মারা গেছে অ্যালিস।
বাড়িটি আশ্চর্যরকম নিঃশব্দ, শুধু ডেভিডের বুকে হাতুড়ির আঘাত পড়ছে দমাদম।
মারা গেছে অ্যালিস।
মাথাটা দুহাতে আঁকড়ে ধরল ডেভিড, স্পর্শ করল চম্পক অঙ্গুলি। ভীষণ ঠান্ডা। বুকের সঙ্গে চেপে ধরে থাকল ডেভিড অ্যালিসকে। কিন্তু ও তো আর বেঁচে উঠবে না, আর কখনও জলতরঙ্গ কণ্ঠে ডাকবে না তার নাম ধরে। বাঁচতে চেয়েছিল অ্যালিস। তার কাছে নিরাপত্তা চেয়েছিল। কিন্তু ব্যর্থ ডেভিড বাঁচাতে পারেনি তার প্রিয়তমাকে, পারেনি নিরাপত্তা দিতে।
উঠে দাঁড়াল ও। ড. জেফারসকে ফোন করতে হবে। কিন্তু নাম্বারটা মনে পড়ছে না। ভূগ্রস্তের মতো উঠে এল ডেভিড দোতলায়। সম্মোহিত ভঙ্গিতে এগিয়ে চলল নার্সারী রুমের দিকে। খুলল দরজা। পা রাখল ভেতরে। শূন্য দৃষ্টিতে তাকাল দোলনার দিকে। পেটের মধ্যে গুলিয়ে উঠছে। কোনোকিছু ঠাহর করতে পারছে না ভাল মতো।
বাচ্চাটা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে, কিন্তু মুখখানা লাল, ঘামে চকচক করছে, যেন অনেকক্ষণ একভাবে কেঁদে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
ও মারা গেছে, ফিসফিস করে বলল ডেভিড। মারা গেছে অ্যালিস।
তারপর সে হঠাৎ হাসতে শুরু করল। নিচু গলায় হাসতেই থাকল। সংবিৎ ফিরে পেল গালে সজোরে চড় খেয়ে। চমকে উঠল ড. জেফারসকে দেখে। তিনি একের পর এক চড় মারছেন ওকে আর চেঁচাচ্ছেন, শান্ত হও, ডেভিড। প্লীজ, কাম ডাউন।
অ্যালিস মারা গেছে, ড. জেফারসকে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেঁদে ফেলল ডেভিড। পড়ে গেছে ও দোতলা থেকে পা পিছলে। গত রাতে আমিও পুতুলটার গায়ে পা পিছলে প্রায় মারা যাচ্ছিলাম। আর এখন
ড. জেফারস ওর মাথায় হাত বোলাতে লাগলেন। জানেন, আমি ওর সুন্দর একটা নাম দেব ভেবেছিলাম। এখন কি নাম দেব জানেন? লুসিফার!
.
রাত এগারোটা। অ্যালিসকে গোরস্তানে কবর দিয়ে এসেছে ডেভিড । শুকনো মুখে বসে আছে লাইব্রেরি ঘরে। অনেকক্ষণ পর নীরবতা ভেঙে বলল, ভেবেছিলাম অ্যালিসকে ভাল একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাব। ভেবেছিলাম ওর মাথায় গন্ডগোল হয়েছে। কিন্তু এখন বুঝছি বাচ্চাটাকে ভয় পাওয়ার ব্যাপারটা অমূলক ছিল না।
ডাক্তার সশব্দে শ্বাস ফেললেন। অ্যালিসের মতো তুমিও দেখি ছেলেমানুষী শুরু করলে। অসুস্থতার জন্য অ্যালিস বাচ্চাটাকে দোষ দিত আর এখন তুমি ওর মৃত্যুর জন্য তাকে দায়ী করছ। খেলনাটার ওপর পা পিছলে দোতলা থেকে পড়ে ঘাড় ভেঙেছে অ্যালিসের। এজন্য তুমি কোনোভাবেই বাচ্চাটাকে দায়ী করতে পারো না।
ওটা লুসিফার। চুপ করো! ওই শব্দটা আরও কখনো মুখে আনবে না।
মাথা নাড়ল ডেভিড। অ্যালিস রাতে অদ্ভুত সব শব্দ শুনত, কে যেন হাঁটছে ঘরে। আপনি জানেন, ড. জেফারস, কে ওই শব্দ করত? বাচ্চাটা। ছয়মাসের একটা বাচ্চা, অন্ধকারে ঘুরে বেড়াত, আমাদের সব কথা শুনত। চেয়ারের হাতল চেপে ধরল ডেভিড। আর আমি যখন আলো জ্বালাতাম, কিছু চোখে পড়ত না। বাচ্চাটা এত ছোট, যে কোনো ফার্নিচারের আড়ালে লুকিয়ে পড়াটা ওর জন্য কোনো ব্যাপার ছিল না।
থামবে তুমি! বললেন ডাক্তার।
না, আমাকে বলতে দিন। সব বলতে না পারলে আমি পাগল হয়ে যাব। আমি গতবার ব্যবসায়ের কাজে শিকাগো গেলাম, তখন কে অ্যালিসকে সারারাত জাগিয়ে রেখেছিল, কে তার নিউমোনিয়া বাঁধিয়েছিল? বাচ্চাটা। কিন্তু এত চেষ্টার পরেও যখন অ্যালিস মরল না, তখন সে আমাকে খুন করতে চাইল। ব্যাপারটা ছিল স্বাভাবিক; সিঁড়িতে একটা খেলনা ফেলে রাখো, বাপ তোমার জন্য দুধ না নিয়ে আসা পর্যন্ত কাঁদতে থাকো, তারপর সে অন্ধকারে সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে পিছলে পড়ে ঘাড় ভাঙুক। সাধারণ একটা কৌশল, কিন্তু কাজের। আমি মরতে মরতে বেঁচে গেছি। কিন্তু ফাঁদটা অ্যালিসকে শেষ করেছে।
একটু থামল ডেভিড। হাঁপিয়ে গেছে। তারপর বলল, বহু রাতে আমি আলো জ্বেলে দেখেছি ওটা ঘুমায়নি, এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। বেশিরভাগ শিশু ওই সময় ঘুমিয়ে থাকে। কিন্তু ও জেগে থাকত, চিন্তা করত।
বাচ্চারা চিন্তা করতে পারে না।
ও পারে। আমরা বাচ্চাদের মন সম্পর্কে কতটুকুই বা জানি? অ্যালিসকে ওর ঘৃণা করার কারণও ছিল। অ্যালিস ওকে মোটেও স্বাভাবিক কোনো শিশু ভাবত না। ভাবত অস্বাভাবিক কিছু। ড. জেফারস, আপনি তো জানেনই জন্মের সময় কত বাচ্চা তাদের মায়েদের খুন করে। এই নোংরা পৃথিবীতে জোর করে টেনে আনার ব্যাপারটা কি ওদেরকে ক্ষুব্ধ করে তোলে? ডেভিড ক্লান্তভাবে ডাক্তারের দিকে ঝুঁকল। পুরো ব্যাপারটাই এক সুতোয় বাঁধা। মনে করুন, কয়েক লাখ বাচ্চার মধ্যে কয়েকটা জন্মাল অস্বাভাবিক বোধ শক্তি নিয়ে। তারা শুনতে পায়, দেখতে পায়, চিন্তা করতে পারে, পারে হাঁটাচলা করতে। এ যেন পতঙ্গদের মতো। পতঙ্গরা জন্মায় স্বনির্ভরভাবে। জন্মাবার কয়েক হপ্তার মধ্যে বেশিরভাগ স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পাখি পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। কিন্তু সাধারণ বাচ্চাদের কয়েক বছর লেগে যায় হাঁটতে, চলতে, কথা বলা শিখতে।
কিংবা ধরুন, কোটিতে যদি একটা বাচ্চা অস্বাভাবিকভাবে জন্মগ্রহণ করে? জন্মাল একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের মেধা এবং শক্তি নিয়ে। কিন্তু সে ভান করল আর দশটা বাচ্চার মতোই। নিজেকে দুর্বল হিসেবে প্রমাণ করতে চাইল, খিদের সময় তার স্বরে কাঁদল। কিন্তু অন্য সময় অন্ধকার একটা বাড়ির সব জায়গায় হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াচ্ছে সে, শুনছে বাড়ির লোকজনের কথাবার্তা। আর তার পক্ষে সিঁড়ির মাথায় ফাঁদ পেতে রাখা কত সোজা! কত সহজ সারারাত কেঁদে কেঁদে তার মাকে জাগিয়ে রেখে অসুস্থ করে তোলা।
