূর হয়ে যাবে।
ডেভিড পানি দিয়ে ঢকঢক করে গিলে ফেলল ঘুমের বড়িগুলো। ওপরে উঠল ও। কাঁদছে। শুয়ে পড়ল বিছানায়। ড. জেফারস ওর ঘুম আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। তারপর চলে গেলেন।
ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে ডেভিডের এই সময় শব্দটা শুনল।
কে? অস্পষ্ট গলায় বলল সে।
কে যেন হলঘরে ঢুকেছে।
ঘুমিয়ে পড়ল ডেভিড।
পরদিন খুব ভোরে ডেভিডের বাসায় হাজির হলেন ড. জেফারস। ডেভিডকে নিয়ে খুব টেনশনে আছেন তিনি। ছোটবেলা থেকে ওকে চেনেন। আবেগপ্রবণ, অস্থির। ভাগ্যিস গত রাতে তিনি ওদের বাসার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় একবার দেখা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। নইলে ছেলেটা অ্যালিসের শোকে ওভাবে হাসতে হাসতে পাগল হয়ে যেত। অ্যালিসের কথা মনে পড়তেই মন খারাপ হয়ে গেল তাঁর। এত লক্ষ্মী একটা মেয়ে! কি চমৎকার সুখের জীবন ছিল ওদের। সব গেল ছারখার হয়ে। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ডাক্তার। ডেভিডকে তিনি কিছু দিনের জন্য দূরে কোথাও ঘুরে আসতে বলবেন। এভাবে একা থাকলে মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটতে পারে। ছেলেটার।
কলিংবেল বাজালেন ডাক্তার। কোনো উত্তর নেই। তাঁর মনে পড়ল ডেভিড বলেছিল হাউজকীপার দেশের বাড়িতে গেছে। নব ঘোরালেন তিনি। খুলে গেল দরজা। ভেতরে ঢুকলেন। ডাক্তারি ব্যাগটা রাখলেন কাছের একটা চেয়ারে।
সাদামতো কী একটা সরে গেল দোতলার সিঁড়ি থেকে। ড. জেফারস প্রায় খেয়ালই করলেন না। তাঁর নাক কুঁচকে উঠেছে। কীসের যেন গন্ধ পাচ্ছেন।
গন্ধটা গ্যাসের!
বিদ্যুৎ খেলে গেল ডাক্তারের শরীরে, ঝড়ের বেগে সিঁড়ি টপকালেন, ছুটলেন ডেভিডদের বেডরুম লক্ষ্য করে।
বিছানায় নিশ্চয় পড়ে আছে ডেভিড, সারা রুম ভর্তি গ্যাসে। দরজার পাশের দেয়ালের সঙ্গে লাগানো অগ্নিনির্বাপক গ্যাস সিলিন্ডারের মুখ খোলা। হিসহিস শব্দে বেরিয়ে আসছে সাদা পদার্থটা। ড. জেফারসের চকিতে মনে পড়ল ডেভিড একবার বলেছিল সে তার বেডরুমে অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডার লাগিয়েছে। কারণ তার কোনো এক বন্ধু নাকি বিছানায় শুয়ে সিগারেট খেতে গিয়ে নেটের মশারিতে আগুন লাগিয়ে পুড়ে মরার জোগাড় হয়েছিল। ডেভিডেরও শুয়ে শুয়ে সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস আছে। অ্যালিসের তাগিদেই নাকি সে নিরাপত্তার জন্য ওই সিলিন্ডার লাগিয়েছে দেয়ালে।
