দীর্ঘক্ষণ কথা বলে ক্লান্ত হয়ে পড়ল অ্যালিস। একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়ল। ডেভিড অনেকক্ষণ বসে থাকল ওর শিয়রে, নড়তে ভুলে গেছে যেন। ওর রক্ত জমাট বেঁধে গেছে শরীরে। কোথাও একটা নার্ভও কাজ করছে না। দিন তিনেক পরে অ্যালিসকে বাড়ি নিয়ে এল ডেভিড। সিদ্ধান্ত নিল পুরো ব্যাপারটা সে জানাবে ড. জেফারসকে। তিনি অখন্ড মনোযোগে ডেভিডের সব কথা শুনলেন।
তারপর বললেন, দেখো, ডেভিড, তুমি ঠান্ডা মাথায় ব্যাপারটা ভাবার চেষ্টা করো। কখনও কখনও মায়েরা তাদের সন্তানদের ঘৃণা করেন, এটা এক ধরনের দ্বৈতসত্তা। ভালবাসার মধ্যে ঘৃণা, প্রেমিক-প্রেমিকারা হরহামেশা খুঁটিনাটি ব্যাপার নিয়ে ঝগড়া করছে। কয়েকদিন মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ। বাচ্চারাও তাদের মায়েদের ঘৃণা করে…।
বাধা দিল ডেভিড, আমার মাকে আমি কখনো ঘৃণা করিনি।
করেছ। কিন্তু স্বীকার করবে না। এটাই স্বাভাবিক। মানুষ তার প্রিয়জনদের ঘৃণা করার কথা কখনো স্বীকার করতে চায় না।
কিন্তু অ্যালিস তার বাচ্চাকে ঘৃণা করার কথা স্পষ্ট করে বলছে!
বরং বলো সে একটা ঘোরের মধ্যে আছে। ঘৃণা এবং ভালবাসার যে স্বাভাবিক দ্বৈতসত্তা রয়েছে, সে ওটা থেকে একটু এগিয়ে গেছে। স্বাভাবিক ডেলিভারির মাধ্যমে ওর বাচ্চার জন্ম। নরক যন্ত্রণা সহ্য করেছে সে সন্তান জন্ম দেয়ার সময়। এই প্রায় মৃত্যুর অভিজ্ঞতা এবং নিউমোনিয়ার জন্য অ্যালিস বাচ্চাটাকেই একমাত্র দায়ী মনে করছে। নিজের সমস্যা সে নিজেই সৃষ্টি করছে, কিন্তু দায়ভারটা তুলে দিচ্ছে হাতের কাছে যাকে সবচেয়ে সহজ টার্গেট হিসেবে পাচ্ছে, তার ওপর। আমরা সবাই এটা করি। চেয়ারের সঙ্গে ধাক্কা খেলে দোষ দিই ফার্নিচারটার । অথচ নিজেরা যে সাবধান নই সেদিকে খেয়াল রাখি না। ব্যবসায় ফেল করলে অভিসম্পাত করি ঈশ্বর, আবহাওয়া কিংবা আমাদের ভাগ্যকে। তোমাকে নতুন করে কিছু বলার নেই। আগেও যা বলেছি আজও তাই বলছি। লাভ হার। ওকে আরও বেশি বেশি ভালবাস। পৃথিবীর সেরা ওষুধ হলো ভালবাসা। ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে ওর প্রতি তোমার স্নেহটাকে ফুটিয়ে তোলো, ওর মধ্যে নিরাপত্তাবোধ জাগিয়ে তোলো। ওকে বোঝাও বাচ্চারা কত নিষ্পাপ আর মোটেও অনিষ্টকারী নয়। বাচ্চাটার মূল্য কারও চেয়ে কম নয় এই অনুভূতি ওর মধ্যে জাগিয়ে তোল। দেখবে কয়েকদিনের মধ্যে সব ঠিক হয়ে গেছে। মৃত্যুভয় ভুলে যাবে অ্যালিস, ভালবাসতে শুরু করবে তার বাচ্চাকে। যদি আগামী মাসের মধ্যেও ওর কোনো পরিবর্তন না দেখো, তাহলে আমাকে। জানিও। ওকে কোনো ভাল সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে পাঠাব। এখন তুমি যেতে পার। তবে দয়া করে চেহারা থেকে অসহায় ভাবটা মুছে ফেল।
.
শীত ফুরিয়ে বসন্ত এল। বসন্তকে বিদায় দিল গ্রীষ্ম। ডেভিডদের বুলেভার্ডের বাড়িতে সবকিছু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এল। ডেভিড তার কাজে ব্যস্ত থাকছে ঠিকই, তবে বেশিরভাগ সময় সে ব্যয় করছে স্ত্রীর জন্য। অ্যালিস এখন অনেকটাই সুস্থ। বিকেলে দুজনে মিলে হাঁটতে যাচ্ছে পার্কে, কখনো সামনের লনে ব্যাডমিন্টনের নেট ঝুলিয়ে পয়েন্ট গুণে খেলছে, ডেভিডকে হারাতে পারলে হাততালি দিয়ে উঠছে বাচ্চাদের মতো। আস্তে আস্তে শক্তি ফিরে পাচ্ছে অ্যালিস। মনে হচ্ছে ভয়টার হাত থেকে মুক্তি পাচ্ছে ও।
তারপর একদিন রাতে প্রবল ঝড় হলো। আকাশের বুক চিরে সাপের জিভের মতো ঝলসে উঠল বিদ্যুৎ, ভীষণ শব্দে বাজ পড়ল কাছে কোথাও, হাওয়ার ক্রুদ্ধ গর্জন যেন কাঁপিয়ে দিতে লাগল বাড়িটাকে। সেই সঙ্গে কেঁপে উঠল অ্যালিস। ঘুম ভেঙে জড়িয়ে ধরল স্বামীকে, ওকেও ঘুম থেকে উঠতে বাধ্য করল। অ্যালিসকে আদর করতে করতে ডেভিড জানতে চাইল কী হয়েছে।
ভয়ার্ত গলায় অ্যালিস বলল, কে যেন আমাদের ঘরে ঢুকেছে। লক্ষ করছে আমাদেরকে।
আলো জ্বালাল ডেভিড। আবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছ, সস্নেহে বলল সে। এতদিন তো ভালই ছিলে। আবার কী হলো? আলো নেভাল সে।
অন্ধকারে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল অ্যালিস। তারপর হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়ল। ওকে বুকে চেপে ধরে থাকল ডেভিড, ভাবল তার এই মিষ্টি বউটা কি সামান্য কারণেই না ভয় পায়।
হঠাৎ ঘুম চটে যাওয়ায় আর ঘুম আসছিল না ডেভিডের। অনেকক্ষণ আগডুম বাগডুম ভাবল সে। শব্দটা হঠাৎ কানে এল। খুলে যাচ্ছে। বেডরুমের দরজা। ইঞ্চিকয়েক খুলে গেল পাল্লা দুটো।
কেউ নেই ওখানে। বাতাস থেমেছে বহুক্ষণ।
চুপচাপ শুয়ে থাকল ডেভিড। মনে হলো এক ঘণ্টারও বেশি সময় সে অন্ধকারে শুয়ে আছে।
তারপর, অকস্মাৎ গোঙানির মতো কান্নার আওয়াজ ভেসে এল দূর থেকে। কাঁদছে বাচ্চাটা।
গোঙানির শব্দটা অন্ধকারের মধ্যে গড়িয়ে এল, ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে, যেন প্রতিধ্বনি তুলল দেয়ালে। এই সময় আবার শুরু হলো ঝড়।
ডেভিড খুব আস্তে আস্তে একশো গুণল। থামছে না বাচ্চা, একভাবে কেঁদেই চলেছে।
সাবধানে অ্যালিসের বাহু বন্ধন থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করল ডেভিড, নামল বিছানা থেকে। স্যান্ডেলে পা গলিয়ে এগোল দরজার দিকে।
ও এখন নিচে, রান্নাঘরে যাবে, ঠিক করল ডেভিড। খানিকটা দুধ গরম করে চলে আসবে ওপরে, তারপর…।
মিশমিশে অন্ধকারটা যেন মুহূর্তের জন্য অদৃশ্য হয়ে গেল সামনের থেকে, পা পিছলে গেছে ডেভিডের। নরম কী একটা জিনিসের ওপর পা-টা পড়েছিল, টের পেল অসীম শূন্যের এক কালো গহ্বরের মধ্যে ছিটকে যাচ্ছে সে।
