উন্মাদের মতো হাত বাড়াল ডেভিড, প্রচন্ড ঝাঁকি খেল কব্জি জোড়া, ধরে ফেলেছে রেলিং। নিজেকে গাল দিল একটা।
কীসের ওপর পা দিয়ে পিছলে পড়েছিল ডেভিড? জিনিসটা কী বোঝার জন্য হাতড়াতে শুরু করল অন্ধকারে। মাথায় দ্রিম দ্রিম ঢাক বাজছে। হৃৎপিন্ড যেন গলার কাছে এসে ঠেকেছে, প্রচন্ড ব্যথা করছে হাত।
নরম জিনিসটা খুঁজে পেল ডেভিড। গায়ে আঙুল বুলিয়েই বুঝতে পারল, একটা পুতুল। বিদঘুঁটে চেহারার বড়সড় এই পুতুলটা সে কিনেছিল তার বাচ্চার জন্য।
হাসতে গিয়েও হাসতে পারল না ডেভিড। কে যে এভাবে জিনিসপত্র ছড়িয়ে রাখে! নাহ, হাউজকীপারটা দেশের বাড়ি গিয়ে মুশকিলই হলো দেখছি। আরেকটু হলেই ভবলীলা সাঙ্গ হতে যাচ্ছিল ডেভিডের। অত উঁচু থেকে সরাসরি সিমেন্টের মেঝেতে আছড়ে পড়লে বাঁচত নাকি সে? ভাগ্যিস রেলিংটা ধরে ফেলেছিল।
পরদিন, নাস্তার টেবিলে কথাটা বলল অ্যালিস। আমি দিন কয়েকের জন্য একটু ভ্যাকেশনে যেতে চাই। তুমি যদি সময় করতে না পারো, আমাকে একাই যেতে দাও, প্লীজ। হাউজকীপার বুধবার আসবে। সে একাই বাচ্চার যত্ন নিতে পারবে। আমি ওকে সঙ্গে নিতে চাচ্ছি না। আসলে বলতে পারো আমি কয়েকদিনের জন্য ওর কাছ থেকে পালাতে চাইছি। ভেবেছিলাম এই ব্যাপারটা –মানে ভয়টা থেকে মুক্ত হতে পেরেছি। কিন্তু তা আর পারলাম কই? ওর সঙ্গে এক রুমে আর থাকতে পারছি না আমি। ও এমনভাবে আমার দিকে তাকায় যেন প্রচন্ড ঘৃণা করে আমাকে। এভাবে আরও কিছুদিন চললে আমি সত্যি পাগল হয়ে যাব। আমার মন বলছে খারাপ কিছু একটা ঘটতে চলেছে। সেটা ঘটার আগেই আমি কিছুদিনের জন্য বাইরে যেতে চাই।
থমথমে মুখে চায়ের কাপ টেবিলে নামিয়ে রাখল ডেভিড। তোমার আসলে এখন দরকার একজন ভাল সাইকিয়াট্রিস্ট। তিনি যদি তোমাকে বাইরে যেতে বলেন তাহলে যেয়ো। কিন্তু এভাবে আর চলে না। তোমার টেনশনেই আমি মরলাম!
মুখ কালো হয়ে গেল অ্যালিসের। অনেকক্ষণ চুপ হয়ে থাকল। তারপর ওর দিকে না তাকিয়ে আস্তে আস্তে বলল, তুমি বোধহয় ঠিকই বলেছ। আমাকে একজন ভাল সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো দরকার। ঠিক আছে, কারও সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করো। তুমি যেখানে বলবে সেখানেই আমি যেতে রাজি, ডেভিড।
ডেভিড ওর ঠোঁটে চুমু খেল। ডোন্ট টেক ইট আদার ওয়ে, ডার্লিং। তোমাকে কষ্ট দেয়ার জন্য কথাটা বলিনি। তুমি তো জানোই, তুমি আমার কাছে কতখানি। তোমার সামান্য কষ্ট হলেও আমি দিশেহারা হয়ে যাই।
মুখ তুলল অ্যালিস। জানি। আমি কিছু মনে করিনি। যাকগে, আজ ফিরবে কখন?
অন্যান্য দিনের মতোই। কেন, হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?
এমনিই। তুমি তাড়াতাড়ি ফিরলে আমি একটু স্বস্তি পাই। চারদিকে এত অ্যাক্সিডেন্ট হয়। আর যে জোরে গাড়ি চালাও, আমার খুব ভয় করে।
ও তো আমি সবসময়ই চালাই। অ্যাক্সিডেন্টে মরব না, একশোভাগ গ্যারান্টি দিলাম। অ্যালিসের ফর্সা গাল টিপে দিল সে। হাসতে হাসতে বলল, চলি, দৃঢ় পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ডেভিড। ফ্রেশ মুড নিয়ে।
.
অফিসে পৌঁছেই ড. জেফারসকে ফোন করল ডেভিড। জানতে চাইল তাঁর জানাশোনা ভাল কোনো সাইকিয়াট্রিস্ট আছে কিনা। একজন নির্ভরযোগ্য নিউরোসাইকিয়াট্রিস্টের কথা বললেন ডাক্তার। জানালেন তিনি অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে রাখবেন, ডেভিডকে এ নিয়ে ভাবতে হবে না। তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে ফোন রেখে দিল ডেভিড। তারপর ঝাঁপিয়ে পড়ল কাজে।
সারাদিন কর্মব্যস্ততার পর যখন ফ্রী হলো ডেভিড, অনুভব করল বাসায় যাওয়ার জন্য কী ব্যগ্র হয়ে আছে মন। লিফটে নামার সময় গতরাতের ঘটনাটা মনে পড়ল ওর। অ্যালিসকে আছাড় খাওয়ার কথা বলেনি সে। পুতুলটার কথা বললে সে যদি অন্যভাবে রিয়্যাক্ট করে । থাক, দরকার নেই বলার। অ্যাক্সিডেন্ট ইজ অ্যাক্সিডেন্ট।
সূর্য ডুবে গেছে আকাশছোঁয়া বিল্ডিংয়ের আড়ালে। টকটকে লাল আভা ছড়িয়ে আছে ওদিকের আকাশে। সিঁদুর রঙা মেঘগুলো আশ্চর্য সব মূর্তি একে রেখেছে আকাশের বুকে। অপূর্ব! একটা সিগারেট ধরিয়ে ফুরফুরে মেজাজে গাড়ি চালাচ্ছে ডেভিড।
গাড়ি বারান্দায় টয়োটা রাখল ডেভিড। অ্যালিসকে নিয়ে এখনই আবার বেরুবে। ঠিক করেছে লং ড্রাইভে যাবে। ফেরার পথে রাতের খাবারটা সেরে নেবে কোনো রেস্টুরেন্টে।
হাত ওপরে তুলে আড়মোড়া ভাঙল ডেভিড। বুক ভরে টেনে নিল তাজা বাতাস। পেছন থেকে মিষ্টি স্বরে ডেকে উঠল একটি পাখি। কলিংবেলে চাপ দিল। পিয়ানোর টুং টাং শব্দ বাজতে শুরু করল দোতলায়। দেড় মিনিট পার হওয়ার পরেও অ্যালিস আসছে না দেখে ভ্রু কুঁচকে উঠল ওর। ঘুমিয়ে পড়েনি তো অ্যালিস। কিন্তু এ সময় তো ওর ঘুমাবার কথা নয়। দরজার নবে হাত রাখল ডেভিড। মোচড় দিল। ধাক্কা দিতেই খুলে খেল দরজা। কপালে আরও একটা ভাঁজ পড়ল ওর। সদর দরজা কখনো ভোলা রাখে না অ্যালিস। দিনকাল ভাল নয় জানে। তাহলে কী হলো আজ মেয়েটার।
ঘরে ঢুকেই উঁচু গলায় ডাকল ডেভিড, অ্যালিস! কোনো উত্তর নেই। আবারও ডাকতে গেল, কিন্তু হাঁ হয়েই থাকল মুখ। দৃশ্যটা দেখতে পেয়েছে সে, ভয়ের তীব্র একটা ঠান্ডা স্রোত জমিয়ে দিল ওকে।
কিস্তৃত পুতুলটা পড়ে আছে সিঁড়ির গোড়ায়। কিন্তু পুতুল নয়, ডেভিড তাকিয়ে আছে অ্যালিসের দিকে। অ্যালিসের হালকা পাতলা দেহটা দুমড়ে মুচড়ে আছে সিঁড়ির গোড়ায়। যেন একটা ভাঙা পুতুল, আর কোনোদিন খেলা করা যাবে না। কোনোদিন না।
